
২০২১ সালের নন্দীগ্রাম বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে চোট লাগার ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ফের তীব্র হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর পুরনো মেডিক্যাল রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে চোটের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই রিপোর্ট কীভাবে তাঁর হাতে এল, তা জানতে SSKM হাসপাতাল ও Bangur Institute of Neurosciences-এর কর্তাদের আইনি নোটিস দিয়েছেন মমতার আইনজীবী। এর পরেই পাল্টা কড়া বার্তা দিলেন শুভেন্দু।
সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে শুভেন্দু বলেন, বিষয়টি নিয়ে বেশি ‘ঘাঁটাঘাঁটি’ না করতে। তাঁর বক্তব্য, প্রয়োজন হলে মমতার পায়ের চোট সংক্রান্ত আরও এক্স-রে প্লেট এবং এমআরআই রিপোর্ট প্রকাশ করা হতে পারে।
কী বললেন শুভেন্দু অধিকারী?
মেডিক্যাল নথি প্রকাশ নিয়ে মমতার আইনজীবীর নোটিসের প্রসঙ্গে শুভেন্দু দাবি করেন, মমতা নিজেই ২০২১ সালের ঘটনায় মামলা করেছিলেন এবং সেই মামলা CID-এর হাতে গিয়েছিল।
এর পরেই তিনি বলেন, নথিগুলি কীভাবে তাঁর হাতে এসেছে, প্রয়োজন হলে তা জানাবেন। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র SSKM-এ থাকার কথা নয়।
সাংবাদিকদের সামনে শুভেন্দুর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল তাঁর হুঁশিয়ারি—মমতার পক্ষকে বিষয়টি নিয়ে বেশি ‘ঘাঁটাঘাঁটি’ না করার পরামর্শ দেন তিনি। একইসঙ্গে এক্স-রে প্লেট ও এমআরআই রিপোর্ট প্রকাশের কথাও বলেন।
কেন শুরু হয়েছে নতুন করে বিতর্ক?
২০২১ সালের ১১ মার্চ নন্দীগ্রামের বিরুলিয়া বাজার এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আহত হন। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং নির্বাচনী প্রচারের সময় তাঁকে হুইলচেয়ারে দেখা যায়।
ঘটনাটি সেই সময় রাজ্য রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছিল। মমতার পক্ষ থেকে তাঁর উপর হামলার অভিযোগ তোলা হলেও নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং হামলার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০২৬ সালে সেই পুরনো ঘটনাই ফের সামনে এসেছে। শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি Bangur Institute of Neurosciences-এর ১১ মার্চ ২০২১-এর একটি রেডিওলজি রিপোর্ট দেখিয়ে দাবি করেন, সেখানে পায়ে fracture বা dislocation-এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্য একটি রিপোর্টেও ‘no bony injury seen’ ধরনের উল্লেখ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে এই রিপোর্টের ভিত্তিতে মমতার ২০২১ সালের চোটকে ‘নাটক’ বা ‘মিথ্যা’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। সেটি শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক দাবি; বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক এখনও চলছে।
মমতার পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ?
মেডিক্যাল নথি প্রকাশ্যে আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী অর্ক নাগ SSKM হাসপাতাল এবং Bangur Institute of Neurosciences-এর সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন।
নোটিসে মূলত জানতে চাওয়া হয়েছে, মমতার চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি কীভাবে শুভেন্দু অধিকারীর হাতে পৌঁছল এবং কীভাবে তা প্রকাশ্যে এল। অনুমতি বা আদালতের নির্দেশ ছাড়া ব্যক্তিগত মেডিক্যাল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে।
নোটিসের একটি কপি রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারিকেও পাঠানো হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপোর্টে কী ছিল?
শুভেন্দু অধিকারী যে রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে ১১ মার্চ ২০২১ তারিখের Bangur Institute of Neurosciences-এর রেডিওলজি রিপোর্ট রয়েছে।
শুভেন্দুর দাবি অনুযায়ী, ওই রিপোর্টে পায়ে fracture বা dislocation-এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি এই নথিকে ২০২১ সালের ঘটনায় মমতার প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছেন।
তবে মেডিক্যাল রিপোর্টে কোনও নির্দিষ্ট ধরনের fracture-এর উল্লেখ না থাকা মানেই কোনও ধরনের শারীরিক চোট হয়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। ২০২১ সালে SSKM-এর চিকিৎসকদের বক্তব্যে বাম পা-সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের কথা প্রকাশ্যে এসেছিল।
২০২১ সালে ঠিক কী হয়েছিল?
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আহত হওয়ার পর ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়।
মমতা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁকে ধাক্কা দেওয়ার ফলে গাড়ির দরজা তাঁর পায়ে আঘাত করে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং তাঁর কনভয়ের উপর হামলার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সেই সময় মমতা হুইলচেয়ারে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন। ফলে তাঁর পায়ের চোটের বিষয়টি ভোটের প্রচারের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল।
CID তদন্তের প্রসঙ্গ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ২০২১ সালের ঘটনায় CID-এর তদন্ত হয়েছিল এবং বর্তমান সরকার বিষয়টি নিয়ে ফের তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনী বিধিনিষেধের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আরও পদক্ষেপের কথা জানানো হবে। অন্যদিকে, মমতার মেডিক্যাল নথি প্রকাশের বৈধতা ও গোপনীয়তা নিয়ে তাঁর আইনজীবী ইতিমধ্যেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন।
অর্থাৎ, বিতর্কটি এখন দুটি পৃথক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে এগোচ্ছে—একদিকে ২০২১ সালের চোটের প্রকৃতি ও সেই সময়কার অভিযোগ, অন্যদিকে পাঁচ বছর পুরনো ব্যক্তিগত মেডিক্যাল নথি কীভাবে প্রকাশ্যে এল।
এই মুহূর্তে দু’টি বিষয় নজরে থাকবে। প্রথমত, মমতার আইনজীবীর আইনি নোটিসের জবাবে SSKM ও Bangur Institute কী ব্যাখ্যা দেয়। দ্বিতীয়ত, ২০২১ সালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার বা CID নতুন করে কোনও তদন্তমূলক পদক্ষেপ নেয় কি না।
শুভেন্দু অধিকারী আরও নথি প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে মমতার পুরনো চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়তে পারে।
তবে কোনও মেডিক্যাল নথির ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে নথিটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত বা আদালতের অবস্থান বিবেচনা করা জরুরি।
FAQ
প্রশ্ন: ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে কী হয়েছিল?
উত্তর: ১১ মার্চ ২০২১ নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি আহত হন। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং হুইলচেয়ারে প্রচারে দেখা যায়।
প্রশ্ন: শুভেন্দু অধিকারী কী দাবি করেছেন?
উত্তর: তিনি দাবি করেছেন, ২০২১ সালের মেডিক্যাল রিপোর্টে পায়ে fracture বা dislocation-এর প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সেই ভিত্তিতে মমতার তৎকালীন বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রশ্ন: মমতার পক্ষ থেকে কেন আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে?
উত্তর: তাঁর আইনজীবী জানতে চেয়েছেন, তাঁর ২০২১ সালের ব্যক্তিগত মেডিক্যাল নথি কীভাবে শুভেন্দুর হাতে পৌঁছল এবং কীভাবে তা প্রকাশ্যে এল।
প্রশ্ন: ২০২১ সালের ঘটনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অবস্থান কী ছিল?
উত্তর: বিশেষ পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনাজনিত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন: শুভেন্দু কি আরও মেডিক্যাল নথি প্রকাশের কথা বলেছেন?
উত্তর: হ্যাঁ। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, প্রয়োজন হলে এক্স-রে প্লেট ও এমআরআই সংক্রান্ত নথি দেখাতে পারেন।



