
২০২১ সালের নন্দীগ্রাম-কাণ্ডে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত পুরনো নথি প্রকাশ্যে আসাকে কেন্দ্র করে এবার আইনি পদক্ষেপ করলেন তাঁর আইনজীবী অর্ক নাগ। সোমবার, ৫ অক্টোবর, এসএসকেএম হাসপাতালের অধিকর্তা মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, এমএসভিপি পীযূষকুমার রায় এবং বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান অতনু বিশ্বাসকে আইনি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
আইনজীবীর মূল প্রশ্ন, একজন রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি কীভাবে তাঁর অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্যে এল এবং ওই নথি যদি হাসপাতাল থেকে অন্য কোনও কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়ে থাকে, তা হলে কোন আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল।
কেন ফের আলোচনায় ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম-কাণ্ড?
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে। ১০ মার্চ নন্দীগ্রামে প্রচারে গিয়ে আহত হন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে কলকাতায় এনে এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। পরে বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেও পরীক্ষা করানো হয়েছিল।
সেই সময় মমতার পায়ে গুরুতর আঘাতের কথা জানানো হয়েছিল এবং নির্বাচনী প্রচারে তাঁকে হুইলচেয়ারে দেখা যায়। ঘটনাটি নিয়ে তখনই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
পাঁচ বছর পর সেই পুরনো ঘটনাই ফের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।
কী দাবি করেছেন শুভেন্দু অধিকারী?
৩ অক্টোবর নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মমতার ২০২১ সালের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে দেখান। তাঁর দাবি, ওই নথিতে পায়ে ফ্র্যাকচার বা ডিসলোকেশনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সেই নথির ভিত্তিতেই তিনি তৎকালীন মমতার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তদন্তের কথাও জানান।
অর্থাৎ, শুভেন্দু অধিকারীর দাবি এবং ওই মেডিক্যাল নথির ব্যাখ্যা একদিকে; অন্যদিকে নথিটি প্রকাশ্যে এল কীভাবে, সেটিই এখন নতুন আইনি প্রশ্ন।
মমতার আইনজীবীর চিঠিতে কী জানতে চাওয়া হয়েছে?
অর্ক নাগের পাঠানো আইনি চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও নথি এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছিল কি না।
যদি পাঠানো হয়ে থাকে, তা হলে সেই নথি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে মমতার চিকিৎসা-সংক্রান্ত গোপনীয়তা যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেই বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, যথাযথ ব্যাখ্যা বা ব্যবস্থা না মিললে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসা-নথির গোপনীয়তা নিয়ে কী নিয়ম রয়েছে?
রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখা চিকিৎসা-পেশার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। NMC-র পেশাগত বিধিতে চিকিৎসকের কাছে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত গোপনীয়তা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে আইন বা বৈধ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তথ্য প্রকাশের ব্যতিক্রমও রয়েছে।
NMC-র ২০২৩ সালের Registered Medical Practitioner Professional Conduct Regulations-এ চিকিৎসা-নথির সংরক্ষণ এবং রোগী বা অনুমোদিত ব্যক্তি/আইনি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে নথি সরবরাহের বিষয়েও বিধান রয়েছে।
তাই এই ঘটনায় আসল আইনি প্রশ্ন শুধু রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, তা নয়; কোন কর্তৃত্ব, কোন উদ্দেশ্যে এবং কোন আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নথিটি প্রকাশ বা হস্তান্তর করা হয়েছিল—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এসএসকেএম কি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল?
এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না যে এসএসকেএমই সরাসরি ওই নথি শুভেন্দু অধিকারীর হাতে দিয়েছে।
বরং ৫ অক্টোবর বিকেলে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, নথি এসএসকেএম থেকে নেওয়া হয়নি। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্য একটি পুরনো মামলার তদন্ত-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নথি তাঁর কাছে পৌঁছে থাকতে পারে।
ফলে নথির উৎস এবং হস্তান্তরের পূর্ণ প্রক্রিয়া এখনও এই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে আইনি প্রশ্নে
এই ঘটনায় এখন দুটি পৃথক বিষয় সামনে এসেছে।
প্রথমত, ২০২১ সালের চিকিৎসা নথিতে মমতার পায়ের চোটের প্রকৃতি কী ছিল এবং তা নিয়ে তৎকালীন ও বর্তমান রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে কী পার্থক্য রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পুরনো চিকিৎসা-নথি কীভাবে রাজনৈতিক সাংবাদিক বৈঠকের অংশ হয়ে উঠল এবং তা প্রকাশের আগে কোনও অনুমতি বা বৈধ কর্তৃত্ব ছিল কি না।
মমতার আইনজীবীর নোটিস মূলত দ্বিতীয় প্রশ্নটিরই উত্তর চাইছে।
আইনি নোটিসের পর এসএসকেএমের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নথি কোথা থেকে এসেছে, কে তা সরবরাহ করেছে এবং কী আইনি ভিত্তিতে তা অন্য পক্ষের হাতে পৌঁছেছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললে বিতর্কের পরবর্তী দিক স্পষ্ট হতে পারে।
অন্যদিকে, মমতার আইনজীবী জানিয়েছেন, যথাযথ ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে আরও আইনি পদক্ষেপের পথে যাওয়া হতে পারে।
অর্থাৎ, ২০২১ সালের নন্দীগ্রামের চোট নিয়ে পুরনো রাজনৈতিক বিতর্ক এবার নতুন করে চিকিৎসা-গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের আইনি প্রশ্নে গড়িয়েছে।
FAQ
মমতার মেডিক্যাল রিপোর্ট নিয়ে কেন আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছে?
২০২১ সালের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসার পর মমতার আইনজীবী জানতে চেয়েছেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া ওই নথি কীভাবে প্রকাশ বা হস্তান্তর করা হয়েছিল।
কাদের আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছে?
এসএসকেএমের অধিকর্তা মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, এমএসভিপি পীযূষকুমার রায় এবং বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের নিউরোলজি বিভাগের প্রধান অতনু বিশ্বাসকে নোটিস পাঠানো হয়েছে।
রিপোর্ট কে প্রকাশ্যে এনেছিলেন?
৩ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মমতার ২০২১ সালের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে দেখান।
শুভেন্দু অধিকারীর দাবি কী?
তাঁর দাবি, প্রকাশিত চিকিৎসা-নথিতে মমতার পায়ে ফ্র্যাকচার বা ডিসলোকেশনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসা-নথি কি সবসময় গোপন রাখতে হয়?
চিকিৎসা-পেশার নিয়মে রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আইন, আদালতের নির্দেশ বা নির্দিষ্ট বৈধ পরিস্থিতিতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ব্যতিক্রম থাকতে পারে।



