ভোটগণনায় বড় মোড়! নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূল, শনিবার সকালেই বিশেষ শুনানি
ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনা ঘিরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও তার আইনি বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে গণনাকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়টি আদালতের দ্বারস্থ হয়ে এখন জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে এবং এই প্রেক্ষাপটেই পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস বিষয়টি নিয়ে সরাসরি শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
ভোটগণনার ঠিক আগে এই মামলাকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ সুপ্রিম কোর্ট তৃণমূলের দায়ের করা আবেদন গ্রহণ করেছে এবং দ্রুত শুনানির জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়েছে, যেখানে বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী শনিবার সকাল সাড়ে দশটায় এই মামলার শুনানি করবেন বলে জানা গেছে, যা এই বিষয়টির গুরুত্ব এবং জরুরিতার ইঙ্গিত বহন করে।
এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয় যখন নির্বাচন কমিশন ভোটগণনার জন্য কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং প্রতিটি গণনার টেবিলে অন্তত একজন কেন্দ্রীয় কর্মী উপস্থিত রাখার পরিকল্পনা করা হয়, যা কমিশনের মতে গণনার প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার উদ্দেশ্যে গৃহীত একটি পদক্ষেপ।
আরও পড়ুন :: ২০-২৫ বছরের পরিকল্পনা দরকার, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দেবের বার্তা
তবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে তৃণমূল কংগ্রেস প্রথমে কলকাতা হাই কোর্ট-এর দ্বারস্থ হয় এবং দাবি করে যে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের নিয়োগের সিদ্ধান্ত পক্ষপাতমূলক হতে পারে এবং এতে গণনার প্রক্রিয়ার উপর প্রশ্ন উঠতে পারে, ফলে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তারা আবেদন জানায়।
কিন্তু হাই কোর্টে এই মামলার শুনানির সময় বিচারপতি কৃষ্ণা রাও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তে কোনও বেআইনি কিছু নেই এবং কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ সম্পূর্ণ বৈধ, পাশাপাশি তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে মামলাকারীর অভিযোগ প্রমাণহীন এবং এই পর্যায়ে আদালতের হস্তক্ষেপের কোনও প্রয়োজন নেই।
হাই কোর্ট আরও উল্লেখ করে যে ভবিষ্যতে যদি ভোটগণনায় কোনও ধরনের অনিয়ম বা কারচুপির প্রমাণ সামনে আসে, তবে তা ইলেকশন পিটিশনের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে, যা একটি প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া এবং যার মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন তোলা সম্ভব হয়, ফলে বর্তমান পর্যায়ে কমিশনের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই বলে আদালত মনে করে।
এই রায়ের পরই তৃণমূল কংগ্রেস শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয় এবং হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানায়, যার ফলে বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ আদালতের বিবেচনার অধীনে এসেছে এবং তার রায়ের উপর নির্ভর করবে গণনাকেন্দ্রে কর্মী নিয়োগের এই বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের তরফে ইতিমধ্যেই ভোটগণনার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের জন্য মোট ৭৭টি গণনাকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে গণনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে কমিশনের দাবি।
সাধারণত একটি গণনাকেন্দ্রে একাধিক টেবিলে সমান্তরালভাবে ভোটগণনা করা হয় এবং প্রতিটি টেবিলে কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার ও সহকারী নিয়োগ করা হয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক টেবিলের গণনা সম্পন্ন হলে তা একটি ‘রাউন্ড’ হিসেবে গণ্য হয়, এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হয় যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং প্রতিটি ভোটের হিসাব সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এবং আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে এক পক্ষ মনে করছে যে কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের উপস্থিতি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, অন্য পক্ষের মতে এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হতে পারে এবং সেই কারণেই তারা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এখন সবার নজর ভোটগণনার দিকে, কারণ এই পর্যায়েই নির্বাচনের প্রকৃত ফলাফল নির্ধারিত হবে এবং সেই ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারিত হবে, ফলে গণনাপ্রক্রিয়ার প্রতিটি দিকই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন শুনানি শুধু একটি আইনি বিতর্কের নিষ্পত্তি নয়, বরং তা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, কারণ আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে গণনাকেন্দ্রে কর্মী নিয়োগের এই নীতি কতটা গ্রহণযোগ্য এবং তা ভবিষ্যতে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
সমগ্র ঘটনাপ্রবাহটি দেখায় যে নির্বাচনের প্রতিটি ধাপ ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ভোটগণনা পর্যন্ত আইন, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক কৌশলের একটি জটিল সমন্বয়, যেখানে সামান্য সিদ্ধান্তও বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে এবং সেই বিতর্কের নিষ্পত্তিতে বিচারব্যবস্থার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা এই ঘটনায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।



