মতামত

ইয়াসের তাণ্ডবে বিপন্ন সুন্দরবনের মানবজীবন

মৃত্যুঞ্জয় সরদার

ছাব্বিশে মে ২০২১ দিনটি ভারতবর্ষে সুপার সাইক্লোন এর ইতিহাসের স্মরণীয় দিন যেন সুন্দরবনের কাছে।। ভুক্তভোগীরা ইতিহাস যতদিন বাঁচবে ততদিন ভুলবেনা।২০০৯-এর ২৬ মে থেকে ২০২১-এর ২৬ মে। ঠিক ১২টা বছর, একটা যুগ। ঘূর্ণিঝড় আয়লার যুগান্তরে আঘাত হানল ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। আর আরেকবার আয়লার স্মৃতি মনে করাল উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন লাগোয়া বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের। কোটালের ওপর ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে মুহুর্মুহু ভাঙল বাঁধ। ফের লোনা জলে প্লাবিত হল কৃষিজমি। প্রশ্ন হল, তাহলে ১২ বছরে হলটা কী?প্রতি বছর নিয়ম করে নদী বাঁধ মেরামত বাবদ একটা বাজেট ধরা থাকে সরকারের, তা সেচ দপ্তর ও পঞ্চায়েতের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়। গ্রামের লোকেরও কিছু রোজগার হয়, বহু জায়গায় একশোদিনের কাজের সাথেও এটাকে এখন জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়টা অতো সহজ নয়, কারণ নদী ও প্রকৃতি কারুর কথা শুনে চলে না। যে বিপুল ম্যানগ্রোভ অরণ্য এই দ্বীপগুলির পাশে পাশে ছিল, জলের কাছ পর্যন্ত, অধিকাংশ জায়গায় তা আর নেই অনেক বছর ধরে, আর ভাঙ্গনের হারও সব জায়গায় সমান নয় যে, কোনোরকমে তাপ্পি মেরে চলে যাবে৷

বহু জায়গায় নদী বাঁধ সাঙ্ঘাতিক ভঙ্গুর অবস্থায় বছরের পর বছর থাকে আর তার পাশেই চরম অনিশ্চিত জীবন কাটাতে থাকেন সুন্দরবনের মানুষ। প্রতি বর্ষা ও ঝড়ের ঋতুতে বাঁধে মাটি ফেলা হয়। কোনোরকমে চলে যায়। যতক্ষণ না একটা আয়লা বা আমপান এবং ইয়াস আসছে।এ তো হামেশাই হচ্ছে, প্রতি বছর- একবার, দু’বার, তিনবার। গোসাবা থেকে পাখিরালা যাওয়ার রাস্তাটা এখন পাকা হয়ে গেছে, ঝকঝকে ম্যাজিক গাড়ি কুড়ি মিনিটে পৌঁছে দেবে। মধ্যবিত্ত পকেটে নানান রঙের ছোটবড় লজের ইতিউতি, সেঁধিয়ে যাও- ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বিকেলের পড়ন্ত সূর্যটাকে বগলদাবা করে এদিক সেদিক বিক্ষিপ্ত হাঁটাহাঁটি। ছোট-বড় দোকানে বাচ্চাদের খেলনা, সফট টয়ের অবতারে স্বয়ং দক্ষিণরায় চেয়ে আছেন ড্যাবড্যাব করে। চায়ের পাতা ফুটতে দিয়ে আটপৌরে করে শাড়ি পরা দোকানি সন্ধে দেন। ঠিক উল্টোদিকেই ছিল বেশ বড় চাষের জমি, আয়লা ও আমফান ঝড়ের নুন এখনও বেরোয়নি মাটি থেকে। অগত্যা দোকান- ব্যবসা ভালোই, সারা বছরই ট্যুরিস্টের আনাগোনা তো এই বাদাবনে! কিন্তু দোকানটা এই বছর আস্ত থাকবে তো, একেবারে বাঁধের ওপর! এ নদী মাতলা বা রায়মঙ্গলের মত চওড়া নয়- কিন্তু তাতে কি? চন্দ্রবোরার মতোই বিষাক্ত তার ছোবল ইয়াস্।
কিন্তু এ তো আকছার ঘটে, বছরের পর বছর। এ আর নতুন কী, আগেও তো হতো! আচ্ছা কত আগে?

এক বছর আগে জল বয়ে গেছে মাতলা নদী বেয়ে। শহর বেড়ে উঠেছে তার শাখা প্রশাখা—সহ। গ্রামের মানুষ বাঁধ বেঁধেছে নদীতে, মাটি ইট আর নারকেল পাতা জোগাড় করে। চরঘেরি, কুমিরমারী, ত্রিপলিঘেরি, দয়াপুর বিভিন্ন গ্রামে মাটির বাড়িতে ইটের সিমেন্টের প্রলেপ। রাজ্যের ওপর দিয়েও শন শন পরিবর্তন এর হাওয়া বয়, লাল দল হয় সবুজ দল- কিন্তু বাঁধের অবস্থা সেই একই থেকে যায়। আর থেকে যায় সেই বিশাল গভীর ছায়াপথটা- নদীর ঠিক ওপরে।

নোনা ক্ষত বুকে চেপে মানুষ অ্যাম্ফান জল ছাঁচে, রাস্তা বেশ অনেকটা পাকা এখন ঘরে ঘরে সিএফএল আলোর ছোঁয়া, ধান বোনে মানুষ। বনরক্ষকরাও বন্ধু – জঙ্গল ঘিরে বসেছে নাইলনের জাল, বাঘ বেরোয় কালেভদ্রে। নানানরকম বিকল্প রোজগারের হাতছানি গোটা বাদাবনে, মুরগি পালন করো, মাছ চাষ করো- সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রেখেছে মানুষ। এবার তাহলে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই?মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় পেল না, এক বছরের মধ্যে ইয়াস আসবে পড়ল সুন্দরবনে জলে জলা মগ্ন হয়ে গেল গোটা সুন্দরবন।
প্রত্যেক বছরই সাইক্লোনে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূলবর্তী এলাকা। সুন্দরবন এলাকায় মেরামত হতে না হতেই প্রত্যেকবার ভাঙে বাঁধ। এক দিকে যেমন জনবসতি এলাকা প্লাবিত হয়ে বিপদের মুখে পড়তে হয় মানুষকে। অন্য দিকে, প্লাবিত হয় জঙ্গলও। বন্য প্রাণীদের আতঙ্কিত হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা গিয়েছিল আয়লার সময়। ইয়স দিনও জল বাড়তেই ভেসে এল একের পর এক হরিণ।বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হওয়ার দরুন সুন্দরবনে কোন ভারি শিল্প হওয়া সম্ভব নয় ওদিকে প্রতি বছর বাঁধ ভেঙে ভেঙে নদীর নোনা জল ঢুকে চাষ আবাদের অবস্থাও তথৈবচ। এমত অবস্থায় সুন্দরবন থেকে আমপান পরবর্তী অবস্থায় বিপুল পরিযায়ী শ্রমিকদের ঢল নামতে পারে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই এমন কিছু করা দরকার যা এই বিপুল মাইগ্রেশনকে, মানুষের এই অবর্ণনীয় কষ্টকে আটকাতে পারে। এমন কিছু জরুরিরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদীকে।

তবে সুন্দরবনের ১০০০০ বর্গ কিমির বেশির ভাগটা (৬০ শতাংশ) পরে বাংলাদেশে। কিন্তু সেখানকার জনসংখ্যা মাত্র ২০ লক্ষ, আর ভারতের ৪০% ভাগ সুন্দরবনের জনসংখ্যা ৪৫ লক্ষ। বাংলাদেশের সুন্দরবনের একটা বড় সমস্যা হল ট্রপিকাল সাইক্লোনের মুহুর্মুহু আক্রমণ। তার মধ্যে সিডর ২০০৭ সালে যে ধ্বংসলীলা চালায়, তেমনটা আয়লা, আমপান, বুলবুল, ফণি,ইয়াসচাক্ষুষ-করা পশ্চিমবঙ্গ দেখেনি। বাংলাদেশের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের জৈববৈচিত্র্য অনেক বেশি, সেটার কারণ ক্রমাগত মিষ্টি জলের প্রবাহ, যেটা ভারতের পূর্ব সুন্দরবন, যেখানে আছে প্রজেক্ট টাইগার, সেখানেও (হয়তো ঘনত্ব বেশি) অনেক কম। প্রকৃতপক্ষে ভারতের সুন্দরবনের সপ্তমুখীর পর থেকে মাতলা, বিদ্যাধরী, ঠাকুরান, হরিণভাঙ্গা নদীগুলো পুরোপুরি সমুদ্রের জলে পুষ্ট ও এদের উপরিভাগের মিষ্টি জলের প্রবাহ মনুষ্যকৃত কারণে বুজে গিয়েছে বহুদিন। বহুদিন ধরে এর উপর অনেক গবেষণা হয়েছে এবং উপগ্রহ চিত্র ও অন্যান্য পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে ভারতীয় সুন্দরবনের একটা বড় অংশ জুড়ে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের এক ভীষণ ক্ষয় হচ্ছে, তার গঠন ও বৃদ্ধি হৃাস পাচ্ছে, তার সবুজের পরিমাণ কমে যাচ্ছে ও গাছগুলো দুর্বল হয়ে গিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে লড়ার শক্তি হারিয়ে চলেছে।গত পঞ্চাশ বছরে সুন্দরবনে যত বড় বড় ঝড় হয়েছে তার বেশির ভাগটাই গেছে বাংলাদেশে। তবে তার মধ্যে সুপার সাইক্লোন সিডর আর আয়লা ছিল ভয়াবহ।এর থেকে আরও ভয়াবহ ঘটেছিল আম্ফান। আম্ফান এর পরে আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে এই ইয়াশ। সিডর মুলত বাংলাদেশের উপকূল ভাগ আর কক্সবাজার অঞ্চলের ভয়ানক ক্ষতি করে, কিন্তু আয়লা ছিল বহু বছরের মধ্যে এমন একটা ঝড় যা ভারতের সুন্দরবনকে মাত্রাহীন বিপর্যয়ে ফেলে। নদীতে জোয়ার থাকায় আয়লায় ভারতীয় সুন্দরবনের ৭৭৮ কিমি নদী বাঁধ ভেঙ্গে যায়। হু হু করে জোয়ারের জল ঢুকে সব চাষের জমি ও মিষ্টি জলের পুকুর ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ইয়াস ঘূর্ণিঝড়ের ফলে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় সুন্দরবনের জলোচ্ছ্বাস বেড়ে গিয়ে কৃষিযোগ্য জমি নষ্ট হয়, মানুষের জীবনে নেমে আসে চরম সঙ্কট। ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ শেষ হতে না হতে দাবি ওঠে, এইভাবে চলবে না, নদী বাঁধের পাকাপাকি একটা বন্দোবস্ত করতে হবে। এখন সেই বন্দোবস্ত, সেই বিধান রায়ের আমল থেকেই হচ্ছে। হল্যান্ড থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন, পথও বাতলেছিলেন কিছু, কিন্তু খরচের বহরে সরকার পিছু হটেছিল বছরের পর বছর।  সেবারে কেন্দ্রীয় সরকার আয়লা টাস্কফোর্স গঠন করে সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের বড় বড় আমলা ছিলেন, তাঁদের মদতে ও পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন বিষয়ক ও সেচ দপ্তরের কর্তাদের বুদ্ধিতে একটা ৫০৩২ কোটি টাকার প্রকল্প গঠিত হয়।

পরিকল্পনা করা হয় গ্রামের দিকের অধিক জমি অধিগ্রহণ করে শক্ত মাটির ভিতের উপর বেছানো হবে বিশেষ ধরনের পলিপ্রপিলিন শিট আর তার উপর ব্রিক সিমেন্ট পিচিং করে তৈরি করা হবে উঁচু বাধ। সুন্দরবন বিষয়ক সমস্ত বিশেষজ্ঞ এর প্রতিবাদ রিকর। বিশেষ করেআমি নিজে। তাঁদের সকলেরই বক্তব্য ছিল, সুন্দরবনের মতো সদাই গতিশীল মোহনায় এইরকম ইটের বাঁধ বেশিদিন স্থায়ী হবে না, আর সুন্দরবনের মতো জীববৈচিত্র্যপূর্ন অঞ্চলে পলিপ্রপিলিন সিট দিয়ে বাঁধ বানানো চরম ভুল ও অন্যায় কাজ। বরঞ্চ স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য পূর্ণ ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্যের প্রাচীর ও বাঁশের চাটাই দিয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ বানানো সম্ভব। কিন্তু সে সব কথা কেউ কানে তোলেনি। বেশ কিছু নামকরা কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে কাজের বরাত দেওয়া হয়, যারা কোনোদিন সুন্দরবনের মতো অঞ্চলে কেন কোথাওই কোনও নদী বাঁধ তৈরি করেনি। তারা সুন্দরবনে মাটি কাটার যন্ত্র নিয়ে নেমে পড়লেন বাঁধ বানাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চরম ব্যর্থতার মুখে পড়ে এই প্রকল্প। প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় জমি। গ্রামের মানুষ কোনোমতেই চাকরি বা বাজার মূল্যে যথেষ্ট মোটা টাকা ছাড়া বাঁধের জন্য জমি দিতে রাজি নয়, সরকার বহু জায়গায় জমির অধিগ্রহণ করতে গিয়ে দেখে জমির সঠিক কোনও মালিক নেই, এই সব নানান বিবাদে সিকি ভাগ কাজ এগোয় না। ততদিনে রাজ্যে বাম আমল বদলে তৃণমূল। জমি জটে কাজ আটকে চলে আসে ২০১৪। ইউপিএ-২ আমলের প্রকল্প তায় আবার অগ্রগতি খুবই খারাপ, মোটামুটি মৃত্যু ঘণ্টা বেজে যায়, আয়লা বাঁধ তৈরি প্রকল্পের। যদিও আমপানের পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সুন্দরবন বিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, তারা না কি এখনও এই টাকা পাওয়ার আসা রাখেন।ইয়াস ঘূর্ণি ঝড়ের তান্ডবে অত্যান্ত জলোচ্ছ্বাস এর ফলে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুন্দরবন এ জনবসতি এলাকা যেভাবে জলের তলে তলিয়ে গেল। আর নেতা মন্ত্রী ও রাজ্যের কর্মকর্তাদের উপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে এলাকাবাসীরা।ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের জন্য আগে থেকেই সরানো হয়েছিল নীচু এলাকার বাসিন্দাদের। তাতে প্রাণহানি এড়ানো গেলেও বাঁধ ভেঙে জল ঢোকায় অনেকের ফেরার জায়গা রইল না। অনেকের ফসল গেল লোনা জলের তলায়। যে জমিতে আবার কবে চাষ করা যাবে জানেন না চাষিরাও। অনেক জায়গায় বুক দিয়ে বাঁধ আগলাতে দেখা দেল যুবকদের।এদিন নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীকে এই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শোনা যায়। ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসে যে সুন্দরবনের নদীবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে তা স্বীকার করে নেন তিনি। সেচ দফতরের সচিবকে বলেন, আপনার দফতরের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সব থেকে বেশি। কী করে স্থায়ী ভাবে বাঁধ মেরামত করা যায় তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। প্রতি বছর বাঁধ ভাঙবে আর সরকার টাকা দেবে, এটা হতে পারে না।

তবে সুন্দরবনের বাঁধগুলির অবস্থা যে শোচনীয় তা কারও অজানা ছিল না। বিধানসভা নির্বাচনের মুখে প্রাক্তন সেচমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিলে জানা যায়, সেদ দফতরের অধীনে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোতেই দফতর হারাতে হয়েছিল তাঁকে। বনদফতরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিগত দিনের ইতিহাস যা জানাযায় প্রথমেই তাঁরা যেটা করেন সেটা হল, ম্যানগ্রোভ জঙ্গল সাফ করে, যাবতীয় বন্য প্রাণীদের বিতারণ করা আর তারপর ভরা জোয়ার আর কোটালের জল যাতে দ্বীপে দিনে দু’বার ঢুকে পড়ে চাষবাস আর বসবাসের জমি ভাসিয়ে না দেয় তাই নদীর তীর বরাবর বাঁধ তৈরি করা হয়। এটার কারণ যেখানে তাঁরা বসত গড়েছিলেন সেই জায়গাগুলো কোনোদিনই মাটি ফেলে এত উঁচু করা হয়নি বা যায়নি যাতে জোয়ারের জল ঢোকা আটকানো যায়, আর নদীর নোনা জল ঢুকলে তো চাষাবাদ কিছু করা যাবে না, খাওয়ার জল পাওয়া, জীবন কাটানোই মুশকিল হবে। তাই যত দ্বীপে মানুষ বসবাস করতে শুরু করল, ১০২টা  দ্বীপের মধ্যে ৫৪ খানা দ্বীপে এরকমই মাটির দেওয়াল বা বাঁধ দেওয়া হল। আর সেটা করতে গিয়ে আর মানুষের বসতি ও জীবনধারণের বন্দোবস্ত করতে গিয়ে প্রায় পুরোটাই সরিয়ে দেওয়া হল ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। ফল হয়েছে এই স্বাভাবিক জোয়ার ভাটায় পলি আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গল এলাকার তুলনায় এই মানুষের বসবাসকারী দ্বীপগুলো হয়ে গেল আরও নিচু, আর স্বাভাবিক জোয়ার ভাটার বাধা পাওয়ায় নদীখাতেও নানান বদল দেখা দেয়, কোথাও তা পাশের দিকে চওড়া হয়, কোথাও হয় সরু।

কিন্তু বছরে ২০ মিলিয়ন টন পলি বহন করে নিয়ে আসছে যে গঙ্গা নদী সেটা এই হুগলি মাতলা মোহনা অঞ্চলে এই ভাবে বাধা প্রাপ্ত হয়ে আঁকাবাকা পথে নদীখাতের নানান অংশে জমতে থাকে, আর তার উল্টোদিকেই জলের তোড়ে বাঁধের মাটি তলা থেকে সরে গিয়ে ভাঙ্গতে থাকে পাড়। এমন করেই গড়ে উঠেছে ৩৫০০ কিমি ব্যাপী এক নদী বাঁধ যা সুন্দরবনের মানুষের জীবন, জীবিকা, রাজনীতি আর অর্থনীতির এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।তবে সুন্দরবনের নানান অঞ্চলে নোনা ও মিষ্টি জলের মাছের চাষ একটা বড় রোজগারের পথ। তবে নোনাজলে মাছ চাষ মূলত বসিরহাট, ন্যাজাট, ভাঙর, হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জে বেশি, কিছুটা কাকদ্বীপ, পাথরপ্রতিমা  ও নামখানা অঞ্চলেও, আর তা মূলত ভেনামি চিংড়ির (আগে ছিল বাগদা) চাষ, সাথে অন্যান্য নোনা জলের মাছ, যেমন পারশে, ভাঙন, ভেটকি যা নদীর জলের সাথে চলে আসে তার ভেড়ি। জায়গায় জায়গায় মিষ্টি জলের রুই, কাতলা, পাবদা, গলদা চিংড়ির চাষ করা হয়। আয়লার মতো আমপানেও নদীর নোনা জল ঢুকে যাওয়ায় মিষ্টি জলের মাছ মারা গেছে। নোনাজলের মাছ জলে ভেসে গেছে। এই সব ভেড়ি বা পুকুরের পাড় খুব নিচু হওয়ায় এবং পাড়ের চারদিকে জাল না থাকায় বা ঝড়ে উড়ে গিয়ে মাছ ভেসে যাওয়া স্বাভাবিক। মাছ ভেসে যাওয়া বা পুকুরে বাইরের জল ঢোকা আটকাতে গেলে পাড় খুব উঁচু করতে হয়, আর তার ধারে জালের বেড়া দিতে হয়, যা জোরালো ঝড়ে না ছিঁড়তে পারে, তাই হালকা করে বেঁধে ভারি বাঁশের ওজন দিয়ে জায়গায় রাখতে হয়।পুকুরগুলো এই ভাবে তৈরি করালে এই বিপর্যয় হতো না। এখন প্রশ্ন হল আপাতত কী করা যাবে। প্রথমে আসা যাক নোনাজলের মাছ চাষে। ভেনামি চিংড়ি একটি বৈদেশিক প্রজাতি এবং এর চাষের সাথে পরিবেশের সমস্যা, যেমন দূষণ, ম্যানগ্রোভ ধ্বংস ইত্যাদি ও চিংড়ির বড় ব্যবসায়ীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটা কার্টেল তৈরি হয়ে অর্থনৈতিক শোষণের এমন অবস্থা হয়েছে যে আন্তর্জাতিক পরিবেশ নজরদারি সংস্থা গ্রিনপিস একে লাল তালিকাভুক্ত করে দেশে দেশে সুপারমার্কেটে প্রচার চালায়। বাগদা চাষও একই রকম ক্ষতিকারক। এই চাষের জন্যই আরও ম্যানগ্রোভ ধ্বংস হয়েছে।

ভারতের নানান রাজ্যে, রাজ্য সরকারগুলো এই চাষ বন্ধ করতে বহুদিন ধরে চেষ্টা করছে। কিন্তু নীতিপঙ্গুতার জন্য পারছে না। এর থেকে বেড়িয়ে আসার একটা ভালো পথ হল, ভাসমান খাঁচায় নোনা কাঁকড়া চাষে বাহবা দেওয়া। কাঁকড়া  চাষ অনেক প্রাকৃতিক ও সহজ এবং এতে ক্ষতি কম। ম্যানগ্রোভ রেখেও করা যায়। শুধু বনদপ্তরের বনের নানান অঞ্চলে মৎস্যজীবীদের ছোট খোসা কাঁকড়া ধরার ইজারা দেওয়া দরকার। বনের অধিকার আইন ব্যবহার করে বাঘ সেনসাসের সময় যেমন সুরক্ষার বন্দোবস্ত করা হয় তেমন ভাবে রোটেশনে এলাকা ভাগ করে করে বনের নানান ব্লকের খাঁড়িতে এই ব্যবস্থা করা যায়। এই খোসা কাঁকড়া ২০-২৫ দিনে ভালো ভারি ও মোটা হয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খুব ভালো দামে বিক্রি হয়, দেশেও বেশ চাহিদা। পরিবেশ কর্মী ও সমাজ কর্মীদের উচিত হবে বনদপ্তরের উপর এই বিষয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা। এটা না হলে বেআইনি কাঁকড়া ধরা চলবে ও বনদপ্তরের অসহযোগিতায় এরা চরম নির্যাতিত হতেই থাকবে। আইনি ব্যবস্থা ও সুরক্ষা বাড়লে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারানো কমবে, আর যদি কখনও এমন দুর্ঘটনা ঘটেও লোকে জীবনবিমার টাকাটা পাবে।নোনা হয়ে যাওয়া জলে সি উইড বা নোনা শ্যাওলার চাষ খুব লাভজনক হতে পারে।

নতুন করে নোনা জল ঢোকানোর দরকার নেই। ম্যানগ্রোভের নিউম্যাটোফোরের গায়ে হয়ে থাকা বেশ কিছু শ্যাওলা যেমন এন্টারোমরফা, উলভা প্রভৃতিকে নোনা পুকুরে দিব্যি চাষ করা যায়। এই শ্যাওলার বিপুল খাদ্য গুণ, উত্তম পশু খাদ্যও বটে এবং নানান ধরনের শিল্প যেমন কনফেকশনারি, বায়োটেকনলজি শিল্পে এর প্রচুর চাহিদা। সুন্দরবনে এমন চাষ করে সফল ভাবে দেখানো হয়েছে।৫ এখন খালি বৃহৎ উদ্যোগের দরকার।সুন্দরবনের আপাতত অল্প লবনাক্ত হয়ে যাওয়া পুকুর গুলোতে ট্যাংরা, গুলশে, তেলাপিয়া এসব মাছ করা যাবে। এসব মাছের চাষ তিন থেকে ছয় মাসে শেষ হয় ও লাভজনক। মিষ্টিজলের মাছ চাষ করতে গেলে পুকুরের নোনাজল ও তলার নোনা কাদা মাটি পাম্প ও স্লাজ পাম্প দিয়ে বার করে, পুকুরে ক্ষারত্ব ও অম্লত্বের প্রকারভেদে জিপসাম বা চুন দিয়ে ট্রিট করে বর্ষার জল ভরতে হবে। পুকুর শুকিয়ে নিলে আরো ভাল হয়। সবক্ষেত্রেই পুকুরের পাড় উঁচু করতে হবে ও এবিষয়ে মৎস্য বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে নিলে ভাল হবে।

আরও পড়ুন ::

Back to top button