জানা-অজানা

কে এই খান স্যার!

সানাউল্লাহ খান

দ্বাদশ শ্রেণিতে AIEEE পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেও ‘ঘুমের’ কারণে পরীক্ষা দেওয়াই হয়নি উনার। গ্র্যাজুয়েশানে এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটিতে ছাত্র আন্দোলনের জন্য তিনবার জেলেও গেছেন। মামাবাড়ি ছিলো ইতিহাস প্রসিদ্ধ মগধে যার বর্তমান নাম বিহার। বলা হয় একদা মগধ ছিলো অত্যন্ত শিক্ষিত আর সম্পদে ভরা গোছানো রাজ্য। যেখানে জন্মেছেন আর্যভট্ট, চানক্য প্রমুখ বিদ্যবান। ওখানেই তিনি খুলে ফেললেন একটা কোচিং সেন্টার, নাম রাখলেন “খান জি. এস. রিসার্চ সেন্টার”। প্রথমে বাড়ি ভাড়া নিতে গেলে মালিক সোজাসুজি বলে দেয় মুসলিমদের ভাড়া দেবেন না। হ্যাঁ তিনি মুসলিম ছিলেন। নাম এম. খান। সবার কাছে খান স্যার। কিছুকাল পরে ওই বাড়ির মালিক রক্তের খোঁজে উনার কোচিং সেন্টারে আসেন। উনি শুনেছিলেন ওখানে সকল ছাত্রছাত্রীরা রক্ত দান করেন প্রতিবছর । মালিক এসে চিনতে পারেন স্যারকে। মজার ছলে স্যার প্রশ্ন করেন, কার রক্ত লাগবে হিন্দু নাকি মুসলমান? লজ্জিত মালিক নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমাও চান শেষে।

সত্যি বলতে এ. পি. জে. আব্দুল কালাম স্যারের পরে যদি কোনো মুসলমান আমায় প্রভাবিত করে তা হলো খান স্যার। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিহারের সর্ববৃহৎ কোচিং সেন্টার উনার বললে কিছু ভুল বলা হবেনা। যেখানে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা প্রতি ক্লাসে দেড় থেকে দুই হাজার জন মিনিমাম হয়ে থাকে। দূর থেকে ওদের ভিড় দেখলে যে কারুর মনে হতে বাধ্য কোনও বৃহৎ মেলা কিংবা জনসভা চলছে বোধহয়। সিট ভর্তি হয়ে গেলে বাকিরা বাইরে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্দ্বিধায় ক্লাস করে যায় ভাবলেই কেমন মনটা ভরে ওঠে। একটা মানুষের কাছে শুধু পড়ার জন্য এতো ভিড় হয় তা সত্যি অবাক করে সবাইকে।

করোনা আবহে অফ লাইন ক্লাস বন্ধ হতে উনি শুরু করেন অন লাইন পড়ানো। ডেটটা পঁচিশ এপ্রিল উনিশ ছিলো যেদিন ইউটিউবে তিনি “খান জি. এস. রিসার্চ সেন্টার” নামে চ্যানেলেটি খোলেন। মাত্র কয়েক মাসে মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার ছুঁয়ে ফেললেন অসাধারণ পড়ানোর দক্ষতা দিয়ে। ঠিক তখন থেকেই আপামর জনসাধারণের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন খান স্যার। চার দেয়ালের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে উনার পড়াশোনা ছড়িয়ে পড়লো আট থেকে আশি সকলের মধ্যে। চারিদিকে আজ উনার অসংখ্য গুণমুগ্ধ ফ্যান। ইউটিউবে আট নম্বরে জায়গা পেয়েছেন। ইউ পি এস সি, রেল, পলিটেকনিক , জি. এস, পি এস সি, ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, জীবন বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, পদার্থ বিজ্ঞানের পাশাপাশি দেশ ভাগ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, কার্গিল, বিদেশ চুক্তি, একুশের বাজেট, জি. ডি. পি., জি. এস. টি., অপ্টিক্যাল ফাইবার, এয়ারপোর্ট কিংবা রেলের আসা যাওয়া সিগন্যাল রুট…. কি নেই উনার পড়ানোতে । অল ইন ওয়ান বলা যায় নির্দ্বিধায়।

আইপিএস অফিসার অরুণ বাতরা তার ওয়ালে খান স্যারের ভিডিও শেয়ার করে বলেন, উনার সময়ে এই শিক্ষক যদি থাকতেন তিনি টপ করতেন। শুধু আইপিএস অফিসার নয়, চলচ্চিত্র জগতের নামী দামী মুখ কিংবা অন্য কোনো বড়ো বড়ো র‌্যাঙ্কের অফিসাররা উনার ভিডিও রোজ ফলো করেন ও শেয়ারও করেন। সম্প্রতি প্রখ্যাত অভিনেতা অনুপম খেরও শেয়ার করেন উনার ভিডিও।

উনার সহজ ভাষা ও উপস্থাপন কৌশল কিংবা কংক্রিট তথ্য প্রদান ও সাধারণ থেকে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে তুলে আনা জ্বলন্ত উদাহরণ গুলো মানুষের মনে আরো বেশি করে আগ্রহ বাড়িয়েছে এটা বলা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কঠিন কে সরল করার দক্ষতা। কঠিন কঠিন তাত্ত্বিক বিষয় কিংবা কঠিন নাম সংকেত থিওরী সবকিছু এত সহজে মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পারেন যা উনাকে না জানলে না দেখলে আমিও বুঝতে পারতাম না। মাঝে মাঝে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে ফোন আসে উনার কাছে কারণ হিসেবে বলা যায় রাজনৈতিক কিংবা দেশের জাতীয় সমস্যা নিয়ে তৈরি করা ভিডিও শেষে সমাধানের রাস্তা এত সুন্দর করে উপস্থাপন করে তোলেন যে আচ্ছা আচ্ছা গোদিধারীদেরও ভাবতে বাধ্য করে। পড়ার মাঝে ইউটিউবে অ্যাড এসে গেলে ছাত্রছাত্রীদের অসুবিধা হবে ভেবে আজ অবধি কোনো স্পন্সর নেন নি যেখানে হাজার হাজার মানুষ ইউটিউবে শুধু স্পন্সর থেকে অনেক টাকা আয় করে চলছেন।

এমন মানুষদের সত্যি বলতে কোনো প্রচার লাগে না কোনো উপহার লাগে না কোনো বিশাল অর্থের প্রয়োজন পড়ে না….. শুধু তাঁরা চান মানুষ গুলো যেনো শিখতে পড়তে পারে অতি সহজে । অনন্তকাল ধরে অভিনেতা, অভিনেত্রী, পলিটিক্যাল চরিত্র কিংবা গবেষক প্রমুখদের লেখালেখিতে গানে কিংবা সিনেমাতে তুলে ধরা হয়েছে তাদের কর্মকাণ্ড। এখানে বলে রাখা দরকার আই আই টি বিখ্যাত আনন্দ স্যারকে সবাই চেনে, তবে বোধহয় “সুপার থার্টি” সিনেমা সবাইকে বেশি করে জানতে সুযোগ করে দিয়েছিলো উনাকে। তেমনি খান স্যারের কর্মকান্ড বড়ো পর্দায় এলে আপামর জনসাধারণ জানবে এবং ধীরে ধীরে পড়ার কিংবা শেখার জগতে একটু একটু করে এগোবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

উনি বলেছিলেন, গড়ানো পাথরে শ্যাওলা ধরে না আর জমে থাকা জল সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়। যদিও এই কথার অর্থ বুঝতে আই আই টি করতে হয় না তবুও একটা কথায় তিনি বিশ্বাসী, শিক্ষার পথে পরিশ্রম করে এগিয়ে গেলে জীবনের লক্ষে সাফল্য আসবেই আর তা না করে থেমে গেলে জীবন থেকে সব আস্তে আস্তে হারিয়ে যাবে।

একদিকে আজকালকার শিক্ষায় বেশিরভাগ শিক্ষক ইংরেজদের দেখানো পথেই শিক্ষা দানে অভ্যস্ত ফলে ছাত্রছাত্রীরা মনোরঞ্জনের অভাবে আগ্রহ হারাচ্ছে আর অপরদিকে খান স্যারের কাছে দিন দিন ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা জলচ্ছাসের মতো বেড়েই চলেছে। কিছু তো আছে ওই মানুষটার শেখানোর মধ্যে। এমন সুন্দর করে মনোরঞ্জনসহ কঠিন জিনিস মুহূর্তের মধ্যে মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়ার অসম্ভব এক উপায় জানেন বলেই হয়তো আপামর জনসাধারণের কাছে “ওয়ান অফ দ্য বেস্ট স্যার” হিসেবে আজও স্ব-মহিমায় টিকিয়ে রেখেছেন নিজেকে।

সত্যি বলতে, উনি এমন একটা প্রতিভার মালিক যা তাঁর কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে বা ছিনিয়ে নিতে পারবে না কোনোদিন।

পদ্মাবত সিনেমার সেই ডায়লগটা ভীষণ মনে পড়ছে,
” দুনিয়া কি হার নায়াব চিজ ছিন সকতা হুঁ…
পর আফসোস,

তুমহারি ইস হুনার কো হাম ছিন নেহি সকতে……”

ভালো থাকবেন স্যার

আরও পড়ুন ::

Back to top button