
ঝাড়গ্রাম: সামাজিক আন্দোলন থেকে অবসর নিলেন জঙ্গলমহলের অবিসংবাদিত কুড়মি নেতা রাজেশ মাহাতো। শনিবার খড়্গপুর গ্রামীণের একটি অতিথিশালায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘কুড়মি সমাজ পশ্চিমবঙ্গ’-এর রাজ্য সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। আপাতত ওই সংগঠনের রাজ্য সভাপতির পদ সামলাবেন যূথিকা মাহাতো। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়ে এদিন রাজেশ বলেন, ‘‘নিজের দল গড়তে চলেছি। জঙ্গলমহলের অন্যান্য জনজাতি সামাজিক সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনার পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’’
তবে এর মধ্যেই কিশোরকুমারের জনপ্রিয় একটি বাংলা গানের সঙ্গে কুড়মি নেতা রাজেশের সামাজিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্বের একটি ভিডিয়ো নেট মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অর্থবহ গানটির ভিডিয়ো দেখে শুনে অনেকেই বলছেন, তৃণমূলে ভিড়ছেন না কুড়মি নেতা। মুকুল দত্তের লেখা ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর করা ‘কেন রে তুই চড়লি ওরে বাবুদের জুড়ি গাড়িতে’ কিশোরকুমারের কন্ঠে শারদ অর্ঘ্যের গানটি আশির দশকের গোড়ায় রীতিমতো জনপ্রিয় হয়েছিল।
সেই গানের কথার রেশ ধরে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছেন, আর যাই হোক মূল ধারার রাজনৈতিক দলে রাজেশ যোগ দেবেন না বলেই এমন ভিডিয়ো ছড়াচ্ছেন তাঁর ঘনিষ্ঠমহল। ‘এ গাড়ি থামবে গিয়ে সোজা চোরাবালির চর, যে চরে কোনও দিনও বাঁধে না কেউ ঘর, কাগজের ফুলের মতো থাকবি পড়ে বাগান বাড়িতে’ কিংবা ‘জীবন নিপয়ে করিস নারে সর্বনাশের পেশা’র মত গানের কয়েকটি লাইনে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে রাজেশের ছবি দেখে জল্পনা বাড়ছে বিভিন্ন মহলে। যদিও রাজেশের দাবি, সামাজিক আন্দোলনের ২৭ বছর অতিক্রান্ত। সেই প্রেক্ষিতেই তাঁকে ভালবাসেন, এমন কয়েকজন ওই ভিডিয়ো তৈরি করেছেন।
সেই ভিডিও তিনিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন। তবে সূত্রের খবর, এরই মধ্যে জঙ্গলমহলের অন্যান্য জনজাতি নেতাদের সঙ্গে শীঘ্রই বৈঠকে বসতে চলেছেন রাজেশ। ফলে জল্পনা আরও বাড়িয়েছেন কুড়মি নেতা। সূত্রের খবর, রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে চাপে রাখতে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করে ফেলেছেন রাজেশ। এখন অন্যান্য আদিবাসী-মূলবাসী সামাজিক সংগঠনগুলির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে সহমতের অপেক্ষা। ২৭ দফা দাবিসনদ প্রকাশ করেছেন রাজেশ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, জঙ্গলমহলকে সংবিধানের পঞ্চম তফসিলের আওতায় আনা, কুড়মিদের এসটি তালিকাভুক্তির বিল বিধানসভায় পাশ করানো, কুড়মালি ও মুন্ডারি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তি, জল-জমি-জঙ্গলের উপর আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভূমিজ বিদ্রোহের নেতার নামে ঝাড়গ্রাম মেডিক্যাল কলেজের নামকরণ, লোধা সমাজের প্রয়াত কৃতী চুনি কোটালের নামে ঝাড়গ্রাম রাজ মহিলা কলেজের নামকরণ, করম, বাঁদনা ও মকর এই তিনটি পরবকে সরকারি গেজেটেড ছুটির দিন ঘোষণা, অরণ্য ধ্বংস ঠেকানো ইত্যাদি।
সম্প্রতি সবংয়ে গিয়ে জলসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী মানস ভূঁইয়ার সঙ্গে দেখা করে জল্পনা বাড়িয়েছিলেন রাজেশ। এক সময়ে মানসের হাত ধরে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে অবশ্য কংগ্রেস ছেড়ে সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন। তবে তার অনেক আগে ছাত্রাবস্থায় রাজেশ প্রয়াত ঝাড়খণ্ডী নেতা নরেন হাঁসদার নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন এবং জঙ্গলহলকে বৃহৎ ঝাড়খণ্ড রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। পরে অজিতপ্রসাদ মাহাতোর নেতৃত্বাধীন আদিবাসী কুড়মি সমাজের বহু কর্মসূচির পুরোভাগে ছিলেন রাজেশ। লোকসভা ভোটের পরে নিজের সামাজিক সংগঠন ‘কুড়মি সমাজ পশ্চিমবঙ্গ’ গড়ে আন্দোলন শুরু করেন।
বিধানসভা ভোটের আগে বিভিন্ন কুড়মি সামাজিক সংগঠনগুলির উদ্যোগে কুড়মি সমন্বয় মঞ্চ গঠিত হয়। ওই মঞ্চের কার্যত ‘মুখ’ ছিলেন রাজেশ। বিধানসভা ভোটে গোপীবল্লভপুরে নির্দল প্রার্থী হয়ে রাজেশ হেরে যান। এরপরই সামাজিক আন্দোলন থেকে তিনি সরছেন বলে ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছিলেন। জঙ্গলমহলে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও কুড়মিদের নিয়ে পৃথক আঞ্চলিক দল গড়েই কি তবে রাজনীতির ময়দানে পা রাখছেন? রাজেশের জবাব, ‘‘জঙ্গলমহলবাসীর স্বার্থে আঞ্চলিক দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা!’’



