গণনাকেন্দ্র ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: ১৬৩ ধারা জারি করে জমায়েতে কড়া নিষেধাজ্ঞা কলকাতার পুলিশ কমিশনারের!
ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

ভোটগণনার প্রাক্কালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য উত্তেজনা এড়াতে কলকাতার সমস্ত গণনাকেন্দ্র ও স্ট্রংরুম ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করল প্রশাসন, যেখানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ধারা ১৬৩ জারি করে ২০০ মিটারের মধ্যে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এই নির্দেশ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গণনাকেন্দ্র সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই নির্দেশ জারি করেছেন কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ, এবং তাঁর জারি করা নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে স্ট্রংরুম বা গণনাকেন্দ্রের আশেপাশে কোনও ধরনের মিছিল, সভা, বিক্ষোভ, শোভাযাত্রা বা জনসমাবেশ করা যাবে না, পাশাপাশি পাথর, ইট বা অন্য কোনও ক্ষতিকর বস্তু বহন করার উপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে যে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনও সামগ্রী ওই নির্দিষ্ট পরিসরের মধ্যে নিয়ে যাওয়া যাবে না এবং আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে যে গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে কোনওরকম আপস করা হবে না।
তবে এই নিষেধাজ্ঞা সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং ডিউটিতে থাকা পুলিশকর্মী, কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য এবং নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না বলে জানানো হয়েছে, যাতে তাঁদের কাজের কোনও বিঘ্ন না ঘটে এবং গণনা প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গণনার দিন সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা, জমায়েত বা বিক্ষোভ এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে, কারণ ভোট-পরবর্তী পর্যায়ে স্ট্রংরুমকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখযোগ্য যে সম্প্রতি কলকাতার ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র এবং শাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে স্ট্রংরুম ঘিরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীরা কারচুপির আশঙ্কা তুলে সরব হন এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়, যা প্রশাসনকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
এই ঘটনায় বেলেঘাটা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী কুণাল ঘোষ এবং শ্যামপুকুর কেন্দ্রের প্রার্থী শশী পাঁজা সরাসরি অভিযোগ তোলেন যে ইভিএমে কারচুপি হতে পারে, এবং সেই প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যেখানে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিও বেড়ে যায় এবং প্রশাসনের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও স্ট্রংরুম পরিদর্শনে যান এবং দীর্ঘ সময় সেখানে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন, যা এই বিষয়টির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং রাজনৈতিকভাবে বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
এই সমস্ত ঘটনার প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন কমিশন এবং পুলিশ প্রশাসন গণনাকেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা নিয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ এবং সেই কারণেই কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যাতে গণনার দিন কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা বা সংঘর্ষের সম্ভাবনা ন্যূনতম রাখা যায় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের পদক্ষেপ নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ গণনার দিন সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় এবং ফলাফল ঘোষণার আগে বিভিন্ন জায়গায় জমায়েত বা বিক্ষোভের সম্ভাবনা থাকে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই ধরনের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে, অন্যদিকে তা রাজনৈতিক দলগুলির তৎপরতার উপরও একটি সীমা আরোপ করে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে, যদিও এর ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচির উপর কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গণনাকেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে এবং সেই লক্ষ্যেই এই ধরনের কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোটগণনার স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।



