
একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের অন্দরে যে ভাঙন ধরেছিল, তা যেন কিছুতেই থামছে না। আরও এক হেভিওয়েট বিধায়ক তথা মমতার দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী মদন মিত্র বুধবার নাম লেখালেন বিদ্রোহী শিবিরে। বিরোধী শিবিরের দিকে পা বাড়ানোর সময় মদন মিত্রের নিশানায় ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এই আবহেই এবার পাল্টা হুঙ্কার ছাড়লেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, যারা দল ছেড়ে চলে যাচ্ছে তারা আসলে ‘বেইমান’। একই সঙ্গে দলের জন্মলগ্নের লড়াইয়ের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ২০২৬ সালেও ‘শূন্য’ থেকে নতুন করে লড়াই শুরু করার বার্তা দিলেন তিনি।
চলতি বছরের ২১ জুলাইয়ের শহিদ সমাবেশ নিয়েও তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা। ভেন্যু বদলে এবার সভা হতে চলেছে বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের সামনে। সব মিলিয়ে যখন তৃণমূলকে ‘ছন্নছাড়া’ বলে কটাক্ষ করছে বিরোধী শিবির, ঠিক তখনই সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে দলের কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা করতে মরিয়া বার্তা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
আরও পড়ুন :: ‘দম থাকলে ব্রিগেডে যান!’ ২১ জুলাই নিয়ে মমতা শিবিরের অস্বস্তি বাড়িয়ে বেনজির তোপ দিলীপের
“বেইমানদের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী”, নাম না করে মদনকে তোপ মমতার
বুধবার বিরোধী দলনেতার ঘরে গিয়ে গেরুয়া শিবিরে যোগ দিয়েছেন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র। আর তার পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দেন তৃণমূল নেত্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “দলের প্রতীক দেখে আপনারা ভোট দিয়েছিলেন। বেইমানদের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।”
মদন মিত্রের দলত্যাগের পিছনে কেন্দ্রীয় এজেন্সির ভয় কাজ করছে বলে দাবি করেছেন তৃণমূল নেত্রী। নাম না করে তিনি জানান, ভয় দেখিয়ে, পরিবারকে ইডি (ED) সমন পাঠানোর ভয় দেখিয়ে দল ভাঙানো হচ্ছে। মমতা বলেন, “ছেলে, স্ত্রীর নামে নোটিস দেওয়া হচ্ছে। আরও একজন আজ গিয়েছে, আগেই জানিয়েছিলেন তার পরিবারকে ইডি সমন করেছে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম। তাই সব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
‘অভিষেক শুধুই বাহানা’, ভাইপোর পাশেই দাঁড়ালেন দলনেত্রী
বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ার সময় মদন মিত্র সরাসরি নিশানা করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁর দাবি ছিল, অভিষেকের জন্যই দলের এই দশা। তবে এই অভিযোগে কান দিতে নারাজ মমতা। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, অভিষেককে শুধু বাহানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দলনেত্রীর কথায়, “অভিষেক বাহানা। ওর ভুল মাফ হয়ে গিয়েছে। সে লড়ে যাচ্ছে। আগামী ৫০ বছর লড়বে।” এই বার্তার মাধ্যমে মমতা স্পষ্ট করে দিলেন যে, দলের অন্দরে অভিষেকের রাশ আলগা হচ্ছে না এবং তিনি অভিষেকের পাশেই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
১৯৯৭ সালের স্মৃতি চারণ: ‘শূন্য’ থেকে শুরুর অঙ্গীকার
দলের এই কঠিন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠালগ্নের কঠিন দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, অতীতেও দল একা লড়াই করেছে, এবারও পারবে। ১৯৯৭-৯৮ সালের রাজনৈতিক লড়াইয়ের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন:
১ জানুয়ারি ১৯৯৮: তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক পাওয়া।
১ মাস ২২ দিন পর: প্রথম নির্বাচনে লড়াই করে ৮ জন সাংসদ জয়ী হন।
১৯৯৯ সাল: লোকসভা নির্বাচনে সাংসদ সংখ্যা বেড়ে হয় ৯।
২০০৪ সাল: দল প্রায় একা হয়ে পড়েছিল, তাও লড়াই থামেনি।
বর্তমানে রাজ্যসভায় ১০ জন এবং লোকসভায় ৮ জন সাংসদ থাকার কথা উল্লেখ করে মমতা হুঙ্কার দেন, “১৯৯৭ সালে একা ছিলাম। লড়াই করেছি। যারা যাওয়ার চলে যাক। ১৯৯৭-৯৮ সালে লড়াই করতে পারলেও, ২০২৬ সালেও নতুন করে শুরু করার ক্ষমতা রাখি।”
আদালতের শর্ত মেনে বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামেই ২১ জুলাইয়ের সভা
এ বছর কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের ২১ জুলাইয়ের শহিদ স্মরণের জায়গা বদল করতে হয়েছে। আদালতের কিছু শর্ত মেনে এবার সভা হবে বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের সামনে। এই সভা বানচাল করার চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মমতা।
তিনি বলেন, “আমি প্রতিবারের মতো ২০ জুলাই জায়গা পরিদর্শনে যাব। পুলিশকে অনুরোধ করব যেন বিজেপি ও সেটিং পার্টি কোনও ঝামেলা না করতে পারে, তা দেখতে।” বিরোধীরা ডেকোরেটার্স বা মাইক ব্যবসায়ীদের ভয় দেখাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে দলনেত্রীর চ্যালেঞ্জ, “মনে রাখবেন, খালি গলাতেও সভা করতে পারি। বলেছি যখন, মিটিং হবেই। আমরা ৩টে পর্যন্ত মিটিং করব।”



