ড্রাগনের নজর এবার ‘চিকেন নেক’-এ! বিএনপির জয়ের পর ‘একসঙ্গে কাজ করার’ বার্তা চিনের
ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেই রাজনৈতিকভাবে বড় সাফল্য পেলেন খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আবারও ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। শুক্রবার বাংলাদেশ নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পরই তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানায় চিন।
ঢাকায় অবস্থিত চিনা দূতাবাস এক বার্তায় জানায়, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশের জনগণকে আমরা অভিনন্দন জানাই।’ পাশাপাশি নির্বাচনে জয়ের জন্য বিএনপিকেও শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। চিনা দূতাবাস আরও লিখেছে, ‘চিন এবং বাংলাদেশের নতুন সরকার একসঙ্গে কাজ করবে। দুই দেশ সম্পর্কের নতুন অধ্যায় লিখবে।’
বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে চিনের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুসের আমলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন দেখা যায় বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত। আগে ভারতঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সেই সময় চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় বলেও আলোচনা শুরু হয়। বেজিংয়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উত্তর-পূর্ব ভারতের কৌশলগত অঞ্চল নিয়ে নানা জল্পনা ছড়ায়। ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ রক্ষা করে যে ‘চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডর, সেটিকে ঘিরেই বাড়তে থাকে উদ্বেগ। সূত্র মারফত জানা যায়, ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকার কাছাকাছি বাংলাদেশ সীমান্তে বায়ুসেনা ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছিল ইউনুস সরকার এবং চিনা প্রতিনিধিরা সেই এলাকা পরিদর্শনও করেছিলেন বলে খবর প্রকাশ্যে আসে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশে চিনা প্রতিনিধিদের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিএনপি, জামাতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা ইউনুসের সঙ্গেও একাধিকবার বৈঠক করেন তাঁরা। পহেলগাঁও হামলা ও অপারেশন সিঁদুর ঘিরে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার আবহ তৈরি হলে সেই পরিস্থিতিকেও কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি ওঠে। জানা যায়, সীমান্তবর্তী রংপুর জেলার লালমনিরহাট এলাকায় চিনের সহায়তায় একটি বায়ুসেনা ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যা ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলিও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক নজর রাখছে বলে সূত্রের দাবি। এখন প্রশ্ন উঠছে, ইউনুস সরকারের পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো কি নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে, নাকি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে হাঁটবে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন—তার উত্তর সময়ই দেবে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ চিকেন নেক? এই অঞ্চল ‘শিলিগুড়ি করিডর’ নামেও পরিচিত। শিলিগুড়ি শহর সংলগ্ন এই করিডর ভূকৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সবচেয়ে সরু অংশে এর প্রস্থ প্রায় ২০ কিলোমিটার। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা এই করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে। ভৌগোলিক গঠনের কারণে একে মুরগির গলার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
সমরকৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতের মতো বৃহৎ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে এই শিলিগুড়ি করিডরকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। তিন দেশের সীমান্ত সংযোগ থাকার কারণে এই পথ ব্যবহার করে অস্ত্র, মাদক ও জাল নোট পাচারের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তের দুর্বল অংশ ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী অনুপ্রবেশের সম্ভাবনাও বারবার উঠে এসেছে। পাকিস্তানের কৌশলগত লক্ষ্যেও এই অঞ্চল রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত পরিস্থিতি তৈরি হলে চিন ও পাকিস্তান যৌথভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ করিডরকে নিশানা করতে পারে এবং সম্ভাব্যভাবে ‘নতুন’ বাংলাদেশের ভূমিকাও আলোচনায় উঠে আসছে। তবে সম্ভাব্য যে কোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত প্রস্তুত বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।



