
২ মে, ২০২১। বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা তখন তুঙ্গে। গোটা রাজ্যের নজর ছিল নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের দিকে। সেখানে শুভেন্দু আধিকারীর বিরুদ্ধে গণনায় এগিয়ে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee Vs Suvendu Adhikari)। তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মুখে শোনা যাচ্ছিল ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ স্লোগান। কিন্তু হঠাৎই পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। বয়াল বুথে আচমকা লোডশেডিংয়ের ঘটনা ঘটে। এরপরই বদলে যায় গণনার সমীকরণ। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, ‘দিদি’ নয়, নন্দীগ্রামের বিধায়ক হয়েছেন ‘দাদা’। সেই ভোটে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কাট টু ২০২৬। আবারও রাজনৈতিক ময়দানে মুখোমুখি মমতা-শুভেন্দু। তবে এবার লড়াইয়ের কেন্দ্র ভবানীপুর।
২০২১ সালের পর ২০২৬ সালেও কি একইভাবে সরাসরি লড়াইয়ে নামবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী? ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগেই এই জল্পনা চরমে ওঠে। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল প্রথম জানিয়েছিল, নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুর থেকেও বিজেপির প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা হতে পারে শুভেন্দুর। সোমবার বিজেপির প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর সেই জল্পনাই সত্যি হয়। জানা যায়, এবার দু’টি আসন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তিনি। নন্দীগ্রামের পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ভবানীপুর থেকেও প্রার্থী করা হয়েছে রাজ্যের বিরোধী দলনেতাকে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পূর্ব মেদিনীপুরের অধিকারী পরিবারের রাজনৈতিক সম্পর্ক একসময় বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল, যা সকলেরই জানা। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যায়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আচমকাই তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী। দলের পাশাপাশি প্রশাসনিক সমস্ত পদ থেকেও সরে দাঁড়িয়ে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির প্রধান মুখ হিসেবেই উঠে আসেন তিনি। প্রাক্তন নেত্রী তথা ‘দিদি’-কে ক্ষমতা থেকে সরানোর ডাকও দেন। যদিও জয় নিয়ে তাঁর কিছুটা সংশয় ছিল বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। সেই কারণেই নিজের পরিচিত এলাকা নন্দীগ্রামকেই লড়াইয়ের ময়দান হিসেবে বেছে নেন। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নন্দীগ্রামের মাটি সম্পর্কে অত্যন্ত পরিচিত। তাই ভবানীপুর ছেড়ে শুভেন্দুর শক্ত ঘাঁটিতেই গিয়ে সরাসরি লড়াইয়ে নামেন তিনি। সেই সময় নন্দীগ্রামের মাটি থেকেই তৃণমূল সুপ্রিমোর ঘোষণা ছিল, ‘ভাঙা পায়ে খেলা হবে।’ এবার ভবানীপুরে সেই একুশের লড়াইয়ের পুনরাবৃত্তি দেখার অপেক্ষায় রাজ্যবাসী।
আরও পড়ুন :: বিধানসভা ভোটের আগে বড় পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের! ডিজি-সহ পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে বড় বদলি
মঙ্গলবার বিকেলে ২৯৪টি আসনের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার কথা তৃণমূলের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভবানীপুর থেকেই এবার নির্বাচনে লড়বেন, তা তাঁর বক্তব্য থেকেই ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মমতা বলেছেন, বাংলায় যেভাবেই নির্বাচন আয়োজন করা হোক না কেন, তৃণমূলের বিরুদ্ধে যত রণকৌশলই নেওয়া হোক, অন্তত একটি ভোটের ব্যবধানে হলেও তিনি জিতবেন। তবে এদিন পরিষ্কার হয়ে গেল, এবারের লড়াই মূলত ‘গদ্দার’ শুভেন্দুর (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্বোধনে) বিরুদ্ধেই হতে চলেছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামানোর মতো শক্তিশালী মুখ বিজেপির কাছে নেই বললেই চলে। সেই কারণেই শুভেন্দুর উপরই ভরসা রেখেছে গেরুয়া শিবির। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপি চাইছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের কেন্দ্রেই ব্যস্ত রাখতে। অন্যদিকে নন্দীগ্রাম শুভেন্দুর শক্ত ঘাঁটি হওয়ায় দু’দিক সামলানোর কৌশল নিয়েছে পদ্মশিবির। তবে ভবানীপুর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সাক্ষী এই এলাকা। তাই সেখানে শুভেন্দুকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বিজেপির জন্য উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।



