সংগীত

প্রয়াত বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীতগুরু অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়: শতবর্ষ ছোঁয়ার পরেই সুরের আকাশে চিরনক্ষত্র

ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

প্রয়াত বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীতগুরু অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়: শতবর্ষ ছোঁয়ার পরেই সুরের আকাশে চিরনক্ষত্র - West Bengal News 24

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবীণতম ধ্বজাধারী, বিশিষ্ট শিক্ষক ও গবেষক পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় আর নেই। বুধবার দুপুর ২:৩০ মিনিটে দক্ষিণ কলকাতার বাসভবন ও পরবর্তীতে এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবনের দীর্ঘ সফর শেষ করেন এই শতায়ু সঙ্গীতসাধক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর (কয়েক মাস আগেই স্পর্শ করেছিলেন শতবর্ষ উদযাপন)। তাঁর প্রয়াণে এক বর্ণময় যুগের অবসান ঘটল।

পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ৮ জুলাই কোমরের অস্থিভঙ্গের কারণে প্রবীণ শিল্পী অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতার এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালের উডবার্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। প্রথম দিকে চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছিলেন এবং পাঁচ দিন আগে তাঁকে দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে পুনরায় এসএসকেএম-এ স্থানান্তরিত করে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে রাখা হয়।

শিল্পীর পুত্র শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, পরিবার আশাবাদী ছিল যে তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন এবং ফের মঞ্চে ফিরবেন। কিন্তু বুধবার দুপুরে এক ‘ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’-এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন পণ্ডিতজি।

আরও পড়ুন :: কয়লাকাণ্ডে মনমোহনকে ‘ক্লিনচিট’ সুপ্রিম কোর্টের! ইতিহাস কি সত্যিই সদয় হলো প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর প্রতি?

১৯২৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া এই মহীরূহ শেষ বয়স পর্যন্ত সুরের সঙ্গ ছাড়েননি। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তিনি নিয়মিত শিষ্য-শিষ্যাদের তালিম দিয়েছেন এবং সঙ্গীতচর্চা চালিয়ে গিয়েছেন। বিশেষত শতবর্ষ ছোঁয়ার দিনে মঞ্চে বসে একটানা ৪০ মিনিট ধরে ‘রাগ বেহাগ’ পরিবেশন করে উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীকে মুগ্ধ করেছিলেন। বয়সকে জয় করে তাঁর এই গায়নশৈলী ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গীত জীবনের গোড়ার দিকটি গড়ে উঠেছিল পিতা সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। পাঁচ বছর বয়সে সেতার শেখা দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তীতে কণ্ঠসঙ্গীতেই নিজেকে সঁপে দেন। বিষ্ণুপুর ঘরানার ঐতিহ্য তাঁর রক্তে থাকলেও চিন্তাভাবনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক ও প্রগতিশীল।

“পরিবর্তনকে যদি আমি গ্রহণ না করি, তা হলে আমাকে কেউ নেবে না— এই আমার ধারণা ছিল। যে কারণে আমি আমার ঘর থেকে সরে এসেছি।” — আনন্দবাজার ডট কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।

তিনি ছুতমার্গ বা অন্ধ গোঁড়ামিকে কখনও প্রশ্রয় দেননি। প্রখ্যাত শিল্পী তারাপদ চক্রবর্তী এবং ওস্তাদ আমির খানের গায়কি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর গায়নিতে একদিকে যেমন ছিল তারাপদবাবুর মীড়প্রধান কাজ, তেমনই ছিল ওস্তাদ আমির খানের ধাঁচের সাপাট তান এবং নারায়ণ রাও ব্যাসের অনুকরণ।

বিষ্ণুপুর ঘরানায় মূলত ধ্রুপদ অঙ্গের চর্চা বেশি হতো, যেখানে খটকা বা হরকতের ব্যবহার ছিল সীমিত। কিন্তু পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বিভিন্ন গুণী শিল্পীদের শুনে নিজের গায়কিতে প্রচুর অলঙ্কার আমদানি করেছিলেন।

সঙ্গীতশিল্পী শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অমিয়রঞ্জনের গায়নিতে গ্বালিয়র, কিরানা এবং আগ্রা ঘরানার সুষ্পষ্ট ছাপ ছিল। রামকেলি কিংবা জয়জয়ন্তীর মতো রাগে ওস্তাদ ফৈয়াজ় খানের শৈলীকে তিনি নিজের ঢঙে মিশিয়ে নিয়েছিলেন। এই সবের সংমিশ্রণেই গড়ে উঠেছিল তাঁর নিজস্ব ও অনন্য গায়নশৈলী।

কেবল কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই নয়, সঙ্গীতের নন্দনতত্ত্ব (Aesthetics of Music) নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি অর্জন করেছিলেন অমিয়রঞ্জন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের অধ্যাপনা জীবনে তিনি গড়ে তুলেছিলেন অজস্র যোগ্য শিষ্য-শিষ্যা।

সঙ্গীতশিল্পী শুভাশিস মুখোপাধ্যায় তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলিতে সুন্দরভাবে উল্লেখ করেন: “তাঁর গান থেকে তো বটেই, জীবনযাপন থেকেও অনেককিছু শেখার মতো ছিল। প্রকৃতপক্ষে তাঁর জীবনটাই ছিল সুশৃঙ্খল গানের মতো। যেমন আলাপ থেকে বিলম্বিত হয়ে মধ্যলয়, সেখান থেকে দ্রুতলয়ে পৌঁছে সুচারু ভাবে সম্পন্ন হয় খেয়াল গান— অমিয়রঞ্জনের জীবনও তেমনই নিয়মানুবর্তী, সংযমশাসিত। কোনওদিন তাঁকে সমের বাইরে পা ফেলতে দেখিনি।”

Key Takeaways / এক নজরে পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

বিষয়তথ্য
জন্ম তারিখ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৭
সঙ্গীত ঘরানাবিষ্ণুপুর ঘরানা (স্বতন্ত্র মিশ্রণসহ)
প্রথম গুরুপিতা সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
শিক্ষাগত যোগ্যতাসঙ্গীতের নন্দনতত্ত্বে পিএইচডি (PhD)
কর্মজীবনঅধ্যাপক, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন ::

Back to top button