সাহিত্য

কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ

সোমঋতা মল্লিক

kazi nazrul islam : কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ - West Bengal News 24

৩/৪-সি, তালতলা লেন- কলকাতায় এই বাড়িটিতে বসেই কাজী নজরুল ইসলাম সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি রচিত হয় ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে। মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথায়’ নিজেকে এই কবিতার প্রথম শ্রোতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কবিতাটি কোন সময়, কি-ভাবে রচিত হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ তিনি দিয়েছেন- “তখন নজরুল আর আমি নীচের তলার পূব-দিকের, অর্থাৎ বাড়ীর নীচেকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরটি নিয়ে থাকি। এই ঘরেই কাজী নজরুল ইসলাম তার বিদ্রোহী কবিতাটি লিখেছিল। সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রির কোন্ সময়ে তা আমি জানিনে। রাত দশটার পর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলেম।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি এমন সময় নজরুল বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে তখন আমায় পড়ে শোনালো। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা। কিন্তু নিজের সম্বন্ধে আমি কী যে বলব তা জানিনে। কোনো দিন কোনো বিষয়ে আমি উচ্ছ্বসিত হতে পারি না। যে-লোক প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য তার সামনা-সামনি তাকে প্রশংসা করাও আমাকে দিয়ে হয়ে ওঠে না। তার অগোচরে অবশ্য আমি তার প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠি। আমার এই স্বভাবের জন্য আমি পীড়া বোধ করি বটে, তবুও স্বভাব আমার কিছুতেই বদলায় না। নজরুল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাকেই প্রথম পড়ে শোনালো, অথচ আমার স্বভাবের দোষে না পারলাম তাকে আমি কোনো বাহবা দিতে, না পারলাম এতটুকুও উচ্ছ্বসিত হতে।

কী যে কথা আমি উচ্চারণ করেছিলাম তা এখন আমার মনেও পড়ছে না। আমার স্বভাবটা যদিও নজরুলের অজানা ছিল না, তবুও সে মনে মনে ব্যথিত যে হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। আমার মনে হয়, নজরুল ইসলাম শেষ রাত্রে ঘুম থেকে উঠে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে সে আমায় কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না। তার ঘুম সাধারণত দেরীতেই ভাঙত, আমার মত তাড়াতাড়ি তার ঘুম ভাঙত না। এখন থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে নজরুলের কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারে-বারে কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তার হাত তাল রাখতে পারবে না। এই ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেন্সিলে লিখেছিল। (কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ)

বিদ্রোহী কবিতাটি কেবল অসাধারণ জনপ্রিয়তা পায়নি, একই কবিতা একাধিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেছিল। শুধুমাত্র তৎকালীন সময়েই নয়, শতবর্ষে দাঁড়িয়েও এই কবিতা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং জনপ্রিয়। বহু গুণীজন এই কবিতা সম্পর্কে তাঁদের মতামত প্রকাশ করেছেন।

এখানে কয়েকটি তুলে ধরা হল:

১. এ কবিতায় হিন্দু-মুসলমান দুজনরেই এত পুরাণ প্রসঙ্গ ঢুকেছে যে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি একে রাজদ্রোহ বলে চিহ্নিত করতে পারল না। কখনো ঈশান-বিষানের ওঙ্কার বাজছে, কখনো বা ইস্রাফিলের শিঙ্গা থেকে উঠছে ঝঙ্কার। কখনো বা হাতে নিয়েছে মহাদেবের ডমরু-ত্রিশূল, কখনো বা আর্ফিয়াসের বাঁশি। কখনো বাসুকীর ফণা জাপটে ধরেছে। কখনো বা জিব্রাইলের আগুনের পাখা, কখনো চড়েছে তাজি বোররাক (পক্ষীরাজ ঘোড়া)-কে কখনো বা উচ্চৈঃ শ্রবায়। একে রাজদ্রোহ বলতে গেলে ধর্মের উপরে হাত দেওয়া হবে। – জৈষ্ঠ্যের ঝড়, অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত

২. এ কে নতুন কবি? নির্জীব দেশে এ কার বীর্যবাণী? শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, সমগ্র দেশ নাড়া দিয়ে জেগে উঠল। এমনটি কোনোদিন শুনিনি, ভাবতেও পারিনি। যেন সমস্ত অনুপাতের বাইরে, যেন সমস্ত অঙ্কপাতেরও অতিরিক্ত।…গদগদ বিহ্বলের দেশে এ কে এলো প্রচন্ড বজ্রনাদ হয়ে? আলস্যে আচ্ছন্ন দেশ আরামের বিছানা ছেড়ে হঠাৎ উদ্দন্ড মেরুদণ্ডে উঠে দাঁড়ালো।– জৈষ্ঠ্যের ঝড়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

৩. অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এমন ভাষায় আর কোন বাঙালী কবি চ্যালেঞ্জ জানাননি। সমাজের উৎপীড়নে এমন শপথ আর কারো মুখে তা শুনিনি। Must fight to the finish মন্ত্রে দীক্ষিত আর কোন বাঙালী কবি শত্রুপক্ষকে এমন আহ্বান জানাননি।– আমি যাঁদের দেখেছি, পরিমল গোস্বামী

৪. ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কবির প্রথম আত্মোপলব্ধিজাত কবিতা। এ কবিতা তাঁর মনে প্রবেশের প্রথম দরজা। কবি কোন্ বাণী নিয়ে নিজেকে প্রকাশ করলেন তার পরিচয় আছে এ কবিতায়।

তাঁকে এখন আর কোন বন্ধনে বাঁধতে পারবেনা, সকল প্রথা ও অত্যাচারের ঊর্ধ্বে তিনি, যোদ্ধা তিনি, বিরাট শক্তিধর তিনি, আত্ম উপলোব্ধি-আত্মসম্মানবোধে মহীয়ান তিনি-তাই তিনি সদা উন্নত শির ঋজু দন্ডী। তাই তিনি বলতে পারেন ‘আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্নিশ।’ আজ যাঁকে বেশী প্রয়োজন ছিল। – পরিমল গোস্বামী

৫. পূর্বের কিছু কিছু রচনায় রসিকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেই নজরুল ইসলাম সমস্ত সাহিত্য জগতের কাছে সচকিত স্বীকৃতি যেন সবলে আদায় করে নেন। – নজরুল স্মৃতি, প্রেমেন্দ্র মিত্র

৬. ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি একসঙ্গে ‘মোসলেম ভারত’ ও ‘বিজলী’-তে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই নজরুলের খ্যাতিতে বাঙালী সমাজ একেবারে টগবগ করে উঠলো। তরুণ সমাজ তো বিদ্রোহীর ভাষায় বাক্যালাপ শুরু করে দিলো। সকলের মধ্যে সেই মনোভাব — ‘আপনারে ছাড়া কাহারে করি না কুর্নিশ’। – পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়

৭. ‘বিদ্রোহী’ পড়লুম ছাপার অক্ষরে মাসিক পত্রে — মনে হলো, এমন কখনো পড়িনি। অসহযোগের অগ্নিপরীক্ষার পরে সমস্ত মন-প্রাণ যা কামনা করেছিলো, এ যেন তা-ই, দেশব্যাপী উদ্দীপনার এ-ই যেন বাণী। – নজরুল ইসলাম কালের পুতুল, বুদ্ধদেব বসু

৮. কৈশোরকালে আমিও জেনেছি রবীন্দ্রনাথের সম্মোহন, যা থেকে বেরোবার ইচ্ছেটাকেও অন্যায় মনে হত-যেন রাজদ্রোহের সামিল; আর সত্যেন্দ্রনাথের তন্দ্রাভরা নেশা, তার বেলোয়ারি আওয়াজের জাদু-তাও আমি জেনেছি। আর এই নিয়েই বছরের পর বছর কেটে গেল বাংলা কবিতার; আর অন্য কিছু চাইলোনা কেউ, অন্য কিছু সম্ভব বলেও ভাবতে পারলনা-যতদিন না বিদ্রোহী কবিতার নিশান উড়িয়ে হৈ-হৈ করে নজরুল ইসলাম এসে পৌঁছলেন। সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙলো।– রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর সাধক: সাহিত্যচর্চা, বুদ্ধদেব বসু

৯. একটি কবিতার দ্বারা যে কবিরা বিখ্যাত ও চিহ্নিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, অভিনন্দন লাভ করেছিল এবং বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল, অন্য কোন কবির ক্ষেত্রে তেমন দেখা যায়নি। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বাংলা যুবমানসকে অনুপ্রাণিত করেছিল, বিপ্লবীদের কণ্ঠে ভাষা দিয়েছিল এবং রাজনৈতিক, সামাজিক চেতনা জাগ্রত করেছিল। – বিদ্রোহীর আত্মপ্রকাশ, কল্পতরু সেনগুপ্ত

১০. নজরুলকে প্রথম আবিষ্কার করি খুব সম্ভবত ১৩৩৬ সালে-…বয়সে নিতান্ত নাবালক হলেও তখনকার বিপ্লব আন্দোলনের আশেপাশে তার ছায়ায় তখন ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছি- অপরিণত বালক মনে রূপকথার মতো স্বপ্নে ঘনিয়ে আসছে রিভলভার আর ফাঁসির দড়ি। ঠিক এমনি সময়ে সে যুগের দাদারা পড়তে দিলেন ‘অগ্নিবীণা’। বয়সের অনুপাতে একটু বেশিরকমের পরিপক্ক হয়েছিলাম অন্তত কবিতা পড়বার ব্যপারে। অর্থবোধের বালাই বোধহয় ছিলনা, কথার ঝঙ্কারই ঢেউয়ের মতো দুলিয়ে দিত মনকে।…কবিতার রোমান্স তখন মৃত্যুর রোমান্সে পরিণত হয়েছে।…আর ঠিক সেই সময়টিতেই এলো ‘অগ্নিবীণা’। শুধু চমক লাগলো না, স্তম্ভিত করে দিল। বাস্তব জীবনে যে রিভলভারের স্বপ্ন দেখেছিলাম, কবিতাতেও তার অগ্নিগর্জন প্রত্যাশা করিনি।

যেটুকু বাকি ছিল তাকে সম্পূর্ণ করে দিল যখন পড়লাম;

মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত

আমি সেইদিন হব শান্ত

যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,

অত্যাচারীর খড়গ-কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-

যে কবিতা পড়ি আর জীবনের যে পথ দিয়ে চলছি-তার মধ্যে যেন সাদৃশ্য ছিলনা, একটা ফাঁক আর ফাঁকি যেন অনুভব করছিলাম। চিন্তায় আর জীবনে অথবা আরও স্পষ্ট ভাষায় রুচি আর গতিপথের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য খুঁজে ফিরছি তখন। হয়তো খানিকটা অবচেতনভাবেই তখন এমন কবিতার সন্ধান করছি যা মনকে ভোলাবেনা, মনকে জ্বালাবে। নজরুলের কবিতা সেই ফাঁক পূরণ করে দিল।– সাহিত্য ও সাহিত্যিক, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

১১. আবেগের আগুনেভরা কবিতা – সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর

১২. এর মর্মকথা হচ্ছে এক অপূর্ব উন্মাদনা-এক অভূতপূর্ব আত্মবোধ-সেই আত্মবোধের প্রচন্ডতায় কবি উচ্চকিত-প্রায় দিশাহারা।– কাজী আবদুল ওদুদ

১৩. ঊনচল্লিশ বছর আগেকার একটা ঘটনা উজ্জ্বলতর রূপে আজ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ১৯২১। ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল একটি কবিতা – ‘বিদ্রোহী’। কবিতাটি অভিনব-ভাবে, ভাষায়, ছন্দে। মাতৃমুক্তি-সংগ্রামের অগ্রনায়ক বাংলা নতুন মন্ত্র পেল, নতুন আলো জ্বলে উঠলো তার যাত্রাপথে। কাজী নজরুল ইসলাম-বাংলার কাব্যলোকে সহসা দীপ্ত অভ্যুদয়-কে এই অজ্ঞাত পরিচয় কবি? দেশ বিস্মিত। দেখতে দেখতে কয়েকখানা পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হল ‘বিদ্রোহী’, বাঙালীর কন্ঠে-কন্ঠে ধ্বনিত হতে লাগলো ‘শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির’, মর্মে-মর্মে আসন পাতা হয়ে গেল কবির-উত্তম পুরুষে রচিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার স্রষ্টা বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের। ওই একটি মাত্র কবিতায় অসামান্য প্রতিষ্ঠা লাভ করলেন তেইশ বছরের তরুণ কাজী নজরুল ইসলাম।– নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী, নজরুলের বিদ্রোহী, শ্যামাপদ চক্রবর্তী

kazi nazrul islam : কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ - West Bengal News 24
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

১৪. নজরুলের সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কবিতা ‘বিদ্রোহী’ ১৯২১ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে রচিত এবং বিজলী পত্রিকায় ২২শে পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ৬ই জানুয়ারি ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত এবং ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে সংকলিত।

‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ষান্মাত্রিক মাত্রাবৃত্ত মুক্তক ছন্দে রচিত, এ কবিতায় মাত্রাবৃত্ত মুক্তক ছন্দ সমিল কিন্তু ছন্দের বৈশিষ্ট্য-আনা হয়েছে মাত্রাবৃত্তে প্রবহমানতা সঞ্চার করে। পর্ব বিভাগ ছয় মাত্রার চালে কিন্তু চরণের শুরুতে একটি অতিরিক্ত পর্ব অবং চরণের শেষে খন্ড পর্ব রয়েছে। ফলে পঙক্তি গুলি সমান নয়। এই বৈচিত্র্য প্রয়োজন হয়েছে ভাব ও বক্তব্যের কারনে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কবির আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাসের যে বিচিত্র প্রকাশ তাতে ঐ ছন্দ বৈচিত্রের প্রয়োজন ছিল। – বিশ শতকের বিস্ময়কর কবিতা ‘বিদ্রোহী‘, ড. রফিকুল ইসলাম

১৫. কবি কাজী নজরুল ইসলামের বহু প্রসিদ্ধ ও বিতর্কিত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রথম প্রকাশ লাভ করে ১৩২৮ সনের ২২শে পৌষ বিজলী পত্রিকায়। পরে মোসলেম ভারত, প্রবাসী, সাধনা প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বিদ্রোহী ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের অন্তর্গত কবিতা একটি। পরবর্তীকালে এই কবিতাটি সঞ্চিতায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম হলে ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দের ২৭শে ফেব্রুয়ারি ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি স্বয়ং কবি আবৃত্তি করেন। এই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কবি কাজী নজরুল ইসলামকে খ্যাতির সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করে দেয়, কবি বিদ্রোহী কবিরূপে সাধারণ্যে পরিচিতি লাভ করেন। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা স্বদেশ প্রেমিক বাঙালি পাঠক সমাজে অগ্নিশলাকার কাজ করে। – বিদ্রোহী, ড.রামজীবন আচার্য্য

১৬. রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি পরিক্রমার কালেই বিশের দশক থেকে বলদৃপ্ত আবেগের ঝোড়ো গর্জন তুলে বাংলা কবিতার অঙ্গন সচকিত করে নজরুলের অভ্যুদয় বিদ্রোহের মশাল-চিহ্নিত পথে শুধু ধূমকেতুর পুচ্ছতাড়নার চ্ছটা, উল্কার আগ্নেয় আভা, আর ঝড়-জলের অশনি-সংকেত। বিষয়ে ও প্রকরণে সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে নজরুলের বিদ্রোহী প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে তাই এতই পরিস্ফুট এবং এমন ধ্বনি-গম্ভীর যে অসতর্ক পাঠকেরও চিত্ত স্পর্শ করে, প্রাণে ঝংকার তোলে। বিদ্রোহের এই দৃশ্যময়, ধ্বনিময় ও আবেগময় প্রকাশের কারণেই বাংলা সাহিত্যে একমাত্র নজরুলই ‘বিদ্রোহী কবি’ রূপে চিহ্নিত; এবং বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ পেরিয়েই বিদ্রোহের মর্যাদায় অভিষিক্ত। এদিক থেকে নজরুল সর্বতোমুখী বিচারেও অদ্বিতীয়, অতুলনীয়। – নজরুলের বিদ্রোহ; বিদ্রোহের স্বরূপ-অন্বেষা, আহমদ রফিক

১৭. ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসের ‘প্রবাসীর কষ্টিপাথর’ বিভাগে ওই সালের কার্তিক মাসের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা পাঠে মনে ছন্দের দোলা ও ভাবের দ্বন্দ্ব জাগিয়াছিল। সত্যেন্দ্রনাথকে ছন্দের রাজা বলিয়া তখনই চিনিয়াছিলাম। গান্ধী-বন্দনা কবিতাটি পকেটে এবং নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা মনে লইয়া একদিন বৈকালে মফস্বলীয় মূঢ়তাসহ সত্যেন্দ্রনাথের সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলাম। স্বল্পভাষী সত্যেন্দ্রনাথ চক্ষুপীড়ায় অস্বচ্ছ রূঢ় দৃষ্টি আমার প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। ভয়ে এবং সংকোচে মরীয়া হইয়া শেষ পর্যন্ত ‘বিদ্রোহী’ সম্বন্ধে আমার বিদ্রোহ ঘোষণা করিলাম। বলিলাম, ছন্দের দোলা মনকে নাড়া দেয় বটে। কিন্তু আমি’র এলোমেলো প্রশংসা তালিকার মধ্যে ভাবের কোনও সামঞ্জস্য না পাইয়া মন পীড়িত হয়; এ বিষয়ে আপনার মত কি? প্রশ্ন শুনিয়া প্রথমটা বোধ হয় সত্যেন্দ্রনাথ একটু বিস্মিত হইয়াছিলেন। পরে একটা মৃদু হাসি তাঁহার মুখে ফুটিয়া উঠিল। …সত্যেন্দ্রনাথ আমার প্রশ্নের জবাবে সেদিন মোদ্দা কথাটা যাহা বলিয়াছেলেন তাহা আমি কোনদিনই ভুলিতে পারি নাই। তিনি বলিলেন, কবিতার ছন্দের দোলা যদি পাঠকের মনকে নাড়া দিয়া কোনও একটা ভাবের ইঙ্গিত দেয় তাহা হইলেই কবিতা সার্থক। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কোনও ভাবের ইঙ্গিত দেয় কিনা, তুমিই তাহা বলিতে পারিবে। – আত্মস্মৃতি, সজনী কান্ত দাস

১৮. ‘বিদ্রোহী’ দেখবামাত্র নজরুলের ভেতরে আমি হুইটম্যান আর রবীন্দ্রনাথ দুজনকেই একসঙ্গে পাকড়াও করেছিলাম। তবুও বুঝেছিলাম লেখক বাপকা-বেটা বটে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম কুরুক্ষেত্রের পরবর্তী অন্যতম যুগ-প্রবর্তক বাঙ্গালীর বাচ্চা নজরুল।’ (সাক্ষাতকার: বিনয় সরকার, ৬ জুন ১৯৪৩, বিনয় সরকারের বৈঠকে, প্রথম ভাগ, কলকাতা, ২০০৩, পৃ-৩৯৯)

১৯. নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা যুগান্তকারী কবিতা – যতটা কাব্যগুণে নয়, তার চেয়ে বেশি ঐতিহাসিক অর্থে। এই কবিতাই নজরুলকে প্রথম বাংলা কাব্য-জগতে প্রতিষ্ঠিত করে, এতেই তাঁর প্রথম প্রবল স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা। কিছু পরিমাণে স্বাতন্ত্র্য ও শক্তির পরিচয় তিনি অবশ্য এর আগেও দিয়েছিলেন, যেমন ‘শাতিল আরব’ কবিতায়, কিন্তু তাঁর বিশিষ্ট প্রতিভার চোখ-ঝলসানো দীপ্তি বিদ্রোহী’তেই প্রথম প্রকাশ পায়, এটিই তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় কবিতা। – বিদ্রোহী কবিতায় নজরুল, আবদুল হক

২০. বাংলা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে মুক্তবন্ধ কবিতার অতি উৎকৃষ্ট নিদর্শন স্বরূপ বাংলার উদীয়মান কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ নামক কবিতাটি উল্লেখযোগ্য। – প্রবোধ চন্দ্র সেন (‘প্রবাসী‘ পত্রিকা)

২১. বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের শুরুতে বিদ্রোহী নামক এক প্রান্তমুক্ত কাব্যভাষ্য সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই নজরুল, নিজে তখন বাইশ- তেইশ বছরের প্রচন্ড যুবা, পরিণত হলেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতে। সাম্যবাদে দীক্ষিত বন্ধু মুজফ্ফর আহমেদের সঙ্গে থাকতেন তখন, এক রাতে তার পাশের ঘরে সারারাত না ঘুমিয়ে শব্দবন্দী করলেন তাঁর বিদ্রোহী সত্তার মানব-ভাষ্য। বোঝা যায়, কবি হিসেবে কত স্বতঃস্ফূর্ত হলে, কত অমিতপ্রাণ হলে, কত আবেগ-কুশলী হলে একরাতের শ্রমে এমন একটি লোকোত্তর সৃষ্টি সম্ভব। এক হাতে, এক টানে লিখিত হলেও এই কবিতার কাব্যশরীর কবিতা রচনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ধরেই পাল্টেছে। পেন্সিলে লেখা হয়েছিল সবগুলো পঙক্তি, বিস্তর কাটাকুটি ছিল, গ্রহণ-পরিমার্জন ছিল, প্রথম ভাষ্যকে পাল্টে আরো গ্রহণযোগ্য ভাষ্য তৈরীর শ্রমিকতা ছিল, তাঁর কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাংলা সাহিত্য আর বাঙালি সমাজ যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। সেই যে তাঁর অভিধা, তার সহজ পরিবর্তন হলো না। এমনকি ঘনিষ্ঠ সাহিত্যানুরাগী কট্টর সমালোচকদের প্যারডির আঘাতও নজরুলকে নিজ অবস্থান থেকে টলাতে পারলো না। – বিদ্রোহীর বিশ্বায়ন, নজরুলের বিদ্রোহী, মুহম্মদ নূরুল হুদা

২২. ‘অগ্নিবীনা’ (১৯২২) নজরুল ইসলামের প্রথম এবং সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল কাব্যগ্রন্থ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পৃথিবী ব্যাপ্ত সামূহিক অবক্ষয় এবং ভারতের স্বাধিকার আকাঙ্খী রাজনৈতিক আলোড়ন উদ্দীপনার পটভূমিতে নির্মিত হয়েছে আলোচ্য কাব্য। পরাধীনতার বন্ধন থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় সচেতন ভারতবাসী যখন অবতীর্ন হয়েছে কঠিন সংগ্রামে, ঠিক তখনই অগ্নিবীণায় বিদ্রোহের সুরমূর্ছনা তুললেন নজরুল। সমগ্র জাতি মুহূর্তেই জেগে উঠল বিদ্রোহীর উচ্চকন্ঠ আহ্বানে, ‘বিদ্রোহী’ কবি অভিধায় নজরুল হলেন অভিনন্দিত। – বিশ্বজিৎ ঘোষ

বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী‘ সম্পর্কিত লেখা প্রকাশিত হয়:

১. ‘বিদ্রোহী অতি উচ্চশ্রেণির কবিতা…। শেষের দিকের কিয়দঅংশ পড়িলে সুইনবার্ণ রচিত Hertha মনে পড়ে, কিন্তু ঐ হার্থা অপেক্ষা বিদ্রোহী অনেক উচ্চে।’ (বঙ্গবাণী, চৈত্র ১৩২৮ বঙ্গাব্দ। সমকালীন অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য রচনা হিসাবে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে এই মন্তব্যটি করা হয়েছে। লেখকের নাম নেই। সেই সময় এটি একটি প্রচলিত রীতি ছিল। সম্পাদকমণ্ডলীর কেউ এই মন্তব্যটি করে থাকবেন।) এই জাতীয় প্রশস্তি আরও অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

২. আমরা বহুদিন পূর্বে কবির যে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির প্রাণ ভরিয়া প্রশংসা করিয়া সুখী হইয়াছিলাম, সেটি এ সংগ্রহে আছে। – অগ্নিবীণার আলোচনা, বঙ্গবাণী, শ্রাবণ ১৩৩১

৩. নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, ‘কামাল পাশা’, ‘সাম্যের গান’, ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ প্রভৃতি দেশাত্মমূলক কবিতা শুধু আজ নয় — অনাগত বহু দিন ধরিয়া বাংলার যুব জনগণকে আত্মচেতনায় ও গণদেবতার পূজায় উদ্বুদ্ধ করিবে। – ১৬ই ডিসেম্বর,১৯২৯ ‘বঙ্গবাণী‘ পত্রিকা

৪. ‘বিদ্রোহী’ পাঠে পাঠকের মনে বিস্ময়ের যে ঘোর সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহা কাটিতে না কাটিতে তাঁহার পূজারিনী নূতন বিস্ময় হইয়া উপস্থিত হইল। – নিকষমণি, সওগাত, কার্তিক ১৩৩৫

১৯২৯ সালের ১৫ই ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দু মুসলমানের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপুল সমারোহে ও আন্তরিকতা সহকারে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়, সংবর্ধনা-সভার সভাপতি বিজ্ঞানাচার্য শ্রী প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অভিভাষনের পর জাতির পক্ষ থেকে নজরুল-সংবর্ধনা সমিতির সভ্যবৃন্দ কবিকে একটি মানপত্র দান করেন। সভায় মানপত্রটি দান করেন মি. এস. ওয়াজেদ আলি। অভিনন্দনের উত্তরে কবি নিম্নলিখিত প্রতিভাষন দান করেন। নজরুলের অনন্য প্রতিভাষন সকলকে মুগ্ধ করে।

নজরুল এখানে তাঁর সম্পর্কে ব্যবহৃত ‘বিদ্রোহী‘ বিশেষণটি সম্পর্কে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করেন:

“আমাকে বিদ্রোহী বলে খামকা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ-কেউ। এ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কেনদিনই নেই। তাড়া যারা খেয়েছে, অনেক আগে থেকেই মরণ তাদের তাড়া করে নিয়ে ফিরছে। আমি তাতে এক-আধটু সাহায্য করেছি মাত্র।”

১৩৩৪ সালের ভাদ্র সংখ্যা নওরোজ পত্রিকায় নজরুল ইসলামকে লেখা অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁর একখানি পত্র প্রকাশিত হয়েছিল, সেই চিঠির উত্তরে ১৩৩৪ সালের পৌষ সংখ্যা সওগাতে নজরুলের লেখা একটি পত্র প্রকাশিত হয় যেখানে কবি তাঁর নামের পূর্বে ব্যবহৃত ‘বিদ্রোহী‘ বিশেষণটি সম্পর্কে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেনঃ

“বিদ্রোহী-র জয়-তিলক আমার ললাটে অক্ষয় হয়ে গেল আমার তরুণ বন্ধুদের ভালোবাসায়। একে অনেকেই কলঙ্ক-তিলক বলে ভুল করেছে, কিন্তু আমি করিনি। বেদনা-সুন্দরের গান গেয়েছি বলেই কি আমি সত্য-সুন্দরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি? আমি বিদ্রোহ করেছি — বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে যা মিথ্যা, কলুষিত, পুরাতন-পচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। হয়তো আমি সব কথা মোলায়েম করে বলতে পারিনি, তলোয়ার লুকিয়ে তার রূপার খাপের ঝকমকানিটাকেই দেখাইনি — এই তো আমার অপরাধ। এরই জন্য তো আমি ‘বিদ্রোহী’। আমি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, সমাজের সকল কিছু কুসংস্কারের বিধি-নিষেধের বেড়া অকুতোভয়ে ডিঙিয়ে গেছি, এর দরকার ছিল মনে করেই।”

গ্রন্থনা: সোমঋতা মল্লিক, নজরুল সঙ্গীত শিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)

তথ্যঋণ-

  • নজরুলের বিদ্রোহী, সম্পাদনা: রশীদ হায়দার
  • নজরুলের বিদ্রোহীর চেতনালোক, সম্পাদনা: তাহা ইয়াসিন
  • কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা- মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ
  • কাজী নজরুল ইসলাম-কবিতার জন্ম-পাঠকের অন্বেষা-নির্বাচন, বিশ্লেষণ এবং সম্পাদনা-সুমিতা চক্রবর্তী
  • সৃষ্টি সুখের উল্লাসে-সংকলন ও সম্পাদনা: বিশ্বজিৎ ঘোষ (২য় খণ্ড)

আরও পড়ুন ::

Back to top button