জিনবিদ্যায় যুগান্তকারী আবিষ্কার করে ‘নোবেল’ সম্মান পেলেন ভারতীয় রসায়নবিদ, ঠেকানো যাবে রোগব্যাধি-মহামারী,

জিনের গঠন বিন্যাস বের করার পদ্ধতি তথা ডিএনএ সিকুয়েন্সিংয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কার করে তথ্যপ্রযুক্তির ‘নোবেল’ সম্মান মিলেনিয়াম টেকনোলজি পুরস্কার পেলেন দুই রসায়নবিদ—কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় অধ্যাপক শঙ্কর বালাসুব্রহ্মণ্যম ও ডেভিড লেনারম্যান। ডিএনএ সিকুয়েন্সিং বা জিনের বিন্যাস বের করার অনেক রকম পদ্ধতিই আছে। কিন্তু এত দ্রুত ও সঠিক বিশ্লেষণের পদ্ধতি খুবই জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।
সেই অসম্ভব কাজকেই সহজ করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন দুই রসায়নবিদ। তাঁদের আবিষ্কৃত পদ্ধতির নাম নেক্সট জেনারেশন ডিএনএ সিকুয়েন্সিং (NGS) বা দ্বিতীয় প্রজন্মের ডিএনএ সিকুয়েন্সিং। দুই রসায়নবিদের তৈরি সংস্থা সোলেক্সা-ইলুমিনায় জিনের বিন্যাস করার নতুন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। লহমায় ছোট ছোট টুকরোয় ভেঙে ফেলা যাবে আস্ত জিনের বিন্যাসকে। প্রতিটি খণ্ডের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে গোপন রহস্যের হদিশ পাবেন বিজ্ঞানীরা। দুই রসায়নবিদের যুগান্তকারী আবিষ্কার দুরারোগ্য রোগব্যাধির চিকিত্সায় ও মহামারী রুখতে বিশ্বকে পথ দেখাবে।
প্রতি দুবছর অন্তর তথ্যপ্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক কাজের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে ফিনল্যান্ডের টেকনোলজি অ্যাকাডেমি (টিএএফ)। ২০০৪ সাল থেকে এই পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয়েছে। প্রথম বছর সেরার সম্মান দেওয়া হয়েছিল স্যর টিম বার্নার্স-লিকে। তিনিই জন্ম দিয়েছিলেন ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ বা ‘www’-র।
কুড়ি সালে কোভিড মহামারীর জন্য পুরস্কার ঘোষণা পিছিয়ে গিয়েছিল। তাই ২০২০ মিলেনিয়াম টেকনোলজি পুরস্কার এ বছর দেওয়া হয়েছে দুই বিজ্ঞানীকে। কী আবিষ্কার করে ‘নোবেল’ সম্মান পেলেন দুই রসায়নবিদ? যে কোনও প্রাণীর চরিত্র বুঝতে হলে তার জিন বা ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড)- গঠন বিন্যাস জানতে হয়। মানুষের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিত্সা করতে হলেও জিনের বিন্যাস সাজিয়ে দেখে নিতে হয় গণ্ডগোলটা কোথায় হয়েছে, বা রোগের ধরন কী, কোথা থেকে এই রোগ এল ইত্যাদি।
ঠিক তেমনই কোনও মহামারী ঠেকাতে হলেও জানতে হয় কোন ভাইরাস বা পরজীবী থেকে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। তাকে রোখার উপায় বের করতে হলেও সেই জিনের বিন্যাস বের করারই প্রয়োজন হয়। দুই রসায়নবিদ অধ্যাপক শঙ্কর বালাসুব্রহ্মণ্যম ও ডেভিড লেনারম্যান এই কাজটাকেই খুব সহজ করে দিয়েছেন। কীভাবে? দুই বিজ্ঞানী নেক্সট জেনারেশন সিকুয়েন্সিং (এনজিএস) বা সেকেন্ড জেনারেশন সিকুয়েন্সিং পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করে নতুন পথের হদিশ দিয়েছেন। এই পদ্ধতিতে জিনের বিন্যাস বের করা যায় খুব দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে।
একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ম্যাসিভ প্যারালাল সিকুয়েন্সিং’। ১৯৯৪-১৯৯৮ সালের মধ্যে এই পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল। বর্তমান সময়ে সেই গবেষণাকেই আরও উচ্চমানে নিয়ে গিয়েছেন এই দুই বিজ্ঞানী। আমরা জানি প্রতিটি জিনেরই বেস পেয়ার থাকে। এনজিএস পদ্ধতিতে এই বেস ধরে ধরেই জিনকে ছোট ছোট টুকরোয় ভেঙে ফেলা যায়। প্রতিটি টুকরো ফ্লুরোসেন্ট রঙের নিওক্লিওটাইড দিয়ে চিহ্নিত করা হয়।
এবার কাজ হয় সেই ভগ্নাংশকে ডিকোড করে তার তথ্য বের করার প্রক্রিয়া। প্রতিটি টুকরোর সিকুয়েন্স বা বিন্যাস বের করা যায় নিখুঁতভাবে। এরপরে কম্পিউটার সফটওয়্যারে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এইভাবে জিনের ভেতরে কী রহস্য লুকিয়ে আছে তা বুঝতে সুবিধা হয় বিজ্ঞানীদের।
ফিনল্যান্ডের টেকনোলজি অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মার্জা ম্যাকারো বলেছেন, জিনের বিন্যাস বের করার এই নয়া পদ্ধতি কোভিড মহামারীর মোকাবিলায় কাজে আসবে। সার্স-কভ-২ ভাইরাসের মিউটেশন ঠেকাতে গেলে এই প্রক্রিয়ায় ভাইরাল জিনোম বিশ্লেষণ করতে হবে। তাছাড়া আগামী দিনে যে কোনও মারণ ব্যাধির কারণ ও চিকিত্সা পদ্ধতি জানতে হলেও এই গবেষণা মাইলফলক হবে বিজ্ঞানীদের কাছে।
সূত্র : দ্য ওয়াল



