অপরাধ

স্বপরিবারে প্রতারণার ব্যাবসা – কোটী টাকা তছরুপী – মিথ্যা অপহরণের মামলা ফাঁস করল কলকাতা পুলিশ



মামা – ভাগ্নী সেজে হলদীয়ার এক বিধবা মহিলা কে মায়াজালে ফাঁসিয়ে ৪০ লক্ষেরও বেশী টাকা হাতানোর পর রিতীমতো মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলতে ছেয়েছিল এই প্রতারকের দল। কখনোও দীঘা, পুরী, দার্জিলিং, লোলেগাও এ হোটেল ব্যবসা, কখনো চিংড়ি, ইলিশ, রুই, কাতলার এক্সপোর্টার আবার কখনোও বা ইনকাম ট্যাক্সের সিক্রেট অফিসার, ভোলেভালা লোকগিতী শিল্পী, কবি অথবা চায়ের দোকানদার রুপী এই ৫০উর্ধ মানুষটিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলে আপনি বুঝতেই পারবেন না।

বিভিন্ন সেলিব্রিটির সাথে অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শিকার খোঁজাই এঁদের অন্যতম হাতিয়ার। বেলঘরিয়ার এই প্রতারক নিজেকে “পাহাড়ে জন্ম নেওয়া” দুঃস্থ সন্তান বলে দাবী করে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করে নিতে পারদর্শী। গানের গলা, কবিতায় ভাবাবেগ দিয়ে নিমেশেই ঘায়েল করে দেন বাচ্চা থেকে বুড়ো সকলকে।

২০১৭ র শেষদিকে এই প্রতারকের নারী সঙ্গিনী তাঁর দলে যোগ দেওয়ায় পোয়া ১২ হয়ে ওঠে লোকের চোখে ধুলো দিয়ে বেড়ানো অনির্বাণ সেনগুপ্তর। বিবাহিতা স্ত্রী সুস্মিতা সেনগুপ্ত ও একমাত্র ছেলে সাগ্নিক সেনগুপ্ত ২০১২ থেকেই বাঘাযতীনের আলাদা ভাড়াবাড়ীতে বসবাস করলেও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল অনির্বানের সাথে। লোকের চোখে পরিবারকে লুকিয়ে রাখতেই হয়ত এই পরিকল্পনা।

২০১৮ তে সোশ্যাল মিডিয়ায় ৭ লক্ষ টাকা প্রতারণার দায় চাপিয়ে বালিগঞ্জ নিবাসী এক ভদ্রলোক ও তাঁর সংস্থার সম্পাদককে দায়ী করার পোস্ট যে অনির্বাণ আর তাঁর নারী সঙ্গিনী কেয়া ওরফে মুন্না ভৌমিক দের জন্য কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে তা সেদিন কল্পনাও করতে পারেন নি হয়তো। খোঁজ নিয়ে জানা যায় একাধিক প্রতারণার ঘটনা খোদ অনির্বাণদেরই বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন : নগ্ন ছবি ও ভিডিও প্রেমিকার স্বামীকে হোয়াটসঅ্যাপ করলেন প্রেমিক! অতঃপর …

হোটেল ব্যবসার নামে ৩ লাখ, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ হওয়া কবিতা নামী শিল্পীদের কন্ঠে গান আকারে প্রকাশ করে লেখিকাকে প্রচারের লাইমলাইটে পোঁছে দেওয়ানোর নাম করে ৪০ লাখেরও বেশী, মেদিনীপুরের ময়না অঞ্চলের গরীব মাছ ব্যবসায়ীদের থেকে ১৮ লক্ষেরও বেশী টাকার মাছ নিয়ে তাঁদের বকেয়া রাশী না চোকানো, মাছের ব্যবসায় অংশীদার করার লোভ দেখিয়ে বিজয়গড় নিবাসী এক ভদ্রলোকের থেকে ১০ লক্ষ টাকা, বাগুইআটির এক গাড়ি ব্যবসায়ীর নামে লাক্সারি গাড়ি ফিন্যান্স করিয়ে সেই গাড়ীতে ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্ট্মেন্টের ভুয়ো বোর্ড লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো সহ বিভিন্ন ধরণের প্রতারণার মামলা সামনে আসে।


নারী সঙ্গিনী কে কখনোও স্ত্রী কখনোও ভাগ্নী সাজিয়ে মানুষকে প্রতারণার জালে ফাঁসানোর দলে এঁদের অন্যতম সঙ্গিনী স্বয়ং অনির্বাণ সেনগুপ্তর স্ত্রী সুস্মিতা সেনগুপ্ত। জনসমক্ষে সুস্মিতা দেবী নিজেকে অনির্বাণের থেকে আলাদা দেখানোর পরিচয় দিয়ে থাকলেও গত ১৮ই ডিসেম্বর নেতাজীনগর থানায় নিজের স্বামী এবং ছেলে ও ছেলের বন্ধুর অপহরণের মিথ্যা অভিযোগ জানান।

যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ৪ নং গেটের সামনে থেকে ভর সন্ধ্যাবেলায় মাত্র দুজন মানুষ জোর করে ৩ জন সমর্থ মানুষকে গাড়িতে তুলে অপহরণ করে নিয়ে গেল, এমন অভিযোগ পেয়ে তৎপর হয়ে ওঠেন ডিসি (এসএসডি) রশিদ মুনির খান। স্পেশ্যাল অফিসারের টিম মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ধরে পোঁছয় তমলুক অঞ্চলে। অথচ অনির্বাণ বাবুর ফেসবুকের করা পোস্ট জানান দেয় যে তিনি তাঁর ছেলে এবং ছেলের বন্ধুকে নিয়ে বিশেষ কাজে কোলকাতার বাইরে।

তমলুক শহর ও ময়না থানা এলাকার একাধিক স্থানে তল্লাশি অভিযান চালায় পুলিস। কিন্তু তাতে প্রাথমিক সাফল্য না পেলেও সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৩ ডিসেম্বর তিন ‘অপহৃত’-কে অক্ষত অবস্থায় ময়না থেকে উদ্ধার করেন তদন্তকারীরা। এদিকে, অফিসাররদের জেরায় অপহৃতদের বক্তব্যে একগুচ্ছ অসঙ্গতি পেয়েছে পুলিস। প্রথমত, ভরসন্ধ্যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের সামনের রাস্তা যথেষ্ট জনবহুল থাকে। সেখান থেকে তিনজনকে গাড়িতে তুলে অপরহণ করা হলে, কেউ না কেউ সেটা দেখতে পেতেন। কিন্তু, এক্ষেত্রে তেমন কোনও প্রত্যক্ষদর্শীকে পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন : অন্য পুরুষের সঙ্গে হোটেলে স্ত্রী, হাতেনাতে ধরলো স্বামী

দ্বিতীয়ত, জিজ্ঞাসাবাদে অপহৃত অনির্বাণ সেনগুপ্ত বলেন, তাদের সেদিন বুলেটপ্রুফ সুইফট ডিজায়ার গাড়িতে তোলা হয়েছিল। কিন্তু, ওই মডেলের গাড়ি যে বুলেটপ্রুফ হয় না, তা পুলিস জানাতেই অনির্বাণ বলেন, সেদিন চোখে চশমা ছিল না। তাই গাড়ির মডেল ভালো করে দেখতে পাননি তিনি। তৃতীয়ত, তথাকথিত ‘অপরহণ’-এর পর তিনজনের মোবাইল ফোনই ‘সুইচ অন’ অবস্থায় তাঁদেরই পকেটে ছিল। অপহরণের ঘটনায় যেটা অস্বাভাবিক।

চতুর্থত, যাদবপুর থেকে ময়না— প্রায় ৩ ঘন্টার এই গোটা যাত্রাপথে নাকা চেকিংয়ে সীট বেল্ট ও মাস্ক না থাকায় কয়েকবার ওই গাড়িকে আটকেছিল পুলিস অথচ অপরহণকারীদের বিষয়ে পুলিসকে সতর্ক করলেন না দু জন অপহরণকারীর সাথে থাকা তিনজন অপহৃতের কেউ? তদন্তকারীদের এই সমস্ত প্রশ্নের কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি ওই তিনজন।

কোটী টাকার প্রতারণার দায় থেকে নিজেদের বাঁচাতে পাওনাদারদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা অপহরণের মামলা সাজিয়ে বাজিমাত করতে চেয়েছিলেন এই প্রতারক পরিবার ও তাঁদের মহিলা সঙ্গিনী। শেষরক্ষা হলো না এবার। কলকাতা পুলিসের ডিসি (এসএসডি) রশিদ মুনির খান জানিয়েছেন, অপহৃত অনির্বাণ সেনগুপ্ত ও কেয়া ভৌমিক সেনগুপ্তর বিরুদ্ধে যাদবপুর, শ্রীরামপুর থানা মিলিয়ে চারটি প্রতারণার মামলা রয়েছে। সবমিলিয়ে প্রতারণার অঙ্ক কয়েক কোটি টাকা। যার মধ্যে যাদবপুরে ৪১ লক্ষ ও ১০ লক্ষ টাকার দু’টি প্রতারণার মামলা রয়েছে। সমস্ত তছরুপির অর্থ কোথায় গচ্ছিত রাখা আছে অথবা তাঁদের প্রতারণার শিকার আরো কে বা কারা তা এখনো স্বীকার করেন নি এই প্রতারকদল।।


Related Articles

Back to top button