
বিজেপিকে ‘বাঙালি বিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরতে তৃণমূলের প্রচার ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। নির্বাচনী ময়দানে নতুন নতুন ইস্যু তুলে ধরছে শাসকদল কখনও ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব, কখনও ‘বাংলার সংস্কৃতি না বোঝা’র অভিযোগ, আবার কখনও ‘মাছ-মাংস খেতে দেবে না’ এমন দাবি। এই সব অভিযোগের পাল্টা দিতে বিজেপি দুই ধরনের কৌশল নিয়েছে। প্রথমে তৃণমূলের এই অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে হেসে উড়িয়ে দেওয়া, তারপর সেই অভিযোগের উল্টো ছবি তুলে ধরা। সেই কৌশলেরই অংশ হিসেবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মাছবাজারে বিজেপি নেতাদের উপস্থিতি বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও প্রার্থী মাছপ্রেমের বার্তা তুলে ধরছেন।
পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ বিজেপি নেতাই মাছ-মাংস খেতে অভ্যস্ত। রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh) বহু বছর আরএসএস-এর প্রচারক থাকলেও খাদ্যাভ্যাসে কোনও বদল আনেননি। বড় মাছের তুলনায় ছোট মাছই তাঁর বেশি পছন্দ। গরমকালে পান্তাভাতের সঙ্গে মাছভাজাও খান তিনি। সময় পেলে গ্রামাঞ্চলে দলীয় কর্মীদের বাড়িতে গিয়ে পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরতেও দেখা যায় তাঁকে। বাড়িতে অতিথি এলে মাছ-মাংস দু’ধরনেরই আয়োজন রাখেন। সেই দিলীপ ঘোষকেও সম্প্রতি খড়্গপুর সদর বিধানসভা এলাকায় একটি মাছবাজারে দেখা গিয়েছে। শুধু যাওয়া নয়, মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলার মুহূর্তও তিনি সমাজমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন। সেই পোস্টে তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় তৃণমূল নেতারা বাজারের মাছ ও সবজি বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিয়মিত তোলা আদায় করেন।
রাজারহাট-গোপালপুরের প্রার্থী তরুণজ্যোতি তিওয়ারি এবং বিধাননগরের প্রার্থী চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও প্রচারে মাছপ্রেমের ছবি তুলে ধরেছেন। জামাইষষ্ঠীর আদর্শ জামাইয়ের মতো বড় কাতলা হাতে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে দেখা গিয়েছে শারদ্বতকে। অন্যদিকে তরুণজ্যোতি মাছবাজারে গিয়ে প্রচার চালানোর পাশাপাশি মাছভাত খেতে খেতে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘শুধু মাছ নয়, আমি মাংসও খুব পছন্দ করি। আর শুধু পছন্দ করি না, মাছ-মাংস আমি নিজে দেখে কিনতেও পছন্দ করি।’’ একই সঙ্গে তৃণমূলকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘বাজারে গিয়ে আমি যে ভাবে বলে দিতে পারব, কোন মাছ টাটকা আর কোনটা চালানের, সেটা তৃণমূলের নেতারা পারবেন না। কোন মাছের এখন কী দাম যাচ্ছে, সেটাও আমি বলে দিতে পারব। তৃণমূল নেতারা দাম বলতে পারবেন না। কারণ, ওঁদের এখন কিনে খাওয়ার অভ্যাস নেই।’’
মেদিনীপুরের প্রার্থী শঙ্কর গুছাইতকে মাছ হাতে নিয়ে বাজারে বসে ছবি তুলতে দেখা গিয়েছে। বেহালা পশ্চিমের প্রার্থী চিকিৎসক ইন্দ্রনীল খাঁ-ও মাছ খেতে খেতে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘ছোট থেকেই আমি মাছের ভক্ত। দুপুরের খাবারে আর কিছু থাক বা না-থাক, কোনও একটা মাছের পদ আমাকে দিতেই হবে।’’
শুধু প্রার্থীরাই নন, দলের অন্যান্য নেতারাও সম্প্রতি মাছ-মাংসপ্রেমের কথা প্রকাশ্যে বলছেন। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য খাসির মাংসের প্রতি তাঁর পছন্দের কথা আগে থেকেই পরিচিত মহলে জানা। স্বাস্থ্যগত কারণে এখন কম খেলেও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছেন তিনি। বারবার তিনি বলছেন, ‘‘স্বামী বিবেকানন্দ বলে গিয়েছেন, এ দেশে মা কালী পাঁঠা খাবে। সুতরাং পুজোয় পাঁঠাবলিও হবে। বাঙালি মাংসও খাবে, মাছও খাবে। কেউ আটকাতে পারবে না।’’ একইভাবে সুকান্ত মজুমদারও বিভিন্ন সভা থেকে নিজের মাছপ্রেমের কথা তুলে ধরছেন এবং জানিয়েছেন, নিয়মিত খাদ্যতালিকায় মাছ থাকেই।
বিজেপি নেতৃত্বের মতে, বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ভুল বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। গত ৩০ মার্চ পাঁশকুড়ার সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‘একটা আসনে আমরা হারলে, বিজেপি আপনার মাছ খাওয়া বন্ধ করবে।’’ এই মন্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে বিজেপি নেতারা মনে করছেন, বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে ভুল ধারণা দূর করতে বাস্তব ছবি তুলে ধরা জরুরি। সেই কারণেই বিভিন্ন জায়গায় মাছ হাতে প্রচার বা মাছ খেতে খেতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার ছবি সামনে আনা হচ্ছে।
আরও পড়ুন :: রাজ্যসভায় বাংলার জয়জয়কার! বাংলায় শপথ নিলেন রাজীব-বাবুল-কোয়েলরা, দীর্ঘ অপেক্ষার পর সংসদে রাহুল সিনহা
অন্যদিকে বিজেপির এই কৌশলকে তীব্র কটাক্ষ করেছে তৃণমূল। বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার মন্তব্য করেছেন, ‘‘হাতে মাছ ঝুলিয়েও কেউ প্রচার করেছেন নাকি? আমি দেখিনি! তবে শুনেই তো অবাক লাগছে!’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘ওঁরা সুযোগ পেলে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন বলে তো রটেছিল। ব্যাপারটাকে বাঙালি মোটেই ভাল ভাবে নেবে না বলে বুঝতে পেরেছেন। সেই কারণেই বাঙালিয়ানা দেখাতে মাছ নিয়ে প্রচার করছেন।’’
যদিও বিজেপি প্রার্থীরা প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন না যে এটি কোনও নির্দিষ্ট কৌশল। তাঁদের মতে, বাজারে গিয়ে প্রচার করা বাংলার রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। তাই মাছবাজারে গিয়ে প্রচার করাকে অস্বাভাবিক বলা যায় না। তবে সব জায়গায় এই কৌশল সমান গুরুত্ব পাচ্ছে না। কিছু প্রার্থী ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, তাঁদের এলাকায় মূল ইস্যু অন্য যেমন সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষিপণ্যের দাম, রাস্তা ও পানীয় জলের সমস্যা। ফলে পূর্ব বর্ধমান বা হুগলির মতো জায়গায় মাছ-মাংস কেন্দ্রিক প্রচারে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। তবে কলকাতা, শহরতলি এবং খড়্গপুর, মেদিনীপুর, দুর্গাপুর, শিলিগুড়ির মতো শহরাঞ্চলে বিজেপির প্রচারে মাছপ্রেম বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।



