‘‘লক্ষ্য থেকে আমাকে কেউ সরাতে পারেনি, পারবেও না’’, লালগড়ের নেতাইয়ে বললেন শুভেন্দু অধিকারী
স্বপ্নীল মজুমদার

স্বপ্নীল মজুমদার, লালগড়: পুজোর মুখে লালগড়ের নেতাই গ্রামের ১৭ জন গৃহহীনের হাতে বাড়ির চাবি তুলে দিলেন পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গ্রামের ৫২ জন মহিলাকে দিলেন সেলাই মেসিন। জানালেন, আজীবন তিনি নেতাই গ্রামের পাশে থাকবেন। রবিবার নেতাই গ্রামে শুভেন্দুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই কর্মসূচির ব্যবস্থাপনায় ছিল নেতাই শহীদ স্মৃতিরক্ষা কমিটি।
বেশ কিছুদিন ধরে রাজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে এবং রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে। দলে থেকেও তিনি দলের কোনও কর্মসূচিতে নেই। আবার ঝাড়গ্রাম জেলায় কোনও প্রশাসনিক কর্মসূচিতেও প্রায় বছর খানেক তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। তবে তাঁর অনুগামীরা দলহীন জনসংযোগ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
শুভেন্দু করোনায় আক্রান্ত হতে নেতাই সহ ঝাড়গ্রাম জেলার বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর সুস্থতা কামনায় পুজো ও প্রার্থনাসভা হয়েছে। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি নেতাই গ্রামে শহীদ স্মরণ অনুষ্ঠানে এসে এলাকাবাসীর নানা ক্ষোভ ও অপ্রাপ্তির কথা শুনে গিয়েছিলেন শুভেন্দু। প্রথম পর্যায়ে তাঁর উদ্যোগে এবং পূর্ব মেদিনীপুরের একটি ট্রাস্টের সহযোগিতায় নেতাই গ্রামের ১৭ জন গৃহহীনকে বাড়ি করে দেওয়া হয়েছে।
এদিন সেই বাড়ির চাবি প্রাপকদের হাতে তুলে দিতে এসেছিলেন শুভেন্দু। মহিলাদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে সেলাই মেশিনও দেওয়া হল তাঁর উদ্যোগে। নেতাই শহীদ বেদির পাশে ছোট মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। ছিলেন শহীদ স্মৃতিরক্ষা কমিটির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দ্বারকানাথ পণ্ডা, শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ নেতা তন্ময় রায়, সরজিৎ রায়, পলাশ জানার মতো অনেকেই। অনুষ্ঠানে শুভেন্দু স্বল্প কয়েক মিনিটের অরাজনৈতিক বক্তৃতা দিলেও তাঁর বক্তব্যের নির্যাস নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি নেতাই গ্রামে সিপিএমের শিবির থেকে গুলি চলার ঘটনায় ৯ গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়। জখম হন ২৯ জন। শুভেন্দু বলেন, ‘‘২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে নেতাই গ্রামের সঙ্গে আমার মানসিক ও হৃদয়ের সম্পর্ক। আমি প্রচারের আড়ালে থেকে শহীদ পরিবারের পাশে অনেক আগেই দাঁড়িয়েছি। প্রত্যেক বছর দুর্গাপূজার সময় আমি শহীদ এবং আহত পরিবারদের জন্যে আমার উপহার সামগ্রী প্রতিনিধি মারফত পাঠাই।
আরও পড়ুন: চিন যুদ্ধের উসকানি দিক, ভারতীয় সেনা পুরোপুরি তৈরি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অসীম ক্ষমতা আমার নেই। আমার সামর্থ্যমতো আমি পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।’’ শুভেন্দু জানান, তিনি প্রত্যেক বছর ৭ জানুয়ারি নেতাই গ্রামে আসেন শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। এবার পুজোর আগে এলেন কারণ, এর আগে নেতাই দিবসের দিনে এলাকাবাসী তাঁকে নানা ক্ষোভের কথা জানিয়েছিলেন। শুভেন্দু বলেন, ‘‘নেতাইবাসীর মধ্যে ব্যাপক একটা ক্ষোভ লক্ষ্য করি। আমার প্রতি তাঁদের ভালবাসা ছিল, থাকবে।
কিন্তু আমি তখনই বুঝেছিলাম তাই স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারে তাঁদের কথা শুনেছিলাম। আলোচনাতেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাংশের অসহযোগিতার কথাও যাইহোক, সেটা সত্যি-মিথ্যা আমি ওতো গভীরে যাবো না। আমি বিতর্কিত মন্তব্য কখনও করি না। সংবাদমাধ্যম থেরেও দূরে থাকি। বিতর্কিত মন্তব্যে আমাকে পাবেন না।’’ শুভেন্দু জানান, স্থানীয়রা কাজ চান, কেউ বাড়ি চান।

তাঁদের সমস্যার বিষয়গুলি জেনে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাধ্যমতো সাহায্য করছেন। নেতাই মামলার সাক্ষীরাও সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে তাঁর কাছে নালিশ করেছেন বলে জানান শুভেন্দু। শুভেন্দু বলেন, ‘‘আমি গ্রামবাসীকে তাদের বলেছিলাম আকাশের চাঁদ আমি তোমাদের হাতে ধরিয়ে দিতে পারব না। ঘরে ঘরে চাকরি, লক্ষ লক্ষ টাকা এবং সবাইকে বড়লোক করে দিতে পারব না কিন্তু ন্যূনতম যে সহযোগিতাটা আমার করা উচিত তা আমি করবো।
আমি সাধ্যমতো কথা রাখার চেষ্টা করছি।’’ শুভেন্দু জানান, করোনা থেকে সেরে উঠলেও শারীরিক ভাবে তিনি দুর্বল রয়েছেন। তাই দীর্ঘ বক্তৃতা তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। শুভেন্দু বলেন, ‘‘চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী যতদিন থাকবে এবং আপনাদের শুভেন্দু অধিকারী যতদিন হাঁটতে চলতে পারবে, ততদিন আমি প্রতিবছর নেতাই গ্রামে আসব। নেতাইয়ের সঙ্গে ছিলাম আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকবো এবং আমার লক্ষ্য থেকে, কর্মপদ্ধতি থেকে, আমার দায়বদ্ধতা থেকে কেউ কোনদিন সরিয়ে দিতে পারেনি।
ভবিষ্যতেও পারবে না।’’ কাকে উদ্দেশ্য করে একথা বললেন মন্ত্রী। প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বিভিন্ন মহলে। শুভেন্দুর অনুগামী তন্ময় রায় এদিন অনুষ্ঠানের সূচনায় শুভেন্দুকে ‘জঙ্গলমহলের মুক্তিসূর্য’ বলেন। শুভেন্দু এদিন রবীন্দ্রনাথের কবিতার দু’টি পঙক্তি ‘আমরা চলি সমুখ পানে, কে আমাদের বাঁধবে, রইল যারা পিছুর টানে কাঁদবে তারা কাঁদবে’ বলে বক্তব্য শেষ করেন। কবিতার অনুসঙ্গ দিয়ে কাদের ইঙ্গিতবাহী বার্তা দিলেন ‘নেতাই গ্রামের সেবক’ শুভেন্দু? জবাবের অপেক্ষায় জঙ্গলমহল!



