জানা-অজানা

যে ১০ উপায়ে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই অনলাইনে অর্থ উপার্জন করবেন

আপনি যদি আপনার আগ্রহ থেকে অনলাইনে অর্থ উপার্জন করতে চান, দ্রুত ঋণ পরিশোধের জন্য আরেকটি আয়ের উৎস বের করতে আগ্রহী হন বা ঘরে থেকেই জীবিকা নির্বাহ করতে চান, তাহলে আপনার জন্য শত শত বৈধ উপায় রয়েছে। তবে এজন্য আপনাকে ১০টি প্রয়োজনীয় সূত্র মেনে চলতে হবে। এসব নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

আপনি যদি অনলাইন ব্যবসার কয়েকটি মৌলিক নিয়ম অনুসরণ না করেন- তাহলে আপনার সব অর্জন একবারে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এন্টারপ্রিনিয়র ডট কমে এ নিয়ে লিখেছেন ডেনা রিচি। চলুন জেনে নেয়া যাক ডেনা রিচির ১০ নিয়মের বিস্তারিত।

অনলাইনে আয় মানেই ব্যবসা
কয়েক মাস আগে আমি আমার ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এজন্য আমি ইবের মতো ইকমার্স সাইটগুলোতে এসব তালিকাভুক্ত করি। এতে আমার কোনো কষ্টই হয়নি এবং অতিরিক্ত কিছু নগদ অর্থও উপার্জন করতে পেরেছিলাম। আমাকে কেবল পণ্যের ছবি তুলতে হয়েছিল এবং স্পষ্ট বিবরণ লিখে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ করতে হয়েছিল। এরপর আমাকে পণ্যগুলো সঠিকভাবে বক্স করে পোস্ট অফিসে যেতে হয়েছিল। অবশেষে আমি এই কাজের জন্য একটি অতিরিক্ত রুম ঠিক করেছি। এটি আমাকে অনলাইনে অর্থ উপার্জনের প্রথম নিয়মটি শিখিয়েছিল। অনলাইনে হচ্ছে একটা ব্যবসা। সহজভাবে বলতে গেলে, ওয়েবসাইটগুলো আসলে কোনও অর্থ নিয়ে আসে না। বরং ব্যবসায়ীরাই ওয়েবসাইট থেকে অর্থ আদায় করে নেয়।

আপনার গ্রাহকদের সম্পর্কে জানুন
অনলাইনে অর্থ উপার্জনে ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে গ্রাহক তৈরি করতে না পারা এবং গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে ব্যর্থ হওয়া। পিটার ড্রাকারের মতে, ব্যবসার উদ্দেশ্য হচ্ছে একদল গ্রাহক তৈরি করা। ব্যবসা কেবল তখনই চালু থাকে যখন গ্রাহক থাকে। অনলাইনে অর্থ আয়ের সম্ভাবনা খুবই কম যদি আপনার কোনও ব্যবসা না থাকে। তাই, যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে আপনি কার কাছে পণ্য বিক্রি করবেন, তবে আপনি এমন গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে পারেন যারা সত্যিই আপনার ব্যবসায়ে আগ্রহী নন। সুতরাং, আপনি কীভাবে আপনার আদর্শ গ্রাহক নির্ধারণ করতে পারেন? এজন্য কিছু টিপস রয়েছে যা আপনাকে সাহায্য করবে-

  • আপনি যখন আপনার পণ্য বা সেবাটির মার্কেটিং করছেন তখন নিজেকে গ্রাহকের জায়গায় কল্পনা করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনার পণ্য বা সেবা কীভাবে আপনার গ্রাহকদের জীবনকে উন্নত করবে?
  • আপনি যা বিক্রি করেন তার জন্য আদর্শ গ্রাহকদের সংজ্ঞায়িত করুন। উদাহরণস্বরূপ, তাদের কি একটি নির্দিষ্ট বয়স, শিক্ষা, পেশা বা ব্যবসা আছে? তাদের আয় বা আর্থিক অবস্থা কী? তারা কি একটি নির্দিষ্ট স্থানে বাস করে বা কাজ করে?
  • আপনার গ্রাহক আপনার পণ্য বা সেবা থেকে বিশেষ কী কী সুবিধা চায় তা সন্ধান করুন। আপনার আদর্শ গ্রাহক আপনার সমস্ত পণ্য বা সেবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান বলে মনে করে এমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাটি কী? তাদের লক্ষ্য বা আশংকা কী?
  • তারা কোথায় ঘুরে বেড়ায় তা জানুন। তারা কোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার করে? তারা কোন কোন অনলাইন গ্রুপের সাথে জড়িত? তারা অনলাইনে কী দেখছে এবং পড়ছে?
  • আপনার আদর্শ গ্রাহক কখন এবং কেন আপনার পণ্য বা সেবাটি কিনবেন তা সঠিকভাবে স্থাপন করুন। এই পণ্য তার জীবনে বা কর্মক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আনতে পারে? আপনার গ্রাহক কি নির্দিষ্ট ঋতু, মাস বা সপ্তাহের মধ্যে ক্রয় করেন?

আপনার বিশেষ পণ্য বা সেবাটির ধরন (নিশ) নির্ধারণ করুন


বাজারে সব ধরনের পণ্য বা সেবা আছে। কিন্তু সব পণ্যের বাজার নেই অর্থাৎ, সব পণ্যের মুনাফা বা বিক্রি এক রকম না। আপনি এমন পণ্য নিয়ে আসলেন যা সারাবছর বাজার থেকে এক পয়সাও আয় করতে পারবে না। আবার বাজারে কাটতি হয় এমন ধরনের পণ্য বিক্রি করে সম্পদের পাহাড়ও গড়ে ফেলতে পারেন। একটি বিশেষ পণ্য নির্ধারণ করার আগে নিজেকে নিম্নলিখিত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুন-

  • আপনি কি আপনার সম্ভাব্য বিশেষ পণ্য নিয়ে কোনও গবেষণা করেছেন?
  • মানুষ ইতিমধ্যে এই টাইপের পণ্য এবং সেবাগুলোতে কত টাকা ব্যয় করে?
  • আপনি কীভাবে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে উপস্থাপন করতে পারেন? এটি আপনার নিজস্ব ক্ষমতা এবং শক্তির সাথে কতটা মেলে?
  • আপনি যদি গ্রাহকদের প্রয়োজনগুলো পূরণ করেন তবে কি মানুষ আপনাকে অর্থ প্রদান করবে?

আপনি সম্ভবত আপনার ব্লগ বা সাইট শুরু করার জন্য আকর্ষণীয় বা অনুপ্রেরণামূলক একটি ডোমেইন বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আপনি যদি বাজারের ট্রেন্ড অর্থাৎ জনপ্রিয় নিশ বা ধরন না বুঝেন তাহলে সেটি অনেক গ্রাহক হারাবে। অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নাট পার্কার যেমন বলেছিলেন, ‘আপনার নিশ খুঁজে করুন এবং এর উপর আধিপত্য বিস্তার করুন। যখন আমি বলি আধিপত্য বিস্তার করুন, তখন আমি বোঝাচ্ছি আপনি অন্য সবার চেয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে থাকুন।

মোনাটাইজেশনে (বিজ্ঞাপনে) সাবধানী হন


যদি আপনি ডিজিটাল মার্কেটিং লাইনে থাকেন তাহল মোনাটাইজেশনের সাথে অবশ্যই পরিচিত। যে কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে অর্থ আয়ের প্রক্রিয়াকে মোনাটাইজেশন বলে। এর মানে হচ্ছে, ওয়েবসাইট থেকে পণ্য বিক্রি করে অর্থ আয় ছাড়াও নিজস্ব ট্রাফিক বা ভিজিটর থেকেও আয় করা যায়। আপনার ওয়েবসাইট বা অ্যাপ পণ্য বাজারজাত করার জন্য আদর্শ জায়গা। তবে আয়ের আরও অসংখ্য উপায় রয়েছে। মনে রাখবেন, প্রথমেই পণ্য বিক্রির জন্য আপনার কোনও ওয়েবসাইট থাকা আবশ্যক নয়। শুরুতে ইমেইল মার্কেটিং ও অন্যান্য উপায়ে আপনি পণ্য বিক্রি করতে পারেন। আর ওয়েবসাইটের মোনাটাইজেশনের ক্ষেত্রেও আপনাকে আপনার গ্রাহকদের চাহিদা ও মনোভাব বুঝতে হবে। অবশ্যই নৈতিক ও জনপ্রিয় উপায়গুলো ব্যবহার করবেন। গুগল অ্যাডসেন্স, কোডফুয়েল বা শপিফাই-এর মতো বৈধ প্লাটফর্মগুলো ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন বা মোনাটাইজেশনে ব্যবহার করুন।

দ্রুত আয়ের পদ্ধতিগুলোর পেছনে ছুটবেন না


অনলাইনে একটি ফাঁদ হচ্ছে দ্রুত টাকা আয়ের কৌশল সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন। এসবের পেছনে কখনও ছুটবেন না। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৯ শতাংশ অনলাইন জুয়াড়ি অনলাইনে অর্থ হারান। কিন্তু ইউটিউব-ফেসবুকে আপনি চটকদার বিজ্ঞাপন দেখেছেন যেখানে গ্যারান্টি দেয়া হয় ইনভেস্ট করলেই পাবেন কোটি কোটি। আসলে এগুলো আপনাকে মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) স্কিম বা এমন আরও অনেক ধাপ্পাবাজিতে আপনার অর্থ খসানোর চেষ্টা করছে। তাই রাতারাতি ধনী হওয়ার পরিকল্পনা ছাড়ুন। নিজেকে সমৃদ্ধ করুন এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ইতিবাচক কাজের চেষ্টা করুন। আস্তে আস্তে আপনার জীবনে অর্থ আসতে থাকবে। কয়েক বছরও না হলেও কয়েক মাস সময় তো লাগবেই। আপনি শুধু কাজের সাথে লেগে থাকুন এবং আপনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করুন।

সময় মানে টাকা


এটা সত্য অনলাইনে অর্থ উপার্জনের সব প্রচেষ্টা সমান নয়। উদাহরণস্বরূপ, অনলাইন জরিপের কোন অভাব নেই। যদিও এসবের মধ্যেও অনেক প্রতারক রয়েছে। কিন্তু আপনার সময় তো অনেক মূল্যবান। আপনি যদি কেবল পাঁচ ডলার উপার্জন করার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করেন তাহলে সেটি আপনার অনলাইন ক্যারিয়ারে খুব একটা লাভজনক হবে না। এর পরিবর্তে কোন একটা বিষয়ে আপনি দক্ষতা অর্জন করতে পারেন যা আপনার অনলাইন আয়ের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হবে। এমএলএম বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই কথা। এমএলএম-এর এই পিরামিড স্কিমে কেবল শীর্ষে বসে থাকা ব্যক্তিই সমস্ত নগদ অর্থ উপার্জন করে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বা মাঝখানের ব্যক্তিরা বেশিরভাগই প্রতারণার শিকার হন। প্রকৃতপক্ষে, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম তর্কসাপেক্ষে অর্থ উপার্জনের সবচেয়ে খারাপ উপায়গুলোর মধ্যে একটি।

ক্লিকবাজি থেকে দূরে থাকুন


ক্লিক করেই আয় করুন কোটি কোটি টাকা। অনলাইনে এ ধরনের অনেক সাইট দেখা যায়। এসব থেকে দূরে থাকুন। এছাড়া বিভিন্ন চটকদার কথার বিজ্ঞাপনে ক্লিক করেও প্রতারিত হয় মানুষ। নিজের ওয়েবসাইট বা অ্যাপে মানুষকে আকৃষ্ট করতে এ ধরনের প্রচারণা চালিয়ে আপনি হয়তো অনেক ট্রাফিক নিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু যখন তারা দেখবে আপনার বিজ্ঞাপনের সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই তখন তারা আপনার সাইটে আর প্রবেশ করবে না। যা আপনার খ্যাতি এবং সম্মানহানীর কারণও হবে।

এসইও জানা অপরিহার্য


অনলাইনে আর্থিকভাবে সফল হওয়ার জন্য সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা এসইও জানা ও দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন। আপনার ব্লগ, অনলাইন দোকান, ইউটিউব ভিডিও, ই-বুক, বা আপনার অনলাইন কোর্সগুলো বাজারে ছড়িয়ে দিতে এসইও জানা অপরিহার্য। এর জন্য আপনাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বিশেষ করে ফেসবুকের সাথে সাথে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের খুঁটিনাটি জানতে হবে। আপনার ওয়েবসাইটের ব্যাক-এন্ড এবং ফ্রন্ট-এন্ডের উন্নতি, সাইটে ট্র্যাফিক আনা এবং সার্চ ইঞ্জিনের প্রথম পেজে ওয়েবসাইটকে র‍্যাংকিং করা এ সবই এসইওর কাজ। এছাড়া কি-ওয়ার্ড এনালাইসিস, ব্যাকলিংক বিল্ডিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন আপনার ওয়েবসাইটকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

নিজেকে বাঁচান


বেটার বিজনেস ব্যুরোর মতে, অনলাইন ব্যবসায় জাল চেক বা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের কেলেঙ্কারী প্রায়ই ঘটে থাকে। কাজ করিয়ে অর্থ না দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। এ ধরনের স্ক্যাম থেকে বাঁচতে সচেতনতার পাশাপাশি আপনার অনলাইন ব্যবসাকেও আইনত সুরক্ষিত রাখতে হবে। যেমন, আপনার ব্যবসার মালিকানা নিজের নামে নিন, ডোমেইনের নাম সুরক্ষিত রাখুন। সমস্ত অনলাইন ক্রিয়াকলাপ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর উপর নজর রাখুন। ব্যবসায়িক বীমায় বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করুন। আপনি যদি অন্য কোনো ব্যবসায় যোগ দিতে চান বা কাউকে আপনার ব্যবসায় অংশীদার করতে চান তাহলে কাগজের দলিলে তা লিপিবদ্ধ করুন। আপনার ওয়েবসাইটে যদি গ্রাহকের তথ্য যেমন, ফোন নাম্বার, ইমেইল ইত্যাদি সংগ্রহ করা হয় তাহলে তাদের স্বীকৃতি নেয়া জরুরি। এছাড়া গোপনীয়তার নীতিমালা জানানো এবং স্থানীয় সরকারের শর্তগুলো মানা ও আইনি নথি থাকাও অপরিহার্য।

আপনার যা যা প্রয়োজন


উপার্জনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আর্থিক সংস্থান, সময় এবং দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। একইভাবে, অনলাইনে অর্থ আয়ের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দক্ষতা এবং প্রচুর সময় ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনার জন্য কিছু অর্থের প্রয়োজন হবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি একটি ব্লগ চালু করার জন্য আপনাকে একটি ডোমেন এবং হোস্টিং কিনতে হবে। আপনি যদি ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার হন তবে আপনার প্রয়োজনীয় ডিভাইস এবং ফটোশপের মতো সফটওয়্যারের প্রয়োজন হবে। নতুনরা প্রায়ই অনলাইনে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রয়োজনীয় মূলধন, দক্ষতা বা সম্পদের অভাবে তারা ব্যর্থ হয়।

সূত্র: এন্টারপ্রিনিয়র ডট কম

আরও পড়ুন ::

Back to top button