জন্মের ২০ দিনেই খুনের চেষ্টা! মায়ের সেই ‘ফেলে দেওয়া’ কন্যাসন্তানই আজ বলিউডের কাঁপানো তারকা
ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় জুটেছিল অমানুষিক নির্যাতন। নবজাতককে অনাথ আশ্রমে ফেলে দেওয়া কিংবা প্রাণে মেরে ফেলার জন্য ক্রমাগত চাপ দিচ্ছিল খোদ নিজের পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা। মাত্র ২১ দিনের দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে, পকেটে মাত্র ৮১ টাকা সম্বল করে ঘর ছেড়েছিলেন এক মা। ভাগ্য বদলের সেই লড়াইয়ের গল্প আজ সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। জন্মলগ্নে যে কন্যাসন্তানকে পরিবার ‘বোঝা’ মনে করেছিল, সেই শিশুই আজ ভারতের গর্ব— বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং প্রাক্তন মিস ইন্ডিয়া পূজা চোপড়া (Pooja Chopra)।
সম্প্রতি একটি রিয়েলিটি শো-তে এসে পূজার মা নীরা চোপড়া তাঁদের জীবনের সেই হাড়হিম করা সংগ্রামের কালো অধ্যায় তুলে ধরেন, যা শুনে চোখ ভিজেছে আপামর দর্শকের।
নীরা চোপড়া জানান, বিয়ের পর প্রথম কন্যাসন্তানের জন্মের সময় শ্বশুরবাড়ির আচরণ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বার সন্তানসম্ভবা হতেই বদলে যায় পরিস্থিতি। শাশুড়ি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এবার যেন ছেলেই হয়। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম মেনে ১৯৮৫ সালের ৩ মে কলকাতার এক হাসপাতালে জন্ম নেন দ্বিতীয় কন্যাসন্তান পূজা চোপড়া।

পূজার জন্মের পর টানা তিন দিন হাসপাতালে নীরাকে দেখতে কেউ আসেনি। এমনকি নবজাতক পূজার গায়ে দেওয়ার মতো কোনো পোশাকও পাঠায়নি পরিবার। শেষমেশ হাসপাতালের অন্য এক রোগীর পরিবারের দেওয়া কাপড়ে ঢাকা হয় একবিংশ শতাব্দীর হবু ‘মিস ইন্ডিয়া’কে! জন্মের ১০ দিন পর বাবা এলেও মেয়ের মুখ দেখে কোনো আনন্দ প্রকাশ করেননি। উল্টো হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার মাত্র ১১ দিনের মাথায় নীরাকে বাধ্য করা হয় কঠোর গৃহস্থালির কাজে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা শেয়ার করে নীরা জানান, পূজার জন্মের ২০ দিন পর থেকে শ্বশুরবাড়িতে প্রতিদিন চাপ দেওয়া হতো— হয় শিশুটিকে অনাথ আশ্রমে রেখে আসতে হবে, না হলে তাকে চিরতরে শেষ (খুন) করে দিতে হবে। কিন্তু একজন মায়ের পক্ষে নিজের সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া অসম্ভব ছিল।
“তারা আমাকে এই মেয়ের জন্যই ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। তখন আমি বলেছিলাম, একদিন এই মেয়েই আমাকে গর্বিত করবে। আজ সত্যিই আমার মেয়ে আমার মুখ উজ্জ্বল করেছে।” — নীরা চোপড়া (পূজার মা)
মেয়ের প্রাণ বাঁচাতে ২১ দিনের শিশুকন্যা এবং বড় মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘর ছাড়েন নীরা। কলকাতা থেকে যখন তিনি মুম্বাইয়ে নিজের বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছান, তখন তাঁর কাছে সম্বল বলতে ছিল মাত্র ৮১ টাকা!

মুম্বাইয়ে এসে শুরু হয় জীবনসংগ্রাম। একটি পাঁচতারা হোটেলে চাকরির খোঁজে গিয়ে মোনা চাওলা নামের এক সহৃদয় নারীর সহায়তায় মাত্র ৯০০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন নীরা। প্রায় ৬ বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর গোয়ায় একটি ভালো সংস্থানে ৬ হাজার টাকা বেতনের চাকরি পান তিনি। আর সেখান থেকেই ঘুরে যায় তাঁদের ভাগ্য চাকা।
মায়ের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেননি পূজা চোপড়া। ২০০৯ সালে তিনি ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া ইস্ট’ খেতাব অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে ‘মিস ইন্ডিয়া’র মুকুট মাথায় তোলেন।
একই বছর ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বের ঠিক এক সপ্তাহ আগে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পূজার গোড়ালি ভেঙে যায়। চিকিৎসকেরা তাঁকে তিন সপ্তাহের সম্পূর্ণ বিশ্রামের পরামর্শ দিলেও, মায়ের লড়াইয়ের কথা মাথায় রেখে পূজা হার মানেননি। ভাঙা পা ও তীব্র যন্ত্রণা নিয়েই তিনি বিশ্বমঞ্চে র্যাম্পে হাঁটেন এবং ১১২ জন প্রতিযোগীর মধ্যে শীর্ষ ১৬-তে নিজের জায়গা পাকা করেন। পরবর্তীতে বলিউডের ‘কমান্ডো’সহ একাধিক সিনেমায় অভিনয় করে তারকাখ্যাতি পান তিনি।
আজ দুই মেয়ের সাফল্যে গর্বিত ও আবেগাপ্লুত মা নীরা চোপড়া। রিয়েলিটি শো-তে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, যদি পুনর্জন্ম বলে কিছু থাকে, তবে তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রতিবার এই দুই কন্যাসন্তানকেই নিজের মেয়ে হিসেবে চাইবেন। পূজা চোপড়ার এই বাস্তব জীবনের গল্প সমাজকে আরও একবার মনে করিয়ে দেয়— কন্যা কোনো বোঝা নয়, সঠিক সুযোগ ও ভালোবাসা পেলে ওরাই আকাশ ছুঁতে পারে।



