
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের শেষ দফার আগে রাজনৈতিক প্রচার যখন তুঙ্গে, তখন কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ভবানীপুরে নির্বাচনী আবহ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং সেই প্রেক্ষাপটেই একটি জনসভাকে ঘিরে মাইক ব্যবহারের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শনিবার ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া এলাকায় স্বামী নারায়ণ মন্দিরের কাছে একটি জনসভায় যোগ দিতে গিয়েছিলেন তিনি, যেখানে স্থানীয় স্তরে সংগঠিত এই প্রচারসভায় তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। এই সভা ছিল নির্বাচনের শেষ পর্বের আগে তাঁর প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ ভবানীপুর কেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত তীব্র এবং এই আসনটি এবারের নির্বাচনে অন্যতম উচ্চপ্রোফাইল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, যখন অভিযোগ ওঠে যে সভাস্থলের খুব কাছেই বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষ থেকে উচ্চস্বরে মাইক বাজানো হচ্ছিল, যা তৃণমূল নেত্রীর বক্তব্যে বাধা সৃষ্টি করে। উপস্থিত সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মাইকের শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে তা সভার পরিবেশকে বিঘ্নিত করে এবং বক্তব্য শোনা কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন :: মোদী-মমতা একই নীতি? শহিদ মিনার থেকে বড় দাবি রাহুলের
এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুক্ষণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর মঞ্চ থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং উপস্থিত জনতার কাছে দুঃখপ্রকাশ করে জানান যে এই অবস্থায় সভা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে সভা করা অসম্ভব এবং এই ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে তিনি ভোটারদের কাছে সমর্থন চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে তিনি এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে একটি পরিকল্পিত বিঘ্ন ঘটানোর প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে সমস্ত প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি নেওয়া সত্ত্বেও এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যা তাঁর মতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। তাঁর বক্তব্যে এই ইঙ্গিতও ছিল যে নির্বাচনী প্রচারে বাধা সৃষ্টি করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এই ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
এই ঘটনার জেরে তিনি শেষ পর্যন্ত সভা ছেড়ে বেরিয়ে যান, যা উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি করে এবং একইসঙ্গে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত ঘটায়। নির্বাচনের ঠিক আগে এই ধরনের ঘটনা শাসকদলের পক্ষ থেকে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তারা দাবি করছে যে প্রচারের শেষ মুহূর্তে এই ধরনের বাধা সৃষ্টি করে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভবানীপুর কেন্দ্র এবারের নির্বাচনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই আসনে সরাসরি মুখোমুখি লড়াইয়ে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী শিবিরের প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী, যিনি ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ফলে এই কেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা স্বাভাবিকভাবেই বেশি এবং উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ধারাবাহিকভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
২৩ তারিখ নন্দীগ্রামে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে আরও বেশি সময় ব্যয় করছেন এবং প্রায় প্রতিদিনই জনসভা, রোড শো এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। শনিবারও তিনি ভবানীপুর এলাকায় একটি জনসভা করেন, যা এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার তীব্রতাকে আরও স্পষ্ট করে।
একইদিন সন্ধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি প্রেক্ষাগৃহে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি টলিউডের একাধিক পরিচিত মুখও উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকেও তিনি নির্বাচনী প্রচারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং কর্মীদের সংগঠিত থাকার আহ্বান জানান। তবে সেই বৈঠকের সময়ই মাইকের উচ্চ শব্দের অভিযোগ উঠে আসে, যা তাঁর বক্তব্যে বাধা সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই বৈঠকের পরিবেশও প্রভাবিত হয়।
এই ধরনের ঘটনা নতুন নয় বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, কারণ অতীতেও নির্বাচনী প্রচারের সময় বিভিন্ন কারণে তৃণমূল নেত্রীর কর্মসূচিতে বিঘ্ন ঘটার অভিযোগ উঠেছে। কখনও নির্বাচন কমিশনের অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতা, কখনও বিরোধী দলের কর্মসূচির সঙ্গে সংঘর্ষ এই ধরনের বিষয়গুলি নির্বাচনী পরিবেশে প্রায়শই দেখা যায় এবং তা রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
একটি ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল যে রোড শো করার অনুমতি না পাওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিকল্পভাবে রাস্তার ধারে সাধারণ মানুষের সঙ্গে চা-চক্রে অংশ নিয়ে জনসংযোগ করেছিলেন, যা রাজনৈতিকভাবে একটি ভিন্ন বার্তা বহন করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে শনিবারের এই ঘটনাও শাসকদলের পক্ষ থেকে একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যেখানে তারা দাবি করছে যে প্রচারের শেষ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলির প্রচার কর্মসূচি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হওয়ার কথা এবং একে অপরের কর্মসূচিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিঘ্ন ঘটানো উচিত নয়। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এই ধরনের অভিযোগ প্রায়শই ওঠে এবং তা প্রশাসনিক নজরদারির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনায়ও প্রশাসনের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য তদন্তের প্রশ্ন উঠে আসতে পারে, যদিও তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং প্রমাণের উপর।
ভবানীপুর কেন্দ্রের এই ঘটনাটি নির্বাচনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে, যেখানে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল ভোটের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রচারের পদ্ধতি এবং পরিবেশ নিয়েও বিতর্ক তৈরি করছে। এই ধরনের পরিস্থিতি ভোটারদের উপর কী প্রভাব ফেলবে এবং নির্বাচনের ফলাফলে তার কোনও প্রতিফলন ঘটবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
তবে এই ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা কতটা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সেই উত্তেজনার মধ্যে বিভিন্ন ঘটনা কীভাবে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত গণনার দিনই নির্ধারণ করবে এই সমস্ত ঘটনার রাজনৈতিক তাৎপর্য কতটা এবং কোন পক্ষ তার থেকে লাভবান হয়েছে।



