
ভয়াল ঝড়ে তছনছ কলকাতা। দুপুর থেকে শুরু করে রাতভর আতঙ্ক উত্কণ্ঠায় রইলেন কলকাতার বাসিন্দারা। করোনা আতঙ্ককেও ছাপিয়ে গেল আমফানের তুফানি তাণ্ডবের আতঙ্ক। গাছ ফেলে, হোর্ডিং উড়িয়ে, দোকানের ছাদ ভেঙে, সিগন্যাল পোস্ট, আলোকস্তম্ভ ধূলিসাত্ করে গভীর রাত পর্যন্ত তাণ্ডব চলল। রাত সাড়ে ৮টার কিছু আগে কিছু সময়ের জন্য ঝড় থামলেও ফের ফিরে আসে। সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। দুপুর থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। গোটা শহর স্তব্ধ। বেলা যত গড়িয়েছে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে বৃষ্টি। বস্তুত, এমন বিধ্বংসী ঝড় বহু বছর কলকাতা দেখেনি। রিজেন্ট পার্কে বাজ পড়ে মা-ছেলের মৃত্যু।
আমফান আসছে। কয়েকদিন আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। মঙ্গলবার সকাল থেকে মাইকিং শুরু করে কলকাতা পুলিশ। বুধবারও সকালে মাইকিং করে সতর্ক করা হয় নাগরিকদের। জোড়াবাগান, বাগবাজার এবং আরও কয়েকটি এলাকায় বিপজ্জনক বাড়ি থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। সমস্ত উড়াল পুলের মুখে ব্যারিকেড বসিয়ে দেওয়া হয়। দুপুর আড়াইটে থেকে শুরু হয় ঝোড়ো হাওয়া। বিপজ্জনক বাড়িগুলি থেকে লোকজন সরিয়ে পুরসভার কমিউনিটি হলে রাখা হয়। রাস্তায় নেমে পড়েন এনডিআরএফ, কলকাতা পুলিশের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, দমকল এবং পুরসভার কর্মীরা। ঝড় শুরু হতেই বিভিন্ন জায়গায় গাছ পড়তে শুরু করে। এক সময় এমন পরিস্থিতি হয়, গোটা কলকাতার প্রায় সমস্ত রাস্তা গাছ পড়ে আটকে যায়। কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
বিকেলের দিকে ঝড়ের মধ্যেই কয়েকটি জায়গায় দ্রুত গাছ কেটে সরিয়ে ফেলেন পুরসভার কর্মীরা। জানা গেছে, প্রথম দফাতেই কলকাতায় ২৭টি জায়গায় গাছ পড়ে। রাত পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা যায় ৬৫টি জায়গায় গাছ পড়েছে।
পূর্ব কলকাতার ই এম বাইপাস থেকে শুরু করে শহরের নানা অংশে বড় বড় হোর্ডিং উড়ে যায়।
শহরের বাসিন্দারা দরজা-জানলা বন্ধ করে আতঙ্কে বসে থাকেন। কার্যত, করোনা যা পারেনি, আমফানের তাণ্ডবে ‘কমপ্লিট লকডাউন’ হয়ে গেল বুধবারের কলকাতা। দুপুরের দিকে দু-চারটি গাড়ি রাস্তায় চলতে দেখলেও শহর জুড়ে পড়ে থাকা গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, আলো জ্বলা অবস্থায় আলোকস্তম্ভ রাস্তায় পড়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ঘন কালো মেঘের দাপটে দুপুরেই নেমে এসেছিল সন্ধ্যার আঁধার। পশ্চিম পুঁটিয়ারির একটি পুরনো বাড়ির কার্নিশ হঠাত্ই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। পরে পুরসভার কর্মীরা গিয়ে বাড়ির বিপজ্জনক অংশটি ভেঙে দেন। কেউ হতাহত হননি। গাছ পড়ে রাস্তা ঢেকে যায় নিউ আলিপুর, গড়িয়া, ট্যাংরা, বেহালায়। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে বিদ্যুতের তারের ওপর পড়ে গাছ পড়ে গাড়ির ওপরে। এলাকায় আতঙ্ক দেখা দেয়। পরে সেই গাছ সরিয়ে নেওয়া হয়। বহু বাড়ি ঘরের জানলার কাচ ভেঙে যায় বিকট শব্দে। ছাদে থাকা ফুলের টব উড়ে গিয়ে পড়েছে রাস্তায় নয়তো কার্নিশে। প্লাস্টিকের জলের ট্যাঙ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি জায়গায়। ওয়েলিংটন স্কোয়্যারে ট্রাফিক সিগন্যাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক জায়গায় ট্রাফিক কিয়স্ক ঝড়ের ধাক্কায় হেলে পড়ে। বৃষ্টির জন্য বহু রাস্তা জলমগ্ন হয়ে যায়।
প্রবল ঝড়বৃষ্টির জন্য বহু জায়গায় কেবল সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। মোবাইলের টাওয়ারও পাওয়া যায় না অনেক জায়গায়। দুপুর থেকে গোটা রাত কলকাতা জুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে ঝড়। মাঝে মাঝেই দমকা হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঘরের চাল। সন্ধ্যার পর আলো না-থাকায় অন্ধকার কলকাতাকে আরও বেশি অসহায় দেখিয়েছে। সংবাদপত্র দপ্তরে বহু মানুষ ফোন করে জানতে চান, কতক্ষণ এই ঝড় চলবে? পরিস্থিতি যা, সকাল না হওয়া পর্যন্ত কলকাতার কোথায় কোথায় কত ক্ষয়ক্ষতি, তা বোঝা সম্ভব নয়।
পাশাপাশি সল্টলেকও ঝড়ের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে কোনও বাড়ি ভাঙার খবর পাওয়া যায়নি। সকাল থেকেই বিধাননগর পুরনিগমের কন্ট্রোলে ছিলেন মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী, ডেপুটি মেয়র তাপস চ্যাটার্জি-সহ মেয়র পারিষদরা। বড় বড় গাছ পড়েছে এএ৩৭, বিসি৭৯ ব্লকে, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড, করুণাময়ীর বি ব্লকে। গাছ পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় সিজিও কমপ্লেক্সের সামনের রাস্তা। ঝড় বাড়তেই খবর আসে ৩৩ নং ওয়ার্ড, এইচবি ৭ ব্লকে গাছ পড়ার। সন্ধের পর বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সল্টলেক। বহু বাড়ির জানলার কাচ, কোনও জায়গায় জানলার পাল্লা, দরজা ঝড়ের ধাক্কায় ভেঙে যায়। যান চলাচলের প্রায় সমস্ত রাস্তা একসময় আটকে যায় গাছ পড়ে। নিষ্প্রদীপ হয়ে পড়ে সল্টলেক।
সুত্র : আজকাল



