মতামত

বাংলায় বিজেপির ভবিষ্যত

বিপ্লব পাল

এই মুহুর্তের বিলিয়ান ডলার প্রশ্ন ২০২৬ সালে কি বিজেপি বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে? তৃনমূল কি বিজেপিকে অনন্তকাল ঠেকিয়ে রাখতে পারবে?

গণিতের দৃষ্টিতে সামাজিক অর্থনৈতিক বিবর্তন কমপ্লেক্স সিস্টেম-খুব সামান্য ঘটনায় এদিক ওদিক থেকে বিরাট পরিবর্তন আসতেই পারে। এই প্রবন্ধে আমি শুধু নিরেপেক্ষ ভাবে, অতীতের প্যাটার্ন থেকে বিশ্লেষন করব।

বিজেপি বনাম তৃনমূল -একটি জাতীয় পার্টি বনাম আঞ্চলিক পার্টির লড়াই। সাথে সাথে হিন্দুত্ববাদি ফোর্সের সাথে সেকুলার ফোর্স বা মাইনরিটি ভোট কনসলিডেশনের লড়াই। আর মাঝে পড়ে রইল উন্নয়ন সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী সহ দুয়ারে সরকারের মতন স্কিম।

ভারতের রাজনীতিতে এই মুহুর্তে থিম খুব পরিস্কার। জিতলে হলে স্কীম তৈরী করে সরকারি টাকা গরীবদের হাতে দিতে হবে। যা খুব ভাল অর্থনীতির জন্য। বড় বড় শিল্প আনা, সরকারি চাকুরি-এগুলো আজকাল ভোটবাজারে খাচ্ছে না। এর সাথে তিনটে মেইনস্ট্রিম পলিটিক্যাল থিম এখন — বিজেপির প্রো হিন্দুত্ব, বিজেপি বিরোধিতা-মাইনরিটি ভোট কনসলিডেশন আর তার সাথে ভাষাভিত্তিক জাতিয়তাবাদ। যেমন বঙ্গে বাংলা পক্ষ আস্তে আস্তে অনেকটাই বেড়ে উঠেছে। ফোর্স টু রেকন উইথ।

বিজেপি বা তৃনমূলের অর্থনৈতিক বা এডমিনিস্ট্রেটিভ দৃষ্টিভঙ্গীতে পার্থক্য নেই। দুই দলই প্রো মার্কেট প্রো ক্যাপিটাল। এন্টি লেফট। সুধু বিজেপি জাতীয় পুঁজির সাপোর্ট পাচ্ছে। তৃনমূল পাচ্ছে স্থানীয় পুঁজির। অন্যরা যে যা মনে করুক, বিজেপি আসলে বাংলার শিল্পের উন্নতি বা অবনতি হবে না- যা চলছে, তাই চলবে । বাংলায় শিল্প হচ্ছে না, সরকারি চাকরি হচ্ছে না- এগুলো পার্থক্য গড়ে দেবে না।

(২)
২০১৯ সালে লোকসভাতে বাঙালী হিন্দুভোট একজোট হয়েছিল- ২১ এ হল না। কেন? প্রশ্ন হচ্ছে ২০১৯ এ একগাদা বাম ভোট রামে গেছে। সেগুলো কি হিন্দু খতরে মে হ্যায় ডাকে বিশ্বাস করে -না মমতা ব্যানার্জিকে হারাতে? আমি যত এক্স হিন্দু সিপিএম দেখেছি-সবাই মমতাকে হারাতেই বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মোটেই হিন্দুত্বর ভিত্তিতে বিজেপি ভোট পায় নি। সেটা এবার জঙ্গল মহল, কোলকাতার ভোটেই পরিস্কার। ঝাড়্গ্রাম যেখানে মুসলমান ভোট ১০%, সেখানেও বিজেপি হেরেছে ০-৪। কোলকাতায় ৩০-০, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই ৩০%-৪০% অবাঙালী হিন্দু। অর্থাৎ কোলকাতার বাঙালী হিন্দুরা ২০-৩০% লেভেলেও বিজেপিকে ভোট দেয় নি। আমার ধারনা কোলকাতার হিন্দুদের এই ভোট না দেওয়ার কারন, এরা আশঙ্কা করেছিল ক্ষমতা তাদের কাছ থেকে দিল্লীর বহিরাগতদের হাতে চলে যাবে। নো ভোট টু বিজেপি জাতীয় বাম লিব্যারালদের বেস ১% ও না। ওইসব ক্যাম্পেইনে কিস্যু হয় নি।

কিন্ত নদীয়াতে বিজেপি ৯-৮। উত্তরবঙ্গের একদম উত্তরের সব জেলাগুলোতে ক্লীন সুইপ বিজেপির। পুরুলিয়াতে সুইপ করেছে-কিন্ত বীরভূমে গোহারা হেরেছে। পূর্ব মেদিনীপুরে প্রায় টাই। ( ইমেজটা দেখুন)। মুর্শিদাবাদ মালদা দিনাজপুরে মুসলিম ভোটের জন্য তৃনমূল সুইপ করেছে-নইলে ওইগুলো বহুদিন কংগ্রেসের ছিল। এবং কংগ্রেস সংখ্যালঘু ভোট এখানে ভাগ বসাত বলেই ‘১৯ এ বিজেপি কিছু সিট জিততে পেরেছিল।

এই প্যাটার্ন মোটেও হিন্দুত্ববাদ দিয়ে ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারবে না। দুটো জিনিস এখানে ফ্যাক্টর –

এক, জেলা বনাম কোলকাতার দ্বন্দ আছে তীব্র। যত উত্তরে যাওয়া যাচ্ছে, সেই বঞ্চনার তীব্রতা বেশী। নেহাত চাপে এসে উত্তর বঙ্গের মুসলমানরা এবার তৃনমূলকে ভোট দিয়েছে। নইলে উত্তর বঙ্গে কি হিন্দু কি মুসলমান কোলকাতার ক্ষমতাসীন পার্টিদের বরাবর বিরোধিতা করেছে।

দুই, দ্বন্দ থাকলেই হয় না। সেই দ্বন্দকে ভোটবাক্সে তোলার মতন জেলার নেতা থাকা চায়। যেমন শুভেন্দু অধিকারী সেটা পূর্ব মেদিনীপুরে তুলেছেন।

অর্থাৎ যদি কেউ সংখ্যাগুলো গভীরে বিশ্লেষন করে – পশ্চিম বঙ্গের জেলাগুলোতে কোলকাতা কেন্দ্রীক রাজনীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ আছে। কোলকাতার পার্টিগুলো জেলার স্থানীয় যোগ্য নেতৃত্বকে বসিয়ে দিয়ে এম এল এ, এম পিদের আনেন কোলকাতা থেকে ভাড়া করে। অর্থাৎ মার খাওয়ার সময় জেলার নেতা। আর ক্ষীর খাওয়ার সময় কোলকাতায় পেয়ারের লোক-এ বেশীদিন চলবে না। তাছাড়া পশ্চিম বঙ্গের জেলাগুলিতে শিল্পোন্নয়ন খুব কম। মহারাষ্ট্রের একটা জেলায় যা শিল্প আছে, পশ্চিম বঙ্গের সব জেলা মিলিয়েও তা হবে না। নদীয়া বা পূর্ব মেদিনীপুর বা পূর্ব বর্ধমানের মতন সমৃদ্ধ এলাকা কেন শিল্পোন্নত হবে না এদ্দিনেও- তার উত্তর সোজা। কোলকাতার বঞ্চনা এবং বামপন্থার পাপ। বামপন্থার পাপমোচন শাপমোচন সব হয়ে গেছে। কিন্ত কোলকাতার নেতাদের বঞ্চনা এখনো যায় নি।

সুতরাং পশ্চিম বঙ্গের রাজনীতির ডমিন্যান্ট থিম- কোলকাতা বনাম জেলা। কিন্ত এই ক্ষোভ বিজেপি ভোট বাক্সে তুলতে ব্যার্থ। কারন তারাও বাইরে থেকে নেতা তুলে বসাচ্ছে।

বিজেপি যদি পশ্চিম বঙ্গে জিততে ইচ্ছুক হয়- তাদের স্ট্রাটেজিতে ৫ দফা দর্শন দরকার

[১] জেলায় জেলায় শক্তিশালী নেতা দরকার -বাইরের লোকেদের জেলাতে চাপালে সেই তৃনমূলের কেসই হবে।

[২] বাংলায় মুখ্যমন্ত্রীর মুখ দরকার। সেটাও মিডিয়া দিয়ে তৈরী করতে হবে ধীরে ধীরে। মোদির মুখ দেখিয়ে কিস্যু হবে না।

[৩]জেলা বনাম কোলকাতার দ্বন্দকে মূল ন্যারেটিভ করতে হবে।

হিন্দুত্ববাদের ন্যারেটিভের ওপর ভিত্তি করে বিজেপি কোনদিন ক্ষমতা দখল করতে পারবেনা। কারন তাদের ভোট বেস এক্স সিপিএম হিন্দু। যারা সফট হিন্দুত্ববাদি, সফট বাংলাজাতীয়তাবাদি, সফট বাম। হার্ড হিন্দু লাইন এখানে ঝাড় খাবে।

হিন্দুদের মুসলমান জুজু দেখিয়ে খুব বড়জোর ৪০% পর্যন্ত বাঙালী হিন্দু পোলারাইজড হবে। কিন্ত মোদির যা অর্থনৈতিক পারফর্মান্স, বেসরকারিকরন ইত্যাদি দেখে সেটা বাংলায় ২০-৩০% এর বেশী যাবে না। আসামে যে হিন্দু ভোট ৬৫% লেভেলে পোলারাইজড, সেটার কারন দুটো। এক, রাজ্যে উপযুক্ত নেতা আছে। দুই বিরুদ্ধে কোন শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতা নেই।

[৪]বাঙালী বনাম বিজেপির হিন্দুত্বর দ্বন্দ খুব স্ট্রং। যেসব রাজ্যে তাদের আঞ্চলিক জাতিয়তাবাদের সাথে বিজেপির ভারতীয় জাতিয়তাবাদের দ্বন্দ খুব বেশী- যেমন তামিল, মালইয়ালী, গুল্ট বেল্ট-এগুলোতে বিজেপি ঢুকতেই পারে না। বিহারি, অসমীয়, মারাঠি জাতিয়তাবাদের সাথে বিজেপির ভারতীয় জাতিয়তাবাদের দ্বন্দ কম। সেখানে বিজেপি ভাল ফল করে । বাঙালী জাতিয়তাবাদ কিছুটা মারাঠিদের সমান। সুতরাং বাংলাতেও বিজেপির ভাল ফল করা উচিত-যদি বাংলা বিজেপির নেতারা বাঙালী জাতিয়তাবাদের সাথে রাষ্ট্রের জাতিয়তাবাদের মেলবন্ধন করার মতন শিক্ষিত হয়। কিন্ত বঙ্গ বিজেপিতে সব ধান্দাবাজের দলের লাইন। এই কাজটি সহজ। কিন্ত সেই টুকু করার মতন লোক বিজেপিতে নেই। ওরা একটা সাংঘার্ষিক ভারতীয় জাতিয়তাবাদ সামনে আনছে- যা বাঙালী জাতিয়তাবাদের বিরোধি। আপনি কোন মারাঠি বিজেপি নেতাকে দেখেছেন মারাঠি মুসলমানদের বিরুদ্ধে নোংরা কথা বলতে? তারা মারাঠি অস্মিতাকে আগে গুরুত্ব দেয়। আর বাংলার বিজেপি নেতারা বাঙালীত্বকে ছেড়ে- বাঙালী মুসলমানদের অবাঙালী বানায়। কারন তারা হিন্দু না। এই লাইন বাংলায় চলবে না। এখানে বাঙালীদের আগে গুরুত্ব দিতে হবে।

[৫] তৃনমূলকে হারাতে মহিলা ভোট ফ্যাক্টর হবে। সেক্ষেত্রে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীর মুখ হিসাবে কোন মহিলাকে তুলে আনতে হবে। বিজেপির মহিলা মুখেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিনয়ের জগত থেকে এসেছেন। মমতা ব্যানার্জীর মতন স্ট্রীট ফাইটার নেই। ধরুন লকেট চ্যাটার্জি বা রূপা গাঙ্গুলীকে বিজেপির মুখ করা হল। কিন্ত বিজেপিতে তাদের মানবে কে?

মোটামুটি ভাবে বিজেপি আসতেই পারে-কিন্ত ১ থেকে ৫ নাম্বার পয়েন্ট দেখলে পরিস্কার বিজেপি এই পাঁচটা পয়েন্ট থেকে অনেক দূরে। সুতরাং তৃনমূল নিরাপদ।

তবে তৃনমূলকে কোলকাতা বনাম জেলার এই দ্বন্দের ব্যপারটা মাথায় রাখতে হবে। প্রতিটা জেলায় শিল্প, পুঁজির বিকাশ দরকার। যা সিপিএমের ৩৪ বছরে হয় নি। তৃনমূলের ১০ বছরে হাল্কা গতিতে হয়েছে।

বিজেপি যদি এই কোলকাতা বনাম জেলার দ্বন্দকে কাজে লাগাতে পারে, তবেই চান্স আছে। হার্ড হিন্দুত্বের লাইনে খুব বেশী হলে ১০০-১১০ সিটের বেশী কোনদিন পাবে না। মমতা শিল্পায়নে ব্যর্থ-সেটাও খাবে না-কারন বিজেপি গোটা দেশে ব্যর্থ।

আরও পড়ুন ::

Back to top button