স্বাস্থ্য

মাংস খাওয়া সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো শুধরে নিন

মাংস খাওয়া সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো শুধরে নিন - West Bengal News 24

বেশিরভাগ সবজিভোজী মানুষই মনে করেন লাল পশুমাংস খাওয়াটা বুঝি স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কিন্তু সত্য হল, নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে লাল মাংস খেয়েও আপনি পুরোপুরি সুস্থ থাকবেন। লাল পশুমাংস নিয়ে অনেক গুজব প্রচলিত আছে। অনেকে বলেন, লাল মাংস খেলে হৃদরোগ, স্থুলতা ও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এমনকি রক্তে উচ্চহারে কোলস্টেরলের পরিমাণ বাড়ার কারণও লাল মাংস ভক্ষণ। কিন্তু এই গুজবগুলো আসলে কতটা সত্য? আসুন এসব ব্যাপারে প্রকৃত সত্যগুলো জেনে নেওয়া যাক।

১. লাল পশুমাংস সম্পর্কে যে গুজবটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত তা হল- লাল মাংস খেলে ওজন বাড়ে। এ সম্পর্কিত গুজবটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত।

ক. লাল পশুমাংস স্থুলতার কারণ। কিন্তু সত্য হল লাল মাংসও অন্য আর যে কোনও সাধারণ খাদ্যের মতোই। এতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালোরি রয়েছে। আপনি যত বেশি লাল মাংস খাবেন তত বেশি ক্যালোরি আপনার শরীরে জমা হবে। তবে সবজি বা সামুদ্রিক খাদ্যের চেয়ে লাল পশুমাংস অনেক বেশি ভারি খাবার এবং এতে ক্যালোরির পরিমাণ অনেক বেশি।

তার মানে এই নয় যে, আপনি লাল পশুমাংস খেলেই মোটা হয়ে যাবেন। মোটা হতে চাইলে আপনাকে প্রচুর পরিমাণে লাল মাংস খেতে হবে। আর যে কোনও খাদ্যের ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য। আপনি যে কোনও ধরনের খাদ্যই যদি বেশি পরিমাণে খান তাহলে মোটা হবেন।

খ. লাল পশুমাংস খেলে শরীর পেশীবহুল হয়। এটা একটা জনপ্রিয় ধারণা যে, আপনি যদি শরীরকে আরও পেশিবহুল করতে চান তাহলে আপনার বেশি বেশি লাল মাংস খাওয়া উচিৎ। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, লাল মাংসে প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন রয়েছে। কিন্তু শুধু মাংস খেলেই আপনার শরীর পেশীবহুল হবেনা। পেশীবহুল শরীর তৈরির জন্য লাল মাংস খাওয়ার পাশাপাশি আপনাকে নিয়মিত জিমনেসিয়ামে গিয়ে ব্যায়ামও করতে হবে।

তবে মূল কথা হল, রান্নার পদ্ধতি এবং পরিমাণে কতটা খাচ্ছেন তার উপরই নির্ভর করে লাল মাংস আপনার স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে না ক্ষতিকর হবে। কথাটা অন্য আর যে কোনও খাদ্যের ব্যাপারেই খাটে। আর নিয়মিত শরীর চর্চা ছাড়া আপনি যে কোনও খাদ্যই যদি পরিমাণে বেশি খান তা আপনার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরই হবে।

২. লাল পশুমাংস সম্পর্কে আরেকটি গুজব, লাল মাংস খেলে রক্তে কোলস্টেরলের মাত্রা উচ্চহারে বাড়ে।

লাল পশুমাংসে চর্বি আছে তা সত্য। আর মানবদেহের জন্য নিয়মিতই সামান্য পরিমাণ চর্বি দরকার হয়। কিন্তু অতিরিক্ত চর্বি গ্রহণ করলে দ্রুত ওজন বাড়বে এটাও সত্য।

এ ক্ষেত্রে সমাধান হল, রান্নার সময়ই অতিরিক্ত চর্বি ঝেড়ে ফেলতে হবে। আর বাজার থেকে মাংস কেনার সময়েই কম চর্বিযুক্ত মাংস দেখে কিনতে হবে।

তবে উদ্ভিদজাতীয় খাদ্য বা অন্য যে কোনও উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রোটিন থেকে যে কোলস্টেরল পাওয়া যায় তার চেয়ে লাল পশুমাংসের প্রোটিন থেকে প্রাপ্ত কোলোস্টেরল অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।

মূল কথা হল, নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে লাল মাংস খেলে স্বাস্থ্যের কোনও ক্ষতি হবেনা। বরং আপনার স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।

৩. লাল পশুমাংস সম্পর্কে আরেকটি গুজব, এটি পুরোপুরি অস্বাস্থ্যকর।

কিন্তু বাস্তব হল, আপনি যদি মনে করেন, লাল পশু মাংসের কোনই পুষ্টিগুণ নেই এবং এতে শুধু চর্বি আর ক্ষতিকর কোলোস্টেরোলই আছে, তাহলে জেনে রাখুন আপনার ধারণা ভুল। লাল পশুমাংসে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ভিটামিন বি-১২, লৌহ ও জিঙ্ক রয়েছে। তার মানে লাল মাংস আপনাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়াবে।

সূতরাং রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক রাখতে নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে লাল পশুমাংস খান। এতে আপনার মাংসপেশিরও ক্ষয়রোধ হবে এবং তা আরও শক্তিশালি হবে।

৪. লাল পশুমাংস সম্পর্কে আরেকটি গুজব হল, লাল মাংস অযাচিত চর্বির একমাত্র উৎস।

আপনি যদি অযাচিত চর্বির কারণেই শুধুমাত্র লাল পশুমাংস খাওয়া বন্ধ করে থাকেন তাহলে জেনে রাখুন আপনি ভুল করছেন। আপনি হয়তো লাল মাংস খাওয়া বন্ধ করলেন কিন্তু প্রতিদিন সকালের নাস্তার সঙ্গে মাখন বা দুপুরের খাবারের পর আইসক্রীম খাওয়া বন্ধ করলেন না, তাহলে চলবেনা। কারণ মাখন বা আইসক্রীমেও প্রচুর পরিমাণে অযাচিত চর্বি থাকে। এসব খাদ্য থেকে গৃহীত চর্বি আপনার রক্ত চলাচলের শিরা-উপশিরাগুলোকে সংকুচিত করে আনবে। এর ফলে আপনার হৃদপিন্ড ও কোমরেও সমস্যা দেখা দিবে।

সূতরাং শুধুমাত্র লাল মাংস খাওয়া বাদ দিলেই আপনি অযাচিত চর্বি থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন না। আপনাকে অন্যান্য চর্বিযুক্ত খাদ্যও ত্যাগ করতে হবে। লাল মাংস খাওয়া বাদ দিলে আপনি বরং অনেক ভিটামিন থেকে বঞ্চিত হবেন।

৫. এখন হয়তো কেউ ভাবতে পারেন, লাল পশু মাংস যদি তেমন একটা ক্ষতিকর না-ই হয় তাহলেতো যতো ইচ্ছা লাল মাংস খাওয়া যাবে!

এ ক্ষেত্রে পরামর্শ হল, লাল মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে সংযমী হতে হবে। এজন্য একই সঙ্গে অনেক বেশি লাল মাংস খাওয়া যাবেনা এবং বিরতি দিয়ে একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর লাল মাংস খেতে হবে।

আপনার ওজন, উচ্চতা, শারিরীক পরিস্থিতি ও তৎপরতা, শরীরচর্চার মাত্রা এবং সার্বিক খাদ্যাভ্যাসের ভিত্তিতেই ঠিক করতে হবে আপনি কতটুকু মাংস খাবেন বা কতদিন পরপর খাবেন। এককথায়, লাল মাংসের বেলায়ও আপনাকে অন্যান্য খাদ্যের মতোই নিয়ম মেনে চলতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৯০ গ্রাম পর্যন্ত লাল মাংস খেলে আপনার স্বাস্থ্যের কোনও ক্ষতি হবেনা।

৬. লাল পশু মাংস খেলে ক্যান্সার হয়। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত লাল মাংস খেলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু ওই গবেষণাগুলিতে যাদের নিয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে তাদের অন্যান্য অনেক বিষয়ই উল্লেখ করা হয়নি।

উদাহরণত, তারা কোনও শরীরচর্চা করেন কিনা বা সুস্থ থাকতে অন্য কোনও উপায় অবলম্বন করেন কিনা এসব ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি ওইসব গবেষণায়।

আবার অনেক গবেষণায় এও দাবি করা হয় যে, লাল মাংস ভেজে বা পুড়িয়ে খেলে ক্যান্সার হয়। এটা যদি সত্য হতো তাহলে প্রচুর লোকেরই ক্যান্সার হতো। সম্ভবত অতিরিক্ত তাপ প্রয়োগে যে কোনও খাদ্যেই ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদানের জন্ম হয় এ ধারণার উপর ভিত্তি করেই এ কথা বলা হয়েছে।

পরিমিত পরিমাণ ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় লাল মাংস খাওয়ার পরও ক্যান্সার হয়েছে এমন কোনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

৭. লাল পশু মাংস খেলে গেঁটে বাত রোগে আক্রান্ত হতে হয়। সাধারণত পায়ের গোড়ালি, হাঁটু ও উরু সন্ধি এবং কোমরে গেঁটে বাত হয়।

এটা সত্যি যে, উচ্চমাত্রার চর্বি ও কোলোস্টেরলযুক্ত খাদ্যে গেঁটে বাত রোগ সৃষ্টির কারণ ইউরিক এসিড জাতীয় পদার্থ থাকে প্রচুর পরিমাণে। তবে পরিমিত পরিমাণে লাল মাংস খেলে এবং নিয়মিত শরীর চর্চা করলে এ রোগ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

আর গেঁটে বাতের সবচেয়ে বড় কারণ স্থুলতা। সূতরাং যারা ইতোমধ্যেই স্থুলতায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের এখনই লাল মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ।

নিয়মিত প্রচুর পরিমাণ জল পানে এবং ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস অনুসরনের মাধ্যমে ইউরিক এসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেও গেঁটে বাত রোগ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

৮. আরেকটি গুজব হল লাল পশুমাংস হৃদপিন্ডের জন্য ক্ষতিকর।

সত্য হল, লাল পশু মাংস খাওয়া ও হৃদরোগের মধ্যে সরাসরি কোনও যোগসূত্র নেই। অন্য যে কোনও খাদ্য থেকেও আপনার শরীরে অতিরিক্ত চর্বি ও বাজে কোলোস্টেরলের জমা হতে পারে। আপনি যদি প্রতিদিন চর্বিহীন লাল মাংস ৯০ গ্রামের বেশি না খান তাহলে আপনি হুদরোগের ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবেন। তবে এর পাশাপাশি আপনাকে নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে এবং সার্বিকভাবে পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

আরও পড়ুন ::

Back to top button