আন্তর্জাতিক

সোমারটন ম্যান: ৭০ বছর পর উন্মোচিত হলো যে মৃত্যুর রহস্য

১৯৪৮ সালে অস্ট্রেলিয়ান সমুদ্র সৈকতে এক সুসজ্জিত ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। একটি অর্ধ-ধূমায়িত সিগারেট তার জামার কলারে রাখা ছিল এবং তার পকেটে ছিল একটি ফার্সি কবিতার লাইন।

কিন্তু তদন্তকারীরা জানতেন না তিনি কে। এযাবতকালে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে পারেনি দেশটির পুলিশ। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন রটেছিল তখন। এসবের মধ্যে একটি ছিল, ওই ব্যক্তি সোমারটন ম্যান নামে পরিচিত। তিনি একজন গুপ্তচর ছিলেন। কিন্তু ৭০ বছরেরও বেশি সময় পরে, একজন গবেষক জানিয়েছেন, তিনি ওই রহস্যের সমাধান করেছেন। সোমারটন ম্যানের আসল নাম কার্ল ওয়েব। তিনি কখনোই একজন রাশিয়ান এজেন্ট নন, বরং মেলবোর্নে জন্মগ্রহণকারী প্রকৌশলী ছিলেন। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া পুলিশ এই বিষয়টি এখনও নিশ্চিত করেনি। তবে জানিয়েছে, তারা শিগগির এই ব্যাপারে মন্তব্য করবে।

বিস্ময়কর রহস্য
বুধবার (২৭ জুলাই) বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৯৪৮ সালের পহেলা ডিসেম্বর তারিখে অ্যাডিলেডের সোমারটন সৈকতে একটি সিওয়ালের পাশে লাশটি পড়ে থাকতে দেখেন পর্যটকরা। লোকটি একটি স্যুট-টাই পরিহিত ছিলেন এবং তার বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে অনুমান করা হয়েছিল। তার পকেটে বাস ও ট্রেনের টিকিট, চুইংগাম, কিছু ম্যাচ, দুটি চিরুনি এবং এক প্যাকেট সিগারেট পায় পুলিশ। তবে কোনো মানিব্যাগ, নগদ টাকা এবং পরিচয়পত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার স্যুটের ট্যাগগুলো কেটে ফেলা হয়েছিল এবং ফরেনসিক পরীক্ষকরা সন্দেহ করেছিলেন তাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে।

অন্যান্য আরও কয়েকটি নমুনা, যেমন- লেবেল মুছে ফেলা পোশা, অসংলগ্ন লেখাকে একটি কোড বলে মনে করা হয়। তিনি ফারসি শব্দ তামাম শুদসহ একটি ছেঁড়া কাগজও বহন করেছিলেন যার অর্থ ‘এটি শেষ’। সে সময় সোমারটন ম্যান-এর আঙুলের ছাপ সারা বিশ্বে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কেউ তাকে শনাক্ত করতে পারেনি। পরে তাকে ১৯৪৯ সালে অ্যাডিলেড কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হয়। তার সমাধিতে লিখা ছিল, ‘এখানে সেই অজানা লোকটি রয়েছে যাকে সোমারটন উপকূলে পাওয়া গিয়েছিল।’ সোমারটন ম্যান নামকরণের পেছনে ওই সমাধিকেই দায়ী করেন অনেকে।

অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ওই ব্যক্তির পরিচয় জানার জন্য অভিযানে নামেন। কর্তৃপক্ষ যখন তার মুখের প্লাস্টার মডেল তৈরি করে তখন অধ্যাপক ডেরেক অ্যাবট সংরক্ষিত চুল ব্যবহার করে সোমারটন ম্যান এর ডিএনএ বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। ডিএনএ ব্যবহার করে একটি বর্ধিত ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করতে তিনি। এরপর বিখ্যাত মার্কিন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ কলিন ফিটজপ্যাট্রিকের শরণাপন্ন হন। মোট ৪ হাজার নাম থেকে একটি নামের খোঁজ পান তারা। ওই লোকটির জীবিত আত্মীয়দের সন্ধানের পর তাদের ডিএনএ ব্যবহার করে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। নিজের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে অধ্যাপক অ্যাবট বলেন, ‘এটি এভারেস্ট পর্বতে আরোহণের মতো অনুভূতি, আপনি শীর্ষে আছেন এমন উচ্ছ্বাসের মিশ্রণ, তবে ক্লান্তি এবং অবসাদও রয়েছে।’

তাহলে কার্ল ওয়েব কে?
অধ্যাপক অ্যাবটের মতে, মেলবোর্নের একটি শহরতলিতে ১৯০৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এই কার্ল ওয়েব। তিনি ছয় ভাইবোনের মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন। ডরোথি রবার্টসন নামক এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন ওয়েব। যিনি ডফ ওয়েব নামে পরিচিত। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, বৈবাহিক কারণেই তিনি অ্যাডিলেডে ঘুরতে যান। অধ্যাপক অ্যাবট এবিসিকে বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রমাণ আছে যে তিনি তার স্ত্রীর থেকে আলাদা হয়েছিলেন এবং তিনি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় চলে গিয়েছিলেন। তাই সম্ভবত, তিনি তাকে খুঁজতে গিয়েছিলেন।’ গবেষক ফিটজপ্যাট্রিক এখন তার মৃত্যুর রহস্য সমাধানে সাহায্য করতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি বিষবিদ্যা সম্পন্ন দেখতে চাই এবং আমি ডরোথির কী হয়েছিল তা জানতে চাই।’

তথ্যসূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন ::

Back to top button