রেল লাইন ধরে হেঁটে ঝাড়গ্রামে এলেন তেলেঙ্গানার কারখানার ৯ পরিয়ায়ী শ্রমিক, সাহায্যহীন শ্রমিকেরা হেঁটেই পাড়ি দেবেন রাঁচীর উদ্দেশ্যে!!

স্বপ্নীল মজুমদার, ঝাড়গ্রাম: লকডাউনে তেলেঙ্গানায় আটকে পড়েছিলেন রাঁচীর বাসিন্দা ৯ শ্রমিক। রেল লাইন ধরে পায়ে হেঁটে খড়্গপুর থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঝাড়গ্রাম শহরে হাজির হলেন তাঁরা। তাঁদের বেশির ভাগই আদিবাসী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওই ৯ শ্রমিককে দেখতে পান ঝাড়গ্রাম শহরের স্টেশন পাড়ার কয়েকজন যুবক। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, তেলেঙ্গানা থেকে মোটা টাকা ভাড়া দিয়ে তাঁরা বাসে চেপে এসেছিলেন খড়্গপুরের চৌরঙ্গী পর্যন্ত।
তেলেঙ্গানা থেকে আসার পথে বহুবার অন্ধ্র, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পুলিশ তাঁদের বাস আটকেছিল। থার্মাল স্ক্রিনিং করে তাঁদের অবশ্য ছেড়ে দেওয়া হয়। সোমবার বিকেলে বাসটি তাঁদের খড়্গপুরের চৌরঙ্গী এলাকায় নামিয়ে দেয়। রাস্তায় তাঁদের দেখে কয়েকজন পুলিশ কর্মী জানিয়ে দেন, এভাবে ভিন রাজ্যের শ্রমিকেরা ঘোরাঘুরি করলে সমস্যা রয়েছে। আইনিপথে তাঁরা আসেননি, ফলে তাঁদের সাহায্যও করা যাবে না। তাই সাহাচকের কাছে কয়েকজন পুলিশ কর্মী ওই শ্রমিকদের রেল লাইন ধরে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সোমবার রাতে সাহাচকের কাছে হাইওয়ে ডিভিশনের সেতু তৈরির কাজে নিযুক্ত শ্রমিকেরা তেলেঙ্গানার ৯ শ্রমিককে আশ্রয় দেন। রাতে ভাত-তরকারিও খেতে দেন।
মঙ্গলবার ভোরে ৯ শ্রমিক খড়্গপুর গ্রামীণ এলাকার দিক থেকে রেল লাইন ধরে হাঁটতে থাকেন। এভাবে প্রায় চোদ্দ ঘন্টা হেঁটে এদিন সন্ধ্যায় তাঁরা ঝাড়গ্রামে পৌঁছন। খিদেয়, তেষ্টায় এবং পথশ্রমে কাতর শ্রমিকদের দেখে স্টেশন পাড়ার কয়েকজন যুবক তাঁদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন। রেল গোডাউন চত্বরে তাঁদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। রাজকুমার ওঁরাও, রানথু ওঁরাও, জাথরু ওঁরাও-রা জানালেন, তাঁদের বাড়ি ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচী জেলার বেরো থানার তুতলো গ্রামে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তেলেঙ্গানার পল্লেপল্লি এলাকায় একটি কনস্ট্র্যাকশন কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন তাঁরা। লকডাউনে ওই কোম্পানির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আটকে পড়েন তাঁরা। কিন্তু এভাবে আটকে থেকে তাঁদের সঞ্চিত টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছিল। খাওয়া-থাকার সমস্যা হচ্ছিল। তাঁরা জানান, গত শনিবার পল্লেপল্লি থেকে কলকাতার উদ্দেশ্যে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে একটি বাস ছাড়ে। তাঁরাও ওই বাসে ওঠেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে ভাড়া বাবদ পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়। সোমবার বাসটি তাঁদের চৌরঙ্গীতে নামিয়ে দিয়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে চলে যায়।
তাই তাঁরা রেল লাইন ধরে ঝাড়খণ্ড রাজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দীর্ঘপথ রেল লাইন ধরে হাঁটার ফলে তাঁদের অনেকেই অসুস্থবোধ করায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাঁরা ঝাড়গ্রামে থামেন। তারপরেই স্টেশন পাড়ার যুবকেরা তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। ওই শ্রমিকেরা ঝাড়গ্রাম থানার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু ওই শ্রমিকদের দাবি, তাঁরা এভাবে হেঁটে আসায় পুলিশ কোনও সাহায্য করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়।

তাহলে কী হবে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাজকুমার, রানথু, জাথরুরা বলেন, ‘‘বুধবার সকালে ফের রেল লাইন ধরে হাঁটতে থাকব। নিজের রাজ্যের সীমানায় পৌঁছলে কিছু তো একটা সুরাহা হবে!’’



