টলিউড

বিজয়গড়ে শুধুই শূন্যতা! দেওয়ালে বাবিনের ছবি, প্রিয় অভিনেতার অকাল প্রস্থানে স্তব্ধ গোটা পাড়া

ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

Rahul Arunoday Banerjee death : বিজয়গড়ে শুধুই শূন্যতা! দেওয়ালে বাবিনের ছবি, প্রিয় অভিনেতার অকাল প্রস্থানে স্তব্ধ গোটা পাড়া - West Bengal News 24

গত দু’দিন যেন ঝড় বয়ে গিয়েছে বিজয়গড়ের পল্লীশ্রী এলাকায়। মঙ্গলবার সকাল থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার চেষ্টা করছে পাড়া। সদ্যপ্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন অনন্যা আবাসনের নীচে যে দোকানগুলি বন্ধ ছিল, সেগুলি একে একে খুলতে শুরু করেছে। চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে, গাছতলায় বসে আড্ডা দিচ্ছেন বয়স্কেরা। তবে চারপাশে যেন একটাই পরিবর্তন পাড়ার দেওয়ালে দেওয়ালে মালা পরানো বাবিনের ছবি, যা শোকের আবহকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

গত ৪৮ ঘণ্টা এই শান্ত পাড়ার উপর দিয়ে নেমে এসেছিল এক প্রবল আবেগঘন ঝড়। হঠাৎ করে অভিনেতার মৃত্যুসংবাদ, তার সঙ্গে নেতা-মন্ত্রী ও তারকাদের আনাগোনা সব মিলিয়ে পরিবেশ হয়ে উঠেছিল ভারী। পাড়ার সকলের প্রিয় ‘বাবিন’-এর আকস্মিক চলে যাওয়ায় দুঃখ, ক্ষোভ, হতাশা আর অবিশ্বাসে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল গোটা এলাকা।

এই ক’দিন রাহুলের বাড়ির সামনে ভিড় লেগেই ছিল। অনেকেই সেখানেই সময় কাটিয়েছেন, অনেক বাড়িতে ঠিকমতো রান্নাও হয়নি। কারও কাছে তিনি ছিলেন ছেলের মতো, কারও কাছে বন্ধু। পাড়ার চেনা ছবি যেন হঠাৎ করেই বদলে গিয়েছিল। রবিবার ও সোমবার তারকাদের ভিড়, সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি,সব মিলিয়ে এলাকা কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। এমনকি রানিকুঠী থেকে যাদবপুর ৮বি পর্যন্ত অটোর রুটও ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন :: ‘আমি ঠিক লিখে ফেলব…’- অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতিতেই থেমে গেল অরুণোদয়-র কলম, আবেগে ভাসলেন অনিন্দ্য!

এখন অনন্যা অ্যাপার্টমেন্টের উল্টো দিকে বড় করে টাঙানো হয়েছে রাহুলের ছবি, গলায় রজনীগন্ধার মালা। তিনতলার বারান্দা নিস্তব্ধ। উপরে রয়েছেন অভিনেতার মা ও পরিবারের সদস্যেরা। তাঁরা অপেক্ষা করছেন রাহুলের দাদার জন্য, যিনি আয়ারল্যান্ড থেকে বুধবার ফেরার কথা।

জীবন থেমে থাকে না, ধীরে ধীরে সবাই কাজে ফিরছেন। কিন্তু এই আকস্মিক ক্ষতি এখনও মেনে নিতে পারছেন না পাড়ার মানুষজন। অভিনেতার বাড়ির নীচে আড্ডার আসরে নিয়মিত থাকা স্বপন মজুমদার, যিনি ‘ভাইয়াদা’ নামেই পরিচিত, বলেন, ‘‘পাড়াটা ফাঁকা লাগছে। দেখা হলেও বলত কাকু ভাল আছো? মাথা নিচু করে যাতায়াত করত। মনে হচ্ছে কে যেন চলে গেল একটা। সোমবার পাড়ায় যে কত লোক ছিল, বোঝাতে পারব না। রাহুলের মৃত্যুতে এত লোক হবে ভাবতে পারিনি! ও তো পাড়ায় কখনও তারকাসুলভ কিছু আচরণ করেনি।’’

চায়ের দোকানি রবিনদার স্মৃতিতেও রাহুল একেবারে আপনজন। তাঁর দোকানেই প্রায়শই চা খেতে আসতেন অভিনেতা,চিনি ছাড়া লাল চা বা জিমের সময় কালো কফি। রবিন বলেন, ‘‘ঈশ্বর আমায় কেন নিয়ে গেল না! ওর মতো একটা মানুষের তো সকলের দরকার ছিল। আমার জীবন বাঁচা হয়ে গিয়েছে, ওর তো জীবন অনেক বাকি ছিল। এত ভদ্র ছেলে যে ভাবা যায় না। কখনও মুখে একটা গালিগালাজ শুনিনি। ওর এমন হয়েছে শুনে চলে যাই তমলুকে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘যখন তমলুকে গেলাম, ততক্ষণে ও আর নেই। তালসারিতে যেখানে শুটিং হয়েছিল, সেই জায়গায় যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রোডাকশনের লোকেরা যেতে দেননি। আমরাও বেশি জোরাজুরি করিনি। ময়নাতদন্তের আগে লাশকাটা ঘরে ওকে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। আমার ছেলেটা বড় হয়ে ওর মতো অভিনেতা হতে চায়। রাহুল বলেছিল সুযোগ করে দেবে।’’ শেষে তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে, ‘‘জন্ম যখন হয়েছে মৃত্যু হবে, কিন্তু এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।’’

আরও পড়ুন :: রাহুলকে জলে নামতে বারণ করা হয়েছিল! তালসারিতে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুর নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য

পাড়ার সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে রাহুলের স্মৃতি। চায়ের দোকানের পাশেই আরেকটি বড় ছবি অল্পবয়সের রাহুলের, যার নীচে লেখা ‘বিদায় কমরেড’। অভিনেতা নিজেকে বামপন্থী ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত বলেই পরিচয় দিতেন। তাঁর শেষযাত্রায় সিপিআইএমের দীপ্সিতা ধর, অভিনেত্রী ঊষসী চক্রবর্তী-সহ অনেকেই স্লোগান দিতে দিতে কিছুটা পথ হাঁটেন, যা নিয়ে সমাজমাধ্যমে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। পাড়ার এক প্রবীণ বাসিন্দা, যিনি অভিনেতার বাবার বন্ধু, প্রথমে শুটিংয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘‘গত দু’দিন ধরে আমাদের পাড়ার সকলেরই প্রায় খাওয়াদাওয়া বন্ধ ছিল। সকলেই অপেক্ষায় ছিল বাবিনকে শেষ বার দেখার জন্য। আমার বয়স হয়েছে, তাই শ্মশানে যেতে পারি না। তবে গতকাল এখানে ভাবতে পারবেন না কত ভিড় ছিল। সাধারণ মানুষ থেকে সংবাদমাধ্যম। তার মাঝেই হঠাৎ দেখলাম সিপিএম-এর নেতারা এসে দাবি করে বসলেন, ‘ও আমাদের’। এটা কেমন ব্যাপার? ও তো আমাদের সকলের বাবিন। এটা পাড়ার লোকেরা ঠিক ভাবে নেননি।’’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাড়ায় স্বাভাবিক ছন্দ ফিরতে শুরু করেছে। যান চলাচল বাড়ছে, দোকানপাট খুলছে, সন্ধ্যার পর আবার ব্যস্ততা বাড়ছে। তবে সবকিছুই যেন একটু নীরব, একটু থমথমে। অভিনেতার বাড়ির নীচে মোমোর দোকানেও ধীরে ধীরে কাজ শুরু হয়েছে। কেউ মোড়ে দাঁড়িয়ে চুপচাপ খবরের কাগজ পড়ছেন, কেউ দোকান সামলাচ্ছেন জীবন চলছে, কিন্তু যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা সঙ্গে নিয়ে।

এই শোকের আবহেই হাজির হন রাহুলের ছোটবেলার বন্ধু কচি। তিনি বলেন, ‘‘ওদের বাড়ির নীচে সোনার কারখানা ছিল। সেখানে অরুণ বাটখারা নিয়ে পালিয়ে যেত। ওকে ভয় দেখাতে ওখানে বন্ধ করে রাখতাম। ওর সঙ্গে কত যে স্মৃতি, বলে শেষ করতে পারব না। প্রথম সিগারেট খাওয়া ওর সঙ্গে। এক গেলাসের বন্ধু আমরা। ছয় মাসের ব্যবধানে আমার দু’জন প্রিয় মানুষকে হারিয়ে ফেললাম এক জ়ুবিন গার্গ, আর একজন অরুণ।’’ কথার মাঝেই তাঁর চোখ ভিজে ওঠে। যাওয়ার আগে বলেন, ‘‘কিছু দিন আগে বাইক কিনল। আমি বললাম এই ব্যাটারিচালিত বাইক কেন কিনলি? ও হাসল। এই তালসারি যাওয়ার আগে বলেছিল, ফিরে দেখা হবে।’’ তারপর একটু থেমে যোগ করেন, ‘‘আমি মুসলিম। কিন্তু ও কখনও ধর্মীয় ভেদাভেদ করেনি। আমি জানি ওর সঙ্গে দেখা হবেই।’’

পাড়ার ভিতরে অভিযাত্রিক ক্লাবের মাঠেও টাঙানো হয়েছে ইস্টবেঙ্গলের জার্সি পরা রাহুলের বড় ছবি। স্থানীয় এক যুবক বলেন, ‘‘বাবিনদা খেলার ভক্ত ছিল। জ্ঞানও ছিল অনেক। এমনটা হবে ভাবতেই পারছি না।’’

এখন গান্ধী গেটের রাস্তা আবার স্বাভাবিক। শুধু কদম গাছের তলায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রয়েছে অভিনেতার সদ্য কেনা বাইক যেন নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে। পাড়ার আনাচকানাচে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ‘এত কম বয়সে এমন চলে যাওয়া কি মেনে নেওয়া যায়?’

আরও পড়ুন ::

Back to top button