
এক সময়ের শান্ত পাহাড়ি নদী হঠাৎই ভয়ংকর রূপ নেয়। হিমবাহ ভেঙে নেমে আসা প্রবল জলস্রোত মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় ধ্বংসের শক্তিতে। সেই স্রোতের সামনে একের পর এক বাড়িঘর ও যানবাহন ভেসে গেলেও আশ্চর্যজনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকে একটি সবুজ রঙের চারতলা বাড়ি। নেপালের নুয়াকোট জেলার এই বাড়ি নিয়েই এখন জোর চর্চা। প্রাণ হাতে করে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সাক্ষী ছিলেন বাড়ির মালিক প্রকাশ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
ভয়াবহ হড়পা বানের একটি ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সোশাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিয়োয় দেখা যায়, প্রবল জল ও কাদার স্রোতে আশপাশের বাড়িঘর, গাড়ি-সহ নানা সামগ্রী ভেসে যাচ্ছে। তার মধ্যেই অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সবুজ রঙের চারতলা বাড়িটি। এই দৃশ্য দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। পরে জানা যায়, বাড়ির ছয় বাসিন্দাই নিরাপদে রয়েছেন এবং স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। এরপরই প্রশ্ন ওঠে, এত ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও কীভাবে বাড়িটি টিকে গেল? সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োটি সত্যি, নাকি প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি?
ঘটনাটি বাস্তব। ভিডিয়োটিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি নয়। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কাছে বাড়ির মালিক প্রকাশ জানিয়েছেন সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর জল যখন ভয়ংকর গতিতে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন বাড়ির ভিতরে পরিবারের ছয় সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি কাছেই একটা দোকানে ছিলাম। নদীর জল বাড়ার সতর্কতা কানে আসতেই বাড়ির দিকে ছুটতে থাকি। পৌঁছে সকলকে নিয়ে তড়িঘড়ি বাড়ি ছাড়ার চেষ্টা করি।”
তবে পরিস্থিতি এত দ্রুত খারাপ হয়ে যায় যে বাড়ি ছেড়ে বেরোনোর সুযোগ পাননি তাঁরা। ততক্ষণে প্রবল জলস্রোত বাড়িটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। প্রাণ বাঁচাতে পরিবারের সকলে প্রথমে বাড়ির চারতলায় আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও জল ও কাদার স্রোত পৌঁছে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাড়ির সবচেয়ে উঁচু অংশ, অর্থাৎ ছাদে উঠে যান তাঁরা।
সেই মুহূর্তে পরিবারের কেউই জানতেন না শেষ পর্যন্ত তাঁরা বাঁচতে পারবেন কি না। আশপাশের একাধিক বাড়ি ইতিমধ্যেই নদীর প্রবল স্রোতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে আরও একটি দুশ্চিন্তা তাড়া করছিল প্রকাশকে। হড়পা বান যখন আছড়ে পড়ে, তখন তাঁর ছেলে স্কুলে ছিল। ছেলের কী হয়েছে, সে নিরাপদে ফিরতে পারবে কি না এই চিন্তার পাশাপাশি নিজের পরিবারের সদস্যদের জীবন নিয়েও উৎকণ্ঠায় ছিলেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে যান প্রকাশ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ভয়ংকর জলস্রোতের মধ্যেও সবুজ বাড়িটি টিকে থাকায় ঘটনাটি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু কী কারণে এত বড় ধাক্কাতেও বাড়িটি ভেঙে পড়ল না?
বাড়িটি প্রায় ৪০ বছর আগে তৈরি বলে জানিয়েছেন প্রকাশ। তাঁর দাবি, সেই সময় বাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত ইট, সিমেন্ট ও বালির গুণমান যথেষ্ট ভালো ছিল। পাশাপাশি নদীর কাছাকাছি বাড়ি হওয়ায় নির্মাণের সময় থেকেই বাড়িটিকে তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী করে তৈরি করা হয়েছিল। প্রকাশ বলেন, “বাড়ির ভিত শক্তপোক্ত করতে নিচে সড়ক নির্মাণের উপাদানের দুই-তিনটি স্তরও বসিয়েছিলাম। হয়তো সেই কারণেই ভয়ংকর জল-কাদার স্রোতের সঙ্গে লড়তে সক্ষম হয়েছে বাড়িটি।”
তবে বাড়িটি পুরোপুরি ক্ষয়ক্ষতিমুক্ত থাকেনি। বিশেষ করে নিচের তলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তারপরও গোটা কাঠামো ভেঙে পড়েনি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর নদীর স্রোত কিছুটা কমলে স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘ পাইপের সাহায্যে বাড়ির ছাদে থাকা পরিবারের ছয় সদস্যকে নিরাপদে উদ্ধার করেন।
বাড়িটি টিকে থাকার পিছনে নির্মাণের গুণমান, মজবুত ভিত কিংবা নদীর স্রোতের প্রকৃতি একাধিক কারণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় ভিডিয়োটি দেখার পর অনেকের কাছেই ঘটনাটি এখনও অবিশ্বাস্য। তাঁদের চোখে নেপালের এই সবুজ বাড়ির ঘটনা যেন ‘রাখে হরি মারে কে’-র বাস্তব উদাহরণ। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেও বাড়িটির অটুট থাকা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ ও তাঁর পরিবারের জীবন রক্ষা করেছে।
FAQ
১. নেপালের ভাইরাল সবুজ বাড়িটি কোথায়?
বাড়িটি নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী এলাকার ডুঙ্গে বাজার সংলগ্ন অঞ্চলে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২. বাড়িটি কত বছরের পুরনো?
বাড়িটির বয়স প্রায় ৪০ বছর বলে মালিক প্রকাশ জানিয়েছেন।
৩. বাড়ির ভিতরে কতজন ছিলেন?
বন্যার সময় বাড়িতে মোট ছয়জন ছিলেন বলে প্রকাশ জানিয়েছেন। তাঁদের শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়।
৪. বাড়িটি কেন বন্যায় ভেঙে পড়েনি?
নির্দিষ্ট একটি কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। মালিক শক্ত ভিত ও নির্মাণের মানের কথা বলেছেন; বিভিন্ন বিশ্লেষণে কাঠামো, বাড়ির অবস্থান এবং জলপ্রবাহের গতিপথের সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে।
৫. সবুজ বাড়িটির কোনও ক্ষতি হয়নি?
না। মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও নিচের অংশে জল, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে ক্ষতি হয়েছে এবং সম্পত্তিও নষ্ট হয়েছে।



