মতামত

বাধা ঠেলে কবিতা দিয়েই জয়ের আনন্দ দেবস্মিতার

স্বপ্নীল মজুমদার

বাধা ঠেলে কবিতা দিয়েই জয়ের আনন্দ দেবস্মিতার - West Bengal News 24

বাধার মধ্যেই জয়ের আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরের বছর কুড়ির দেবস্মিতা নাথ। ইন্দিরা গান্ধী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকস্তরের ইংরেজি অনার্সের ছাত্রী দেবস্মিতা হাঁটাচলা করতে পারেন না। জন্ম থেকেই শারীরিক সমস্যাক কারণে বড় হয়ে ওঠার পথে নানা লাঞ্ছনা,প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও মনের জোরে তিনি খুঁজে নিয়েছেন সাফল্যের আলো। যে আলোর রোশনাইয়ে উজ্জ্বল হয়েছেন তিনি ও তাঁর পরিবার। ২০১৯ সালে তাঁর আবৃত্তির সিডি সংকল প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা প্রেস ক্লাবে। নিয়মিত সমাজমাধ্যম ও ইউটিউবে প্রচুর লাইভ অনুষ্ঠানের দৌ‌লতে আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী হিসেবে দেবস্মিতা পরিচিত মুখ। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পুরস্করার ও সম্মান-স্বীকৃতি পেয়েছেন ওই নবীনা শিল্পী।

তবে সাফল্যের চূড়োয় পৌঁছতে দেবস্মতিকে শিশুবেলা থেকেই লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। দেবস্মিতার মা সুমিতা নাথ শো‌নালেন তার মেয়ের অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের কাহিনী!

দেবস্মিতার জন্ম ২০০১ সালের ১৬ এপ্রিল। আর পাঁচজন শিশুর মতো ছিলেন না তিনি। শৈশবে হামা দিতে পারতেন না। মুখ দিয়ে ক্রমাগত লালা ঝরত। চার পাশে বালিশ দিয়ে বসিয়ে রাখতে হতো। চাইল্ড স্পেশালিস্টকে দেখাতে তিনি নিউরো চিকিৎসককে দেখানোর পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কেউই আশার আলো দেখাতে পারলেন না। ভেলোরের এক নিউরো সার্জেন দেবস্মিতাকে দেখে জানিয়ে দিলেন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই। চিকিৎসক জানালেন, বাড়িতে রেখে ফিজিওথেরাপি করাতে হবে। দেবস্মিতার সঙ্গে প্রচুর কথা বলতে হবে। নিয়মিত গান, কবিতা শোনাতে হবে। দেবস্মিতা কথা বলতে শেখেন সাড়ে তিন বছর বয়সে। বাড়িতে আঁকার শিক্ষক রেখে ছবি আঁকা শেখানো, লেখা শেখানোর পাশাপাশি, শেখানো হতো ছড়া।

বাধা ঠেলে কবিতা দিয়েই জয়ের আনন্দ দেবস্মিতার - West Bengal News 24
পঞ্চম বর্ষ বঙ্গ প্রমীলা কৃতি রত্ন সম্মান

আধো বুলিতে সেই ছড়ায় ছিল যেন এক অন্য রকমের ভাল লাগার ছোঁয়া। স্কুলে পড়ার সময়ে কাজি নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করে তাঁর বাচিক যাত্রার শুরু হয়েছিল। ছড়া-কবিতা কন্ঠস্থ করার সহজাত গুণও দেখা গিয়েছিল শিশুবেলাতেই। তবে শারীরিক সমস্যার জন্য নানা ভাবে কখনও সহপাঠী, কখনও শিক্ষিকাদের দ্বারা মানসিক নিগ্রহের শিকারও হতে হয়েছে দেবস্মিতাকে। বারে বারে বদলাতে হয়েছে। স্কুল। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ার সময়ে লিচু চোর কবিতাটি আবৃত্তি করে দ্বিতীয় পুরস্কার পেলেন দেবস্মিতা। ছড়া-কবিতা আবৃত্তির সহজাত গুণকে আরও পরিশীলিত করে তোলার জন্য দায়িত্ব নিলেন আবৃত্তিকার শম্পা রায় চৌধুরী।

বাধা ঠেলে কবিতা দিয়েই জয়ের আনন্দ দেবস্মিতার - West Bengal News 24
সিডি রিলিজ এর আগের মুহূর্ত

দশম শ্রেণির আগে তিনটে স্কুল বদলাতে হয়েছে দেবস্মিতাকে। আবৃত্তির প্রশিক্ষণের পাশাপাশি, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে একের পর এক পুরস্কার পাওয়া শুরু হল। দেবস্মিতার মায়ের আক্ষেপ, স্কুলে সবার করুণার পাত্রী হয়ে থাকা তাঁর মেয়ে যখনই আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় সফল হয়ে নজর কাড়তে শুরু করলেন, তখন স্কুলের একাংশ সেটাকে ভাল ভাবে নিতে পারতেন না। তার মধ্যেও স্কুল বদলে কবিতার চর্চায় খামতি রাখেননি দেবস্মিতা। দুর্গাপুরের স্থানীয় টিভি চ্যানেলে অনুষ্ঠান করেছেন কিশোরী বেলায়। এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান মঞ্চে আবৃত্তি করে দুর্গাপুরে দেবস্মিতারক নিজস্ব পরিচিতিও তৈরি হয়ে যায়। দুর্গাপুরে ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে মাত্র ১৩ বছর বয়সে কবিতার ওয়ার্কশপে যোদ দেওয়ার সুযোগ মেলে।

বাধা ঠেলে কবিতা দিয়েই জয়ের আনন্দ দেবস্মিতার - West Bengal News 24

পরে সরাসরি কাব্যায়নে ভর্তি হয়ে বছর দেড়েক ধরে আবৃত্তি শিখেছেন। জগন্নাথ বসু , ঊর্মিমালা বসুর মতো গুণিজনদের কাছেও আবৃত্তি ও বাচিক অভিনয়ে তালিম নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। ষোলো বছর বয়সে আইসিএসসি বোর্ড থেকে দশম শ্রেণির পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপরে পশ্চিমবঙ্গ উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিকও উত্তীর্ণ হন সাফল্যের সঙ্গে। এখন মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকস্তরের ছাত্রী হলেও সমান তালে আবৃত্তি করে চলেছেন। ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও আবৃত্তির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ১৭ বছর বয়সেই দেবস্মিতা রবীন্দ্র সদন, বিড়লা অ্যাকাডেমির সভাঘর, শিশির মঞ্চ, ত্রিগুণাসেন মঞ্চ, রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবন, বাংলা অ্যাকাডেমী আরো অনেক মঞ্চে আবৃত্তির অনুষ্ঠান করেছেন।

দুর্গাপুর থেকে প্রায়ই কোলকাতা আসা -যাওয়া লেগেই থাকে অনুষ্ঠানের সূত্র ধরে। ৯১.৯ ফ্রেন্ডস এমএমেও অনুষ্ঠান করেছেন। ১৮ বছর বয়সে দেবস্মিতা পান মনন সাহিত্য পত্রিকার সম্মাননা। কবিতার মধ্য নিজেকে বিশ্বের আকাশে তুলে ধরতে চান তিনি। বাধা ঠেলে জীবনের জয়গানের তিনি নিজেই বাস্তব দৃষ্টান্ত যে!

বাধা ঠেলে কবিতা দিয়েই জয়ের আনন্দ দেবস্মিতার - West Bengal News 24
মনন সাহিত্য পত্রিকা থেকে সম্মানিত

আরও পড়ুন ::

Back to top button