রাজ্য

নবান্নের কড়া নির্দেশ! ১০:১৫-র মধ্যে হাজিরা বাধ্যতামূলক, ৫:১৫-র আগে অফিস ছুটি নয়

ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

নবান্নের কড়া নির্দেশ! ১০:১৫-র মধ্যে হাজিরা বাধ্যতামূলক, ৫:১৫-র আগে অফিস ছুটি নয় - West Bengal News 24

রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনিক কর্মসংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল নবান্ন এবং রাইটার্স বিল্ডিং প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে। সরকারি দপ্তরে উপস্থিতি এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে রাজ্য সরকার। মঙ্গলবার অর্থদপ্তরের তরফে ডেপুটি সেক্রেটারি স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, সমস্ত সরকারি কর্মীকে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উপস্থিত থাকতে হবে এবং বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটের আগে অফিস ত্যাগ করা যাবে না। সরকারি প্রশাসনের কাজ যাতে নিরবচ্ছিন্ন ও মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়, সেই উদ্দেশ্যেই এই সময়সীমা কার্যকর করা হচ্ছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন সরকারের এই পদক্ষেপকে প্রশাসনিক মহলে কর্মসংস্কৃতি পুনর্গঠনের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রশাসনিক গতি বাড়ানো, সরকারি পরিষেবার সময়সীমা নির্ধারণ এবং অফিসে উপস্থিতির ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপের বার্তা দিতে শুরু করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই প্রেক্ষাপটেই সরকারি কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট সময় মেনে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার এই নির্দেশকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরে বিপুল পরিমাণ কাজ জমে রয়েছে এবং সেই কাজ দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। দপ্তরগুলির মধ্যে সমন্বয় রক্ষা এবং ফাইল নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট সময় ধরে কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অফিসে সই করে বেরিয়ে যাওয়া নয়, বরং পুরো কর্মদিবস জুড়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে উপস্থিত থেকে কাজ করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। দুপুরের বিরতি বা অন্য কোনও অজুহাতে দীর্ঘ সময় অফিসের বাইরে থাকা নিয়েও কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।

আরও পড়ুন :: ‘প্রভাবশালী’ তত্ত্বে ২১ মে পর্যন্ত ইডি হেফাজতে সুজিত বসু, মিলল কোটি কোটি টাকার লেনদেনের হদিস

সরকারি মহলের মতে, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হলে দপ্তরভিত্তিক কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রকল্প, আর্থিক বরাদ্দ, জনপরিষেবা এবং ফাইল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বিলম্ব হলে তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের উপর। সেই কারণেই কর্মঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ উপস্থিতি নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন নির্দেশিকা দ্রুত কার্যকর করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে।

এই নির্দেশ জারির পর থেকেই রাজ্যের প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বহু সরকারি কর্মী এবং আধিকারিকের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি অফিসে উপস্থিতির ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা তৈরি হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ের পরে অফিসে আসা বা আগেভাগে বেরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে অভিযোগ উঠত। নতুন সরকার সেই প্রবণতার উপর লাগাম টানতে চাইছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

রাজ্যের কর্মসংস্কৃতির বিবর্তনের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক আমলে প্রশাসনিক কাজের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বামফ্রন্ট আমলে সরকারি অফিসের ধীর গতির কাজ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রচলিত মন্তব্য ছিল। সরকারি ফাইল দীর্ঘদিন আটকে থাকা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব এবং কাজের ধীরগতিকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের তরফে বারবার সমালোচনা করা হত। যদিও বাম আমলের প্রশাসনিক কাঠামোয় নিয়মশৃঙ্খলা ও দপ্তরভিত্তিক পদ্ধতিগত কাজের উপর গুরুত্ব ছিল বলে তৎকালীন আমলাদের একাংশের মত।

আরও পড়ুন :: ভোট বিপর্যয়ের পরেই অ্যাকশন! আইটি সেলে বড় কোপ মমতার, দেবাংশু-উপাসনার হাতে নতুন দায়িত্ব!

পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনিক গতিশীলতা বাড়ানোর উপর বিশেষ জোর দেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিভিন্ন প্রশাসনিক বৈঠকে তিনি বারবার সরকারি আধিকারিকদের দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জনপরিষেবা সংক্রান্ত কোনও ফাইল যাতে অযথা পড়ে না থাকে, সেই বিষয়েও কড়া মনোভাব নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন দপ্তরে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং নিয়মিত প্রশাসনিক বৈঠকের মাধ্যমে কাজের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

তবে একই সঙ্গে তৃণমূল আমলে সরকারি কর্মীদের জন্য একাধিক ছুটি এবং উৎসবকেন্দ্রিক ছাড় নিয়েও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে আলোচনা চলত। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, অতিরিক্ত ছুটি এবং প্রশাসনিক নমনীয়তার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অফিসের কার্যকারিতা প্রভাবিত হয়েছে। যদিও তৎকালীন সরকারের দাবি ছিল, কর্মীদের মানসিক স্বস্তি এবং সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নতুন বিজেপি সরকার সেই পূর্ববর্তী প্রশাসনিক ধারা থেকে আলাদা একটি বার্তা দিতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে প্রশাসনের মধ্যে সময়নিষ্ঠা এবং উপস্থিতিভিত্তিক কাজের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারি দপ্তরে নির্দিষ্ট সময়ে প্রবেশ এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তকে সেই বৃহত্তর নীতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধুমাত্র উপস্থিতির সময় বেঁধে দিলেই কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তন সম্পূর্ণ হবে না। তার সঙ্গে কাজের মূল্যায়ন, ফাইল নিষ্পত্তির সময়সীমা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং দপ্তরভিত্তিক জবাবদিহিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যে বায়োমেট্রিক হাজিরা, অনলাইন ফাইল ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কর্মীদের উপস্থিতি ও কাজের উপর নজরদারি চালু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও ভবিষ্যতে সেই ধরনের পদক্ষেপ আরও বাড়তে পারে বলে প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করছে।

অন্যদিকে সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলির একাংশ এই নির্দেশকে কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনার পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, অন্য অংশের বক্তব্য কর্মপরিবেশ, অবকাঠামো এবং দপ্তরভিত্তিক সমস্যাগুলির সমাধানও সমানভাবে জরুরি। তাঁদের মতে, শুধুমাত্র সময় বেঁধে দেওয়ার পরিবর্তে কর্মীদের উপর কাজের চাপ, শূন্যপদ, প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং পরিষেবা কাঠামোর বাস্তব পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। যদিও এখনও পর্যন্ত এই নির্দেশিকা নিয়ে বড় আকারে কোনও আনুষ্ঠানিক বিরোধিতা সামনে আসেনি।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, বিভিন্ন দপ্তরে এই নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে। বিভাগীয় প্রধানদের উপস্থিতি খতিয়ে দেখা, হাজিরার রেকর্ড সংরক্ষণ এবং সময়ভিত্তিক উপস্থিতি পর্যালোচনার মতো পদক্ষেপও ভবিষ্যতে চালু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সরকারি কর্মীদের মধ্যে শৃঙ্খলা এবং সময়নিষ্ঠা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনপরিষেবার গতি বাড়ানোই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে প্রশাসনের দাবি।

এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রশাসনিক পরিবর্তনের বার্তা দিতে চাইছে। কর্মসংস্কৃতিতে কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে সরকার একদিকে যেমন প্রশাসনের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছেও দ্রুত ও কার্যকর পরিষেবার বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত।

রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ইতিমধ্যেই এই নির্দেশিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক কর্মীর মতে, নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে উপস্থিত থাকার বিষয়টি নতুন নয়, তবে এবার তা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার ইঙ্গিত মিলছে। অন্যদিকে প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, সরকারি কাজের মান এবং গতি বাড়াতে হলে উপস্থিতিভিত্তিক শৃঙ্খলা অত্যন্ত জরুরি। কারণ বহু ক্ষেত্রে ফাইল অনুমোদন, বিভাগীয় সমন্বয় এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে আধিকারিকদের অনুপস্থিতিকেই দায়ী করা হয়।

সরকারি প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। ডিজিটাল পরিষেবা বৃদ্ধি, অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা এবং দ্রুত সরকারি অনুমোদনের যুগে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের এই কড়া অবস্থানকে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এই নির্দেশ কতটা কার্যকর হয় এবং তার ফলে সরকারি পরিষেবার মান কতটা উন্নত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন ::

Back to top button