জাতীয়রাজনীতি

মোদী-মমতা একই নীতি? শহিদ মিনার থেকে বড় দাবি রাহুলের

ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

মোদী-মমতা একই নীতি? শহিদ মিনার থেকে বড় দাবি রাহুলের - West Bengal News 24

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আবহে কলকাতার শহিদ মিনার চত্বরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের এক জনসভা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে, যেখানে দলের লোকসভার নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে একই আসনে বসিয়ে সমালোচনা করেন এবং তাঁদের নীতিগত অবস্থানের মধ্যে মিল থাকার অভিযোগ তোলেন, যা রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় কংগ্রেসের ৫৫ জন প্রার্থীর সমর্থনে প্রচার করতে এসে রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তব্যে বলেন যে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে ধরনের শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করছেন, পশ্চিমবঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই ধরনের কাজ করছেন। তাঁর এই মন্তব্যে তিনি মূলত কর্মসংস্থান ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্ন তুলে ধরেন এবং দাবি করেন যে উভয় ক্ষেত্রেই ঘোষণার তুলনায় বাস্তব ফলাফল অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।

রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তব্যে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ টেনে আনেন এবং বলেন যে তৎকালীন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাঁচ লক্ষ মানুষের চাকরি দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন তোলেন যে কতজন সেই প্রতিশ্রুত চাকরি পেয়েছেন এবং দাবি করেন যে বিপুল সংখ্যক যুবক বেকারভাতার জন্য আবেদন করতে বাধ্য হয়েছেন, যা রাজ্যের কর্মসংস্থানের পরিস্থিতির একটি প্রতিফলন।

আরও পড়ুন :: ‘যান যমুনায় ডুব দিয়ে আসুন’, দূষণ প্রসঙ্গ টেনে মোদির নৌকাবিহার নিয়ে কটাক্ষ মমতার

একইসঙ্গে তিনি ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দেওয়া কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করেন এবং বলেন যে প্রতি বছর দুই কোটি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। এই দুই উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বোঝাতে চান যে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় স্তরেই প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক রয়েছে এবং এই বিষয়টিকেই তিনি রাজনৈতিক সমালোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

এর পাশাপাশি রাহুল গান্ধী আরও অভিযোগ করেন যে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নীতির কারণে বিজেপি রাজ্যে রাজনৈতিক জমি তৈরি করতে পেরেছে এবং এই পরিস্থিতির জন্য রাজ্যের শাসনব্যবস্থাকেই তিনি দায়ী করেন। তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে আসে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগের প্রসঙ্গ, যেমন নারদ ও সারদা কেলেঙ্কারি, এবং আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে এক তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন কেন এইসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।

তিনি আরও দাবি করেন যে তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রীয় সংস্থার জেরার মুখোমুখি হতে হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেইভাবে জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হয়নি, যা নিয়ে তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন এবং এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত করেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন।

রাহুল গান্ধীর এই বক্তব্যের পরপরই তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজা তাঁর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বলেন যে রাহুল গান্ধী দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করছেন এবং বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নন। তিনি দাবি করেন যে নির্বাচনের সময়ও তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি নোটিস পাঠাচ্ছে এবং এই প্রেক্ষাপটে রাহুলের মন্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তৃণমূলের পক্ষ থেকে আরও বলা হয় যে বিজেপিকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে কংগ্রেসের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে এবং অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে তারা সমালোচনা করে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কংগ্রেস যদি তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করত, তবে বিজেপি একাধিক রাজ্যে নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারত না। এই পাল্টা বক্তব্যে স্পষ্ট যে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যেও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং অবিশ্বাস বিদ্যমান, যা নির্বাচনী রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তবে এই সমালোচনার মধ্যেও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, রাহুল গান্ধী তাঁর বক্তব্যে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনও মন্তব্য করেননি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিলের বিরোধিতায় কংগ্রেস ও তৃণমূল একসঙ্গে অবস্থান নিয়েছিল এবং সেই প্রেক্ষাপটে দুই দলের মধ্যে একটি সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেখা গিয়েছিল।

জাতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধী যে জোট গড়ে উঠেছিল, সেখানে কংগ্রেস ও তৃণমূল উভয়ই অংশগ্রহণ করেছিল এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণ মাথায় রেখেই এই ধরনের বক্তব্যে কিছুটা সংযম দেখানো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবুও রাহুল গান্ধী স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে বিজেপি সরকার তাঁকে এবং কংগ্রেস নেতৃত্বকে যেভাবে আক্রমণ করছে, সেই তুলনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একইভাবে নিশানা করা হচ্ছে না, যা তাঁর মতে রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

তিনি বলেন, বিজেপি নেতৃত্ব প্রায়শই কংগ্রেস ও তার নেতাদের আক্রমণ করে, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধুমাত্র নির্বাচনের সময়েই সমালোচনা করা হয় এবং নির্বাচন শেষ হলে সেই আক্রমণ বন্ধ হয়ে যায়। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান যে বিজেপির মূল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কংগ্রেসকেই তারা বিবেচনা করে এবং সেই কারণেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ বেশি তীব্র।

এই সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে শুধু শাসক ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে নয়, বরং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলির মধ্যেও পারস্পরিক সমালোচনা ও অবস্থানগত পার্থক্য সামনে আসছে। এর ফলে নির্বাচনী লড়াই আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে এবং ভোটারদের সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও দাবি উপস্থাপিত হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত এই সমস্ত বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য এবং রাজনৈতিক কৌশলের প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের সিদ্ধান্তের উপর, যা নির্ধারিত হবে গণনার দিনে এবং সেখানেই স্পষ্ট হবে এই নির্বাচনী প্রচারের প্রকৃত ফলাফল।

আরও পড়ুন ::

Back to top button