‘ভূতের বাড়ি’তে এক রাত কাটালেই মিলবে লাখ টাকা! এই অদ্ভুত পেশায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন তরুণরা
ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

জাপানের আবাসন ব্যবসায় (Real Estate Market) এখন এক অদ্ভুত কিন্তু লাভজনক পেশার জয়জয়কার। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হচ্ছে ‘জিকো বুক্কেন’ (Jiko Bukken)। ভূত তাড়াতে ও দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকা অভিশপ্ত বাড়িগুলোর ভয় কাটাতে মালিকেরা এখন টাকা দিয়ে মানুষ ভাড়া করছেন। মাত্র এক রাত সেই বাড়িতে থাকলেই পকেটে আসবে মোটা অঙ্কের টাকা! কিন্তু কী এই রহস্যময় পেশা? কেনই বা জাপানে এর চাহিদা আকাশচুম্বী? জেনে নিন বিস্তারিত।
কী এই ‘জিকো বুক্কেন’? কেন এই বাড়িগুলোকে ‘অভিশপ্ত’ বলা হয়?
জাপানি ভাষায় ‘জিকো বুক্কেন’ শব্দের অর্থ হলো এমন সব প্রপার্টি বা বাড়ি, যেখানে অতীতে কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যা
ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু
‘লোনলি ডেথ’ বা একাকী মৃত্যু: জাপানের এক বড় সমস্যা হলো প্রবীণদের একাকীত্ব। অনেক সময় কোনো বৃদ্ধ মানুষ ঘরে একা মারা যান এবং দিনের পর দিন বা সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেউ তা জানতেও পারেন না।
আরও পড়ুন :: বিয়ের আগেই বাসর রাত, বিছানায় সুখ পেলেই কেবল বিয়ে হয় যেখানে
জাপানের কঠোর আইন অনুযায়ী, কোনো বাড়িতে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে, তা বিক্রি বা ভাড়া দেওয়ার আগে নতুন ক্রেতাকে বিষয়টি স্পষ্ট করে জানাতেই হবে। আর এই আইনের জেরেই বছরের পর বছর লাখ লাখ বাড়ি খালি পড়ে থাকে, কারণ ভূত বা অলৌকিকতার ভয়ে কেউ সেখানে পা রাখতে চান না।
এক রাতে আয় ৮৮ হাজার ইয়েন! কী করতে হয় এই চাকরিতে?
বাড়ির মালিকদের এই কোটি কোটি টাকার লোকসান থেকে বাঁচাতে বাজারে এসেছে এক নতুন ধরণের স্টার্ট-আপ বা এজেন্সি। তারা এমন সব সাহসী মানুষদের খুঁজছেন যারা এই ‘ভৌতিক’ বাড়িগুলোতে রাত কাটাতে পারবেন।
পারিশ্রমিক: এক রাতের জন্য দেওয়া হচ্ছে ৮৮ হাজার জাপানি ইয়েন, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৫২,০০০ টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭০,০০০ টাকার কাছাকাছি)!
কাজের ধরণ: কাজটা শুধু ঘুমিয়ে থাকা নয়। রাত কাটানোর সময় ওই ব্যক্তিরা বাড়ির বিভিন্ন কোণে অত্যাধুনিক ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার এবং সেন্সর বসিয়ে রাখেন। পুরো বাড়ির ওপর কড়া নজরদারি চালানো হয় কোনো অতিপ্রাকৃত বা অস্বাভাবিক ঘটনার প্রমাণ খোঁজার জন্য।
নিরাপত্তার সার্টিফিকেট ও ক্ষতিপূরণ: যদি সারারাত কোনো অলৌকিক ঘটনা না ঘটে, তবে ওই সংস্থা বাড়িটিকে ‘ভৌতিক কার্যকলাপ মুক্ত’ বলে একটি সরকারি ধাঁচের শংসাপত্র (Certificate) দেয়। এমনকি কিছু সংস্থা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জানাচ্ছে, সার্টিফিকেট দেওয়ার পরেও যদি ভবিষ্যতে কোনো ভূত দেখার প্রমাণ মেলে, তবে তারা মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেবে!
কেন জাপানে হু হু করে বাড়ছে এই ব্যবসার চাহিদা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে জাপানের গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট।
জনসংখ্যা ও জন্মহার হ্রাস: জাপানে তরুণের সংখ্যা কমছে এবং প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে দেশজুড়ে লাখ লাখ বাড়ি ফাঁকা পড়ে থাকছে।
অর্ধেক দামে বাড়ি কেনার সুযোগ: এই ধরনের ‘অভিশপ্ত’ বাড়িগুলো সাধারণ বাড়ির তুলনায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম দামে পাওয়া যায়।
কুসংস্কার বনাম বাস্তব: তরুণ প্রজন্মের নতুন ট্রেন্ড
একটা সময় ছিল যখন মানুষ এই বাড়িগুলোর নাম শুনলেই দূরে পালাত। কিন্তু বর্তমানের আধুনিক ও বাস্তববাদী জাপানি তরুণ প্রজন্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবছেন। আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়ার যুগে তারা কুসংস্কারের চেয়ে সস্তায় ভালো বাড়ি পাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ‘ভূত বলতে কিছু নেই’—এই বিশ্বাস এবং এজেন্সির দেওয়া ‘ক্লিন চিট’ সার্টিফিকেটের ওপর ভরসা করে অনেকেই এখন কম দামে এই জিকো বুক্কেনগুলো লুফে নিচ্ছেন।
এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো এই ব্যবসা যেমন বাড়ির মালিকদের লোকসান কমাচ্ছে, তেমনই সাহসী মানুষদের ঘরে বসেই এক রাতে লাখপতি হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। বিজ্ঞান আর ব্যবসার এই মেলবন্ধন সত্যিই তাক লাগিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে!



