২০২১-এ মমতার পা ভাঙেইনি! ‘পিজির রিপোর্ট আমার কাছে আছে’ নন্দীগ্রামে চ্যালেঞ্জ শুভেন্দুর
ওয়েবডেস্ক

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামের বীরুলিয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ে চোট লাগার ঘটনা নিয়ে পাঁচ বছর পর নতুন দাবি করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার বীরুলিয়ায় নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে শুভেন্দুর দাবি, ওই ঘটনায় মমতার পায়ে কোনও ফ্র্যাকচার হয়নি। তাঁর কাছে পিজি হাসপাতালের রিপোর্ট রয়েছে বলেও দাবি করে প্রয়োজনে সেই নথি দেখানোর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন তিনি।
তবে ২০২১ সালের ঘটনার পর প্রকাশিত চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমসাময়িক রিপোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঁ পা ও গোড়ালিতে গুরুতর হাড়ের চোটের কথা বলা হয়েছিল। সেই সময় তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন।
বীরুলিয়ায় দাঁড়িয়ে কী দাবি শুভেন্দুর?
নন্দীগ্রামের বীরুলিয়ায় সভা থেকে শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, ২০২১ সালের ১০ মার্চের ঘটনাটিকে যেভাবে মমতার পা ভাঙার ঘটনা হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল, বাস্তবে তেমনটা ঘটেনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গাড়ির দরজায় লোহার বিমের ধাক্কা লেগে মমতার পায়ে সামান্য চোট হয়েছিল। এরপর সেটিকে ফ্র্যাকচার হিসেবে দেখিয়ে ব্যান্ডেজ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শুভেন্দুর দাবি, মমতার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকেরাই রিপোর্টে ‘নো ফ্র্যাকচার’ লিখেছিলেন। সেই নথি তাঁর কাছে রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তিনি তা প্রকাশ করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
২০২১ সালের ঘটনায় কী জানা গিয়েছিল?
২০২১ সালের ১০ মার্চ নন্দীগ্রামে নির্বাচনী প্রচারের সময় বীরুলিয়া এলাকায় আহত হন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনাটির পর তাঁকে কলকাতায় নিয়ে এসে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
সেই সময় মমতা অভিযোগ করেছিলেন, কয়েকজন তাঁকে ধাক্কা দিয়েছিল। অন্যদিকে পরবর্তী পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং পরিকল্পিত হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে রিপোর্টে বলা হয়েছিল।
পাশাপাশি, তৎকালীন মুখ্যসচিবের নির্বাচন কমিশনে দেওয়া রিপোর্টে গাড়ির দরজা মমতার পায়ে আঘাত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, ২০২১ সালের ঘটনার কীভাবে চোট লেগেছিল এবং চোটের চিকিৎসাগত প্রকৃতি কী ছিল—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
চিকিৎসা-সংক্রান্ত তৎকালীন রিপোর্টে কী ছিল?
ঘটনার পর এসএসকেএম হাসপাতালের চিকিৎসকের বক্তব্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মমতার বাঁ গোড়ালি ও পায়ে গুরুতর হাড়ের চোটের কথা বলা হয়েছিল। ডান কাঁধ, হাত ও ঘাড়েও আঘাতের উল্লেখ ছিল।
আরও কিছু সমসাময়িক প্রতিবেদনে গোড়ালি ও পায়ের হাড়ে চোটের পাশাপাশি ফ্র্যাকচারের কথাও প্রকাশিত হয়েছিল।
তাই শুভেন্দুর বর্তমান ‘ফ্র্যাকচার হয়নি’ দাবির সঙ্গে ২০২১ সালের চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রকাশিত বিবরণের পার্থক্য রয়েছে। শুভেন্দু যে নির্দিষ্ট রিপোর্টের কথা বলছেন, সেটি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত তাঁর দাবির নথিগত সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
‘রিপোর্ট আমার কাছে’, চ্যালেঞ্জ শুভেন্দুর
বীরুলিয়ার সভায় শুভেন্দু বলেন, তাঁর কাছে ওই সময়কার হাসপাতালের নথি রয়েছে। প্রয়োজন হলে তিনি তা দেখাবেন বলেও জানান।
এই বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল—শুভেন্দু একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা-নথির অস্তিত্বের দাবি করেছেন। সেই নথিতে ঠিক কী লেখা রয়েছে, তা প্রকাশ্যে এলে ২০২১ সালের চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যাচাই করা সম্ভব হবে।
চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ড নিয়েও আক্রমণ
বীরুলিয়ার একই প্রচারসভায় শুভেন্দু অধিকারী তাঁর প্রাক্তন সহযোগী চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও তোলেন। বিজেপি নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে নিহত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে প্রার্থী করেছে।
চন্দ্রনাথ রথ হত্যার ঘটনায় শুভেন্দু এর আগেও ‘ভাইপো গ্যাং’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন, খুনের জন্য ২ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেছিলেন, তদন্তে একাধিক গ্রেফতার হয়েছে এবং মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে দেওয়া হয়েছে।
বীরুলিয়ার সভায়ও সেই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করে শুভেন্দু বলেন, হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক বদলা ভোটের মাধ্যমে নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। তবে এই বক্তব্যগুলি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ ও দাবি—সেগুলিকে আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের প্রচারে পুরনো প্রসঙ্গ
নন্দীগ্রাম এখন আবার রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে উপনির্বাচনকে ঘিরে। শুভেন্দু অধিকারী আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর বিজেপির প্রার্থী হয়েছেন তাঁর নিহত সহযোগী চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথ। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচন ৬ অক্টোবর হওয়ার কথা রয়েছে।
সেই প্রচারেই পাঁচ বছর আগের বীরুলিয়া কাণ্ড সামনে এনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ের চোটের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের চ্যালেঞ্জ দিলেন শুভেন্দু।
এখন নজর কোন দিকে?
এই বিতর্কে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শুভেন্দু অধিকারী যে ‘পিজি হাসপাতালের রিপোর্ট’-এর কথা বলেছেন, সেটি তিনি প্রকাশ করেন কি না। নথিটি প্রকাশ্যে এলে তার তারিখ, হাসপাতালের নাম, চিকিৎসকের স্বাক্ষর এবং রিপোর্টে ব্যবহৃত চিকিৎসাগত পরিভাষা যাচাই করাই হবে মূল বিষয়।
অন্যদিকে ২০২১ সালের তৎকালীন হাসপাতাল-সংক্রান্ত নথি ও চিকিৎসকদের বক্তব্যের সঙ্গে ওই দাবির মিল-অমিলও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
FAQ
২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী হয়েছিল?
১০ মার্চ ২০২১ নন্দীগ্রামের বীরুলিয়া এলাকায় আহত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শুভেন্দু অধিকারী এখন কী দাবি করেছেন?
শুভেন্দুর দাবি, ওই ঘটনায় মমতার পায়ে কোনও ফ্র্যাকচার হয়নি এবং তাঁর কাছে পিজি হাসপাতালের রিপোর্ট রয়েছে।
২০২১ সালের চিকিৎসা-সংক্রান্ত রিপোর্টে কী বলা হয়েছিল?
সমসাময়িক প্রতিবেদনে মমতার বাঁ গোড়ালি ও পায়ে গুরুতর হাড়ের চোটের কথা বলা হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষকরা কী বলেছিলেন?
বিশেষ পর্যবেক্ষকদের রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘটনাটি দুর্ঘটনাজনিত এবং পরিকল্পিত হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে রিপোর্ট করা হয়েছিল।
শুভেন্দু যে রিপোর্টের কথা বলেছেন, সেটি কি প্রকাশ্যে এসেছে?
এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া বর্তমান সূত্রগুলিতে শুভেন্দুর দাবির উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু তিনি যে নির্দিষ্ট নথির কথা বলেছেন তার পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই নথিটি সরাসরি যাচাই না করে তাঁর দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।



