স্বাস্থ্য

রোগ যখন ওজন কমানো

রোগ যখন ওজন কমানো - West Bengal News 24

বছর কয়েক আগে ব্রাজিলের ২১ বছর বয়সী তরুণী মডেল আনা ক্যারোলিনা রেস্টনের মৃত্যু আলোড়ন তুলেছিল শোবিজ জগতে। কিডনি অকেজো হয়ে প্রায় ২০ দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর মারা যায় সে। চমকে দেওয়ার মতো তথ্যটা হচ্ছে ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার এই তরুণীর ওজন ছিল মাত্র ৪০ কেজি। প্রয়োজনাতিরিক্ত চিকন হওয়া সত্ত্বেও তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল সে স্থূলকায়, এজন্য লোকজনের কাছে অনাকর্ষণীয়। ওজন কমানোর জন্য সে খাওয়া-দাওয়া প্রায় করতই না। ক্রমাগত না খেয়ে থাকার জন্য তার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে।

বিভিন্ন নামি মডেলিং এজেন্সির হয়ে বিশ্বের নানা দেশে ঘুরে বেড়ানো এই তরুণীটি ভুগছিল খাদ্যাভ্যাসের অস্বাভাবিকতাজনিত মানসিক রোগ ‘এনোরেঙিয়া নারভোসা’য়। বাংলায় একে ‘স্বল্পাহারজনিত কৃশতা’ও বলা যায়।গবেষণায় দেখা গেছে, এ রোগে ভুক্তভোগীর ৯০ শতাংশই নারী। যে কোনো বয়সেই এ রোগ দেখা দিতে পারে। তবে, স্কুল-কলেজগামী অর্থাৎ বয়ঃসন্ধিকালের মেয়েদের মধ্যেই এ রোগ বেশি দেখা যায়। মডেল, নৃত্যশিল্পী, অভিনেত্রী বা এসব পেশায় যেতে ইচ্ছুক অথবা অতিরিক্ত সৌন্দর্য সচেতন মেয়েদের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসের অস্বাভাবিক এই প্রবণতা বেশি। ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও গ্ল্যামারের এই যুগে বিশ্বব্যাপীই এ ধারণা প্রচলিত যে, মেয়েদের আকর্ষণীয় দেখানোর জন্য অবশ্যই চিকন-আকৃতির শরীর হতে হবে। এর প্রভাবে পশ্চিমা বিশ্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে এ রোগ এখন ছড়িয়ে পড়ছে তৃতীয়-বিশ্ব বলে পরিচিত দেশগুলোতেও।

এনোরেঙিয়া নারভোসায় আক্রান্ত রোগীরা ন্যূনতম স্বাভাবিক ওজনও বজায় রাখে না। বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী যে ওজন হওয়া উচিত তার ৮৫ শতাংশেরও কম হয় এদের ওজন। অর্থাৎ বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী যার নূ্যনতম ৬০ কেজি ওজন হওয়া উচিত, তার ওজন হয় ৫১ কেজিরও কম। রোগীরা স্বেচ্ছায় ওজন কমায়। ওজন কমানোর জন্য তারা শুধু যে কম খাবার গ্রহণ করে তা নয়, অনেকে খাওয়ার পরপর গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করে খাবার ফেলেও দেয়। অতিরিক্ত ব্যায়াম করা ছাড়াও অনেকে এমন সব ওষুধ খায় যা অতিরিক্ত মল-মূত্র তৈরি করে শরীর থেকে খাবার ও পানি বের করে দেয় অথবা খাদ্যগ্রহণে অরুচি সৃষ্টি করে।

নিজের দেহের আকৃতি ও ওজন সম্পর্কে এসব রোগীর মধ্যে প্রবল ভুল ধারণা তৈরি হয়। এনোরেঙিয়া নারভোসার রোগীদের অনাহারজনিত নানা জটিলতা দেখা দেয়। শরীরের ভেতরকার রাসায়নিকের সাম্যাবস্থা বিনষ্ট হয়। ফলশ্রুতিতে দুর্বলতা, ক্লানি্ত, মাথাব্যথা, খাদ্যনালীর গণ্ডগোল, কোষ্ঠকাঠিন্য, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, খিঁচুনি প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়। রক্তচাপ কমে যায়। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। হাত-পা-মুখ পানি জমে ফুলে যায়। হাড়ের ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি পায়। রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘ সময় এসব চলতে থাকলে রোগীর কিডনি অকেজো হয়ে যায়, হৃদপিণ্ডের অসুখ দেখা দেয়। সঠিক সময়ে চিকিত্সা না করালে রোগীর মৃতু্যও ঘটতে পারে। বয়ঃসন্ধিকালের আগে বা শুরুর দিকে এ রোগ হলে রোগীর দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

রোগী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়। যৌন আগ্রহ কমে যায়। অনেকে মাদকাসক্তও হয়ে পড়ে। এ রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যা-প্রবণতা অন্যদের চেয়ে বেশি থাকে। এ রোগের চিকিৎসার প্রথম ধাপটি হচ্ছে রোগীকে সঠিক ওজনে ফিরিয়ে আনা। এ জন্য খাবার গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। মুখে খাওয়ানো সম্ভব না হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া হয়। অনাহারজনিত কোনো শারীরিক জটিলতার সৃষ্টি হলে তার চিকিত্সা করা হয়। চিকিৎসকের উপর রোগীর আস্থা ও বিশ্বাসের উপর চিকিৎসার সফলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রোগটি সম্পর্কে রোগীর পাশাপাশি রোগীর পরিবারকেও বিস্তারিত জানিয়ে সচেতন করা হয়।

আরও পড়ুন ::

Back to top button

দয়া করে ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনের অনুমতি দিন

দেখে মনে হচ্ছে আপনি কোনও বিজ্ঞাপন ব্লকার ব্যবহার করছেন। আমরা বিজ্ঞাপনের উপর ভরসা করি ওয়েবসাইটের ফান্ডের জন্য