ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী দিতে চান না অধীর, অন্য সমীকরণ খুঁজছে রাজনৈতিক মহল

একে ঠিক কী বলা যেতে পারে? সুমতি নাকি পরিস্থিতির চাপে একটু ভিন্ন পথে হাঁটা? ভবানীপুরের উপনির্বাচনে তৃণমূলের তরফে যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হতে চলেছেন সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এবার সেই আসনের উপনির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী দিতে চান না প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। চমকে যাবেন না, ঠিকই শুনছেন। ঠিকই পড়ছেন। মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী দিতে চান না অধীরবাবু। অনেকের কাছেই এটা মনে হতে পারে ভূতের মূখে রামনাম।
অস্বাভাবিক নয়, কারন অধীরবাবু রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র মমতা বিরোধী বলেই পরিচিত। সেই তিনি মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী দিতে চান না, এটা শুনলে চমকে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। তবে এটাই চূড়ান্ত বাস্তব। পরিস্থিতি যা তাতে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বও এই প্রস্তাবে সায় দিয়ে দিতে পারে। তবে অধীরের প্রস্তাব মানতে নারাজ বামেরা। তাঁরা ভবানীপুরে প্রার্থী দিতে চায়। আর সেটা বিজেপিকে মমতা বিরোধীতার জমি একক ভাবে ছেড়ে না দেওয়ার জন্যই।
অধীরবাবুর প্রস্তাব দেখে অনেকেই চমকে যেতে পারেন। তবে অধীরবাবু এই ঘটনাকে প্রতীকি বলেই দেখাতে চাইছেন। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেস আসন্ন ৬টি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে অবশ্যই অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু ভবানীপুরে প্রার্থী না দেওয়ার জন্য তিনি দলের হাইকম্যান্ডকে অনুরোধ করেছেন। এতে দলের ভাবমূর্তি ভালো হবে। মানুষের কাছেও বার্তা যাবে।
যদিও প্রদেশ কংগ্রেস শিবির সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পদক্ষেপ দেখে কেউ যেন এটা ভেবে না নেন যে অধীরবাবু মমতা বিরোধীতা করা ছেড়ে দিয়েছেন। আসলে পরিস্থিতির চাপে অধীরবাবুকেও বদলাতে হচ্ছে। তাঁর নিজের জেলা মুর্শিদাবাদ যা চিরাচরিত ভাবে কংগ্রেসী দুর্গ হিসাবে পরিচিত সেখানে তৃণমূল শুধু ক্লিন সুইপে জিতেছে তাই নয়, জেলায় কংগ্রেস কোনও খাতাই খুলতে পারেনি। অথচ অধীরবাবুর নিজের শহর, তাঁর খাস তালুক বহরমপুর সহ মুর্শিদাবাদ আসনেও জয়ী হয়েছে বিজেপি।
এমনকি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সামনে আসার পরে অনেকেই সরব হয়েছেন এই বলে যে, অধীরবাবুর অতি বড় মমতা বিরোধীতার জেরেই এবারের ভোটে দলের এই হাল হয়েছে। মানুষ কংগ্রেসকে প্রত্যাখান করেছে। তাই অধীরবাবুও এখন বেশ চাপে আছেন।
এক তো তিনি নিজে বেশ ভালই বুঝতে পারছেন, এই অবস্থা চললে তাঁর প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির পদ যেতে বেশিক্ষন সময় লাগবে না। বস্তুত রাজ্যে তো বটেই, জাতীয় কংগ্রেসের বহু নেতাই এখন তাঁর অপসারণ চাইছেন। তাঁরা মমতার সঙ্গে কংগ্রেসের যোগসূত্র মসৃণ করে তুলতে চাইছেন। আর সেই কারনেই অধীর কাঁটা উপড়ে ফেলে দিতে চাইছেন তাঁরা। শুধু তাই নয়, তাঁরা এটাও মনে করেন যে অধীরবাবুর হাত ধরেই বহরমপুর আর মুর্শিদাবাদ আসনে জয়ী হয়েছে বিজেপি।
এই সমস্ত বিষয়ে অধীরবাবু নিজেও ওয়াকিবহাল। তাই তিনিও এখন তীব্র মমতা বিরোধীতার পথ থেকে সরে আসতে চাইছেন। তিনি নিজে এটাও বুঝেছেন তৃণমূল পাশে না থাকলে ২০২৪ এর ভোট বৈতরনী পার হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। আর যেহেতু বিধানসভায় এখন কংগ্রেসের বা বামেদের কোনও বিধায়ক নেই তাই তাঁর পক্ষে রাজ্যসভায় যাওয়াও সম্ভব নয়। প্রদেশ কংগ্রেস পদ হাতছাড়া হলে কার্যত তাঁর রাজনৈতিক জীবন থেকে সন্ন্যাস নেওয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও রাস্তা খোলা থাকবে না। তাই তাঁর গলাতেও সুর বদলাচ্ছে।
যদিও তাতে আগামী দিনে তাঁর কেরিয়ারের ভরাডুবি ঠেকানো সম্ভব কিনা তা জোর গলায় কেউই বলতে পারছেন না। বরঞ্চ অনেকেই মনে করছেন, তেমন বুঝলে অধীরবাবু হয়তো শিশির অধিকারীর মতোই গান্ধিবাদ ছেড়ে মনুবাদকে আঁকড়ে ধরবেন। পদ্মশিবিরে নিজের নাম লেখাবেন।
তবে অধীরবাবুর ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী না দেওয়ার প্রস্তাবে আপত্তি আছে বামেদের। এই বিষয়ে বামেদের বক্তব্য, জোট এখনও ভেঙে যায়নি। তাই জোটেই ঠিক হবে কে কোথায় প্রার্থী দেবে বা দেবে না। ভবানীপুর আসনটি কংগ্রেস নিতে না চাইলে বা সেখানে প্রার্থী দিতে না চাইলে সেখানে জোট প্রার্থী দেবে। তা বামেদের হতে পারে বা আইএসএফেরও হতে পারে। খালি মাঠ ছাড়া হবে না। আর সেটা বিজেপিকে ঠেকানোর জন্যই।
জোটের প্রার্থী না থাকার অর্থ এই রাজ্যে মমতা বিরোধীতার একচ্ছত্র দাবিদার বিজেপিকেই তুলে ধরা। সেটা করা হবে না। বরঞ্চ বিজেপির এখন ভোট কমবে। আগামী দিনে তা আরও ভালো বোঝা যাবে। তাই এখনই সময় নিজেদের জমি বাড়িয়ে নেওয়া। হারানো জমি ফেরত নেওয়া। তবে বামেদের অনেকেই মনে করছেন, অধীরবাবু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের হিসাব মাথায় রেখেই এই পদক্ষেপ নিতে চাইছেন।
এখন তিনি মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী না দিয়ে সৌজন্যতা দেখাতে চাইছেন যাতে ২৪ এ বহরমপুর লোকসভা আসনে তৃণমূল তাঁর বিরুদ্ধে যেন কোনও প্রার্থী না দেয়। কারন তৃণমূল প্রার্থী দিতে তাঁর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। আর তা হলে কার্যত অধীরবাবুর নিজের রাজনৈতিক জীবনেই একটা ফুলস্টপ পড়ে যাবে। তা ঠেকাতেই এখন আসন ছাড়ার সৌজন্যতা দেখাচ্ছেন তিনি।
সুত্র : এই মুহুর্তে



