
হুগলির দেবানন্দপুরের একটি তেলকলে অভিযান চালিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও মৃত আরশোলা পাওয়ার কথা জানিয়েছে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। প্রয়োজনীয় ফুড সেফটি লাইসেন্স না থাকায় ১৫ দিনের মধ্যে লাইসেন্স তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই দিনে শিয়ালদহে ভাইরাল পরোটা বিক্রেতা রাজুদার দোকানেও অভিযান চালিয়ে খাবারের নমুনা সংগ্রহ করেন আধিকারিকরা।
পুজোর মরশুমে খাবারের গুণগত মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে নজরদারি বাড়িয়েছে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। তারই মধ্যে শনিবার, ৩১ অক্টোবর, হুগলির দেবানন্দপুরের একটি তেলকলে অভিযান চালিয়ে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আনলেন আধিকারিকরা। সেখানে কালো ও অপরিচ্ছন্ন পাত্রে খোলা সরষের তেল মজুত করে বিক্রির পাশাপাশি একটি পাত্রে মৃত আরশোলা পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তেলকল কর্তৃপক্ষের কাছে ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও ফুড সেফটি লাইসেন্স পাওয়া যায়নি। এই ঘটনায় ১৫ দিনের সময়সীমা দিয়ে নোটিস জারি করেছে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর।
দেবানন্দপুরের তেলকলে কী পেলেন আধিকারিকরা?
খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা দেবানন্দপুরের ওই তেলকলে পৌঁছে প্রথমেই তেল সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখেন। তাঁদের নজরে আসে কালো ও চিটচিটে জ্যারিকেনে মজুত সরষের তেল। অভিযোগ, সেই তেল খুচরো বাজারে বিক্রি করা হচ্ছিল।
পরিদর্শনের সময় তেলের ড্রাম ও পাত্রের মধ্যে মৃত আরশোলা দেখতে পান আধিকারিকরা। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা। তেলকলের সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য সুরক্ষার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
মগরা ব্লকের খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিক তনুশ্রী মিশ্র জানিয়েছেন, ওই তেলকলে আগে তেল উৎপাদন করা হলেও বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ। তবে সেখানে খোলা তেল মজুত ও বিক্রির ব্যবস্থা ছিল। তেলের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষাগারের রিপোর্ট পাওয়ার পর তেলের গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তেলের পাত্রে আরশোলা, কী বলছেন তেলকল কর্তৃপক্ষ?
ঘটনা সামনে আসার পর তেলকল কর্তৃপক্ষের তরফে আলাদা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, যে পাত্রে মৃত আরশোলা পাওয়া গিয়েছে, সেটি সরষের তেলের পাত্র নয়, গুড় রাখার টিন। সেটি ফেলে দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন মালিক রোশনলাল গুপ্তা।
তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে খুচরো পণ্যের ব্যবসা করলেও সরষের তেল এভাবে খুচরো বিক্রি করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে, তা তাঁদের জানা ছিল না। খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের নির্দেশ মেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তবে কর্তৃপক্ষের এই দাবি এবং আধিকারিকদের পর্যবেক্ষণ—দুই বিষয়ই তদন্তের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ। সংগৃহীত তেলের পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত তেল ভেজাল বা দূষিত বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না।
ফুড লাইসেন্স না থাকায় ১৫ দিনের নোটিস
পরিদর্শনে তেলকল কর্তৃপক্ষ ট্রেড লাইসেন্স দেখাতে পারলেও প্রয়োজনীয় ফুড সেফটি লাইসেন্স দেখাতে পারেননি বলে জানিয়েছে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর। সেই কারণে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স তৈরি করার নির্দেশ দিয়ে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
খাদ্য সুরক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে FSSAI-এর লাইসেন্স অথবা রেজিস্ট্রেশন নিতে হয়। ব্যবসার ধরন ও আয়ের ভিত্তিতে লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হয়।
এ দিন শুধু দেবানন্দপুর নয়, হুগলির অন্যান্য তেলকলেও অভিযান চালানো হয়েছে। ভেজাল তেল বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখা এবং খাদ্য সুরক্ষার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করাই ছিল এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
শিয়ালদহে রাজুদার পরোটার দোকানেও অভিযান
হুগলির তেলকলে অভিযানের পাশাপাশি শনিবার সকালে শিয়ালদহ স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় একাধিক খাবারের দোকানেও পৌঁছন খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা। সেই তালিকায় ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত হয়ে ওঠা রাজুদার পকেট পরোটার দোকানও।
অভিযান চলাকালীন আধিকারিকরা রাজুদার কাছে খাবার বিক্রির প্রয়োজনীয় লাইসেন্স দেখতে চান। কিন্তু তিনি তা দেখাতে পারেননি বলে জানা গিয়েছে। এরপর খাবারের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য তাঁর দোকান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
রাজুদার দাবি, প্রাথমিক ফিল্ড টেস্টে তাঁর তৈরি তরকারি উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত খাবারের গুণগত মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
পাশাপাশি, খাবার বিক্রির সময় তাঁকে সার্জিক্যাল ক্যাপ পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরের আরও কয়েকটি খাবারের দোকানেও এ দিন পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহের কাজ চলে।
খাদ্য সুরক্ষা অভিযানে কী বার্তা?
দেবানন্দপুরের তেলকল থেকে শিয়ালদহের রাস্তার খাবারের দোকান—দুই জায়গার অভিযানেই সামনে এসেছে খাদ্যপণ্যের সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় লাইসেন্সের গুরুত্ব।
বিশেষ করে সরষের তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনার সময় ক্রেতাদের প্যাকেটের সিল, প্রস্তুতকারকের তথ্য, FSSAI লাইসেন্স নম্বর এবং মেয়াদ সংক্রান্ত তথ্য দেখে নেওয়া উচিত।
তবে কোনও একটি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই সেই এলাকার সমস্ত খাদ্যপণ্যকে সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক নয়। সংগৃহীত নমুনার পরীক্ষার রিপোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপই এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ছবি স্পষ্ট করবে।
FAQ
১. হুগলির কোথায় তেলের পাত্রে মৃত আরশোলা পাওয়া গিয়েছে?
হুগলির চুঁচুড়া থানার অন্তর্গত দেবানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার একটি তেলকলে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের অভিযানে এই ঘটনা সামনে আসে।
২. তেলকল কর্তৃপক্ষকে কেন নোটিস দেওয়া হয়েছে?
প্রয়োজনীয় ফুড সেফটি লাইসেন্স দেখাতে না পারা এবং স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
৩. তেলকলকে কত দিনের মধ্যে লাইসেন্স তৈরি করতে বলা হয়েছে?
খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের তরফে ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৪. তেলের মধ্যে আরশোলা পাওয়ার পর তেলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে কি?
হ্যাঁ। আধিকারিকরা বিক্রির জন্য রাখা তেলের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। পরীক্ষাগারের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর তেলের গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
৫. রাজুদার পরোটার দোকানে কী অনিয়ম পাওয়া গিয়েছে?
অভিযানের সময় প্রয়োজনীয় লাইসেন্স দেখাতে পারেননি রাজুদা। তাঁর দোকান থেকে খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রাথমিক ফিল্ড টেস্টে তরকারি উত্তীর্ণ হয়েছে; চূড়ান্ত পরীক্ষার রিপোর্টের অপেক্ষা রয়েছে।
৬. খাদ্য ব্যবসার জন্য FSSAI লাইসেন্স কি বাধ্যতামূলক?
খাদ্য ব্যবসায়ীদের FSSAI-এর নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স অথবা রেজিস্ট্রেশন নিতে হয়। ব্যবসার ধরন ও বার্ষিক আয়ের ভিত্তিতে কোনটি প্রয়োজন, তা নির্ধারিত হয়।



