হৃদযন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন কি বড় কোনো বিপদের পূর্বাভাস? জানুন চিকিৎসকের মতামত
ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

বুক ধড়ফড় করা বা হঠাৎ মাথা ঘোরাকে আমরা অনেকেই সাধারণ দুর্বলতা মনে করে এড়িয়ে যাই। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, অবহেলার এই অভ্যাস ডেকে আনতে পারে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো বড় বিপদ! আপনি কি ‘অ্যারিদমিয়া’র শিকার? কীভাবে বুঝবেন আপনার হৃদযন্ত্র ঠিকমতো কাজ করছে কি না? বিস্তারিত জানালেন বিশিষ্ট জেনারেল মেডিসিন চিকিৎসক চন্দ্রমৌলী মুখোপাধ্যায়।
কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া (Cardiac Arrhythmia) আসলে কী?
আমরা যেমন স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি নিয়ে আলাদা করে ভাবি না, ঠিক তেমনই হৃদস্পন্দনের ওঠানামাও প্রায়ই আমাদের অলক্ষ্যে থেকে যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, হৃৎস্পন্দনের এই অনিয়মিত গতিকে বলা হয় ‘অ্যারিদমিয়া’। এটি এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে হৃদযন্ত্র—
খুব দ্রুত স্পন্দিত হতে থাকে,
অত্যন্ত ধীরগতিতে চলে, অথবা
অনিয়মিত বা ছন্দহীনভাবে রক্ত পাম্প করে।
ঝুঁকির কারণ: সব অ্যারিদমিয়া বিপজ্জনক না হলেও, হৃৎযন্ত্রের সংকোচন-প্রসারণ ঠিকমতো না হলে সারা শরীরে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
আরও পড়ুন :: লিভারের বারোটা বাজাচ্ছে আপনার প্রিয় এই ৫ খাবার! আজই না ছাড়লে বড় বিপদ
পাল্স রেট ও অ্যারিদমিয়ার প্রকারভেদ
সাধারণত কোনো ব্যক্তির বিশ্রামরত অবস্থায় নাড়ির গতি বা পাল্স রেটের (Pulse Rate) ওপর ভিত্তি করে অ্যারিদমিয়াকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
ট্যাকিকার্ডিয়া (Tachycardia): বিশ্রামরত অবস্থায় হৃদস্পন্দনের হার যদি প্রতি মিনিটে ১০০ বারের বেশি হয়।
ব্র্যাডিকার্ডিয়া (Bradycardia): বিশ্রামের সময়ে হৃদস্পন্দনের হার যদি প্রতি মিনিটে ৬০ বারের কম হয়।
চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: পাল্স রেট কিছুটা কম বা বেশি হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। যেমন—দৌড়াদৌড়ি বা পরিশ্রমের পর সাময়িকভাবে পাল্স ১০০ পার হতে পারে। আবার কোনো অ্যাথলিট বা খেলোয়াড়দের বিশ্রামরত অবস্থাতেও পাল্স স্বাভাবিকভাবেই ৬০-এর কম থাকে। তাই কেবল সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে, অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
অ্যারিদমিয়ার ৫টি নীরব লক্ষণ: যেগুলো অবহেলা করা ভুল হবে
আপনার অজান্তেই হৃদযন্ত্রের ছন্দপতন ঘটছে কি না, তা বুঝতে নিচের লক্ষণগুলোর প্রতি নজর রাখুন:
বুক ধড়ফড় করা (Palpitations): এটি অ্যারিদমিয়ার সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গ। মনে হতে পারে বুকের ভিতরটা কাঁপছে বা হুট করে হৃদস্পন্দনের মাঝে একটি ‘ফাঁক’ (Drop) থেকে যাচ্ছে।
মাথা ঘোরা বা হঠাৎ জ্ঞান হারানো: হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হলে মস্তিষ্কে ও শরীরের অন্যান্য অংশে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হয়। ফলে ভারসাম্য হারানো বা হুট করে মূর্ছা যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট: অল্প একটু হাঁটলে বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় অতিরিক্ত হাঁপিয়ে যাওয়া হৃদযন্ত্রের জটিলতার বড় ইঙ্গিত।
ক্রমাগত ক্লান্তি ও দুর্বলতা: রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও যদি দিনভর শরীরে কোনো শক্তি না পান, তবে তা হৃদযন্ত্রের অতিরিক্ত চাপের ফল হতে পারে।
বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি: বুকের মধ্যে চাপ ধরা ভাব বা ব্যথার সঙ্গে যদি অতিরিক্ত ঘাম ও মাথা ঘোরা থাকে, তবে তা তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসার দাবি রাখে।
আরও পড়ুন :: চেহারায় বয়সের ছাপ লুকাতে চান? ভরসা রাখুন এই ৪ খাবারে
সঠিক রোগ নির্ণয়ে কোন কোন পরীক্ষা জরুরি?
ঘরে বসে পালস অক্সিমিটার (Pulse Oximeter) বা হাত দিয়ে নাড়ির গতি মেপে স্পন্দনের সংখ্যা জানা গেলেও, হৃদযন্ত্রের ছন্দ ঠিক আছে কি না তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. চন্দ্রমৌলী মুখোপাধ্যায়ের মতে, সমস্যা সঠিকভাবে শনাক্ত করতে নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করানো অত্যন্ত জরুরি:
ইসিজি (ECG)
ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Echocardiography)
হল্টার মনিটরিং (Holter Monitoring)
থাইরয়েডের রক্তপরীক্ষা (Thyroid Profile)
শেষ কথা
বুকের সামান্য অস্বস্তি বা অনিয়মিত পাল্স রেটকে ‘গ্যাসের সমস্যা’ বা ‘সাময়িক দুর্বলতা’ ভেবে উড়িয়ে দেবেন না। শরীরের এসব ছোট ছোট বার্তা সময়মতো বুঝতে পারলে এড়ানো সম্ভব বড় কোনো প্রাণঘাতী বিপদ। লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং সুস্থ থাকুন।



