মতামত

গণতন্ত্রের চতুর্থতম স্তম্ভটির মর্যাদা লঙ্ঘন করেছে

মৃত্যুঞ্জয় সরদার

নিজের পেশা টেনে কথা বলব, এবং নিজের পেশাটাকে সবার সামনে সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন করাটা আজ খুব প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে।সাংবাদিক শব্দটার মধ্যে লুকিয়ে ছিল ভয়-ভীতি ও শ্রদ্ধার একটি জায়গা, সেই শ্রদ্ধা কে ক্ষুণ্ন করেছে আমাদের মতন কিছু লেজুড়বৃত্তি সাংবাদিকরা।দীর্ঘ ১৬ বছর সত্যকথা উদঘাটন ও সমাজ সংস্কারের দর্পণ হিসেবে কাজ করতে গিয়ে জীবন পর্যন্ত বাজি রেখেছি।আমি যে এলাকায় বসবাস করি সেই এলাকার একশ্রেণীর লেজুড়বৃত্তি সাংবাদিকরা নিজের স্বার্থের জন্য আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়েছে ও খুন করার পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে করে আসছে এই সময়ে। এই মহান পেশাটাকে কালিমামুক্ত করে চলেছে এক শ্রেণীর সাংবাদিকরা । নিজের স্বার্থের মুনাফা লোটা, ও মিথ্যে কথা লেখা অগণিত সাংবাদিকদের জন্য সাংবাদিকদের উপরে অত্যাচার ,অবিচার ,অনাচার এর কারণ সাংবাদিকরা! সাংবাদিক সাংবাদিকদের শত্রু,সেই কারণে দিনের প্রকাশ্যে আলোতে খুন হতে হচ্ছে একাধিক সাংবাদিককে। এখানেই শেষ নয় সত্য কথা লেখা বা বলার জন্য একাধিক সাংবাদিককে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে হাজত বাস করছে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাংবাদিকতার গুরুত্ব এবং এই পেশার সম্মান সর্বজনবিদিত। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে একজন সাংবাদিকের পেশাগত সংগ্রাম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি রয়েছে। সেই মহান কাজের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের আঘাত করার কোন অধিকার কারও নেই। তবে কোন সাহসে পুলিশ চন্দ্রশেখর সরকার অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করল। কি তার অপরাধ ছিল সেটা খতিয়ে না দেখে, এহেনে ব্যবস্থা অত্যন্ত লজ্জাজনক দুঃখজনক গণতন্ত্রের পক্ষে।সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে পুলিশ প্রশাসন।এখানে স্বাধীনতার প্রশ্নটা অবশ্য সংবাদমাধ্যমের প্রসঙ্গে উঠছে।এদিকে সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতু্র্থ স্তম্ভ মনে করা হয়। তার মর্যাদা অপরিসীম। কিন্তু কৃষ্ণনগরের সাংসদ ও নদিয়া জেলা তৃণমূলের সভানেত্রী মহুয়া সম্প্রতি নদিয়ার চাকদা ও গয়েশপুরে সংবাদমাধ্যমের রুক্ষ সমালোচনা করে গণতন্ত্রের চতুর্থতম স্তম্ভটির মর্যাদা লঙ্ঘন করলেন। সে নিয়ে প্রতিবাদে শবর বাংলা জুড়ে,অথচ এই বাংলার এক সাংবাদিক চন্দ্রশেখর সরকার মিথ্যা মামলায় জেলে হাজতবাস করছে, তা নিয়ে কোনো শব্দ খরচা করেনি বাংলার সাংবাদিকরা। অন্যদিকে মহুয়া মিত্র কৃষ্ণনগরের সাংসদ দু পয়সার সাংবাদিক বলাতে। এত দূর যে, খোদ কলকাতার প্রেস ক্লাবকে , সোমবার একটি বিবৃতি দিতে হল! বিবৃতিটি হুবহু এই: ‘কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র সাংবাদিকদের সম্বন্ধে যে মন্তব্য করেছেন তাতে প্রেস ক্লাব, কলকাতা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং তীব্র প্রতিবাদ করছে। তাঁর এই মন্তব্য নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত, অপমানজনক। বাংলা বহু সাংবাদিকদের উপরে অত্যাচার অবিচার অনাচার আজ অব্যহত কিন্তু নির্বাক একশ্রেণীর সাংবাদিক মহল।এই অত্যাচার অবিচার অনাচার অব্যাহত মধ্যে আমিও নিজে পড়ি,আমার কথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  কে বহুবার লিখিত চিটি চাপাটি করে আজও কোনো উত্তর পাইনি। সূরাহ ও মেলেনি। সেই কারণে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই আজ,সাংবাদিকের কাজ কী? কোন পথে সে চলবে? এমন প্রশ্ন করা হলে সবার জবাব হবে- সাংবাদিক হচ্ছে সমাজরক্ষক।

সব অসঙ্গতি, ভুল-ভ্রান্তি প্রচার মাধ্যমে তুলে ধরে কর্তৃপক্ষের ‘চোখে আঙ্গুল দিয়ে’ দেখিয়ে দেয়ার দায়িত্ব তার। সত্যের সন্ধানে সে থাকবে নির্ভীক। সব সময় সে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অসহায়, অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। কথাগুলো শুনতে ভালই লাগে। আজকাল অনেকেই চেনাজানা পথটি হারিয়ে ফেলেছে। মূল পথ থেকে অলিগলি করে করে কেউ কেউ এখন ‘নিষিদ্ধ গলিতে’ পথ মাড়াতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করছে। সমাজ, দেশ নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অনেক লোক রয়েছে। এ নিয়ে সাংবাদিকরা মাথা না ঘামালে মহাভারত কি অশুদ্ধ হয়ে যাবে? তাই আজ সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ। পেশাদার সাংবাদিক আর অপেশাদার সাংবাদিকের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। একদল সত্যের পক্ষে, আরেকদল ‘যা খুশি তাই’ করার পক্ষে। একদল চাচ্ছেন- পেশার মর্যাদা রক্ষা করতে, অন্যদলের ‘চিন্তাভাবনার সময়’ নেই। দিনদিন বিভক্তি বাড়ছে। লেজুড়বৃত্তি করতে না পারলে অনেকের ‘ঘুম’ হয় না। তাই বর্তমান যুগে, সাংবাদিকদের প্রকারভেদ ঘটছে। তাদেরকে কখনো ‘সাংঘাতিক’; কখনো ‘হলুদ সাংবাদিক’, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড সাংবাদিক’ ‘চাঁদাবাজ সাংবাদিক’, ‘সন্ত্রাসী সাংবাদিক’; আবার কখনো ‘এমনি এমনি সাংবাদিক’, ‘কাঁচিওয়ালা সাংবাদিক’,‘ সিন্ডিকেট সাংবাদিক’, ‘ফ্লুইড মারা সাংবাদিক’, ‘বিজ্ঞাপন সাংবাদিক’, ‘রাজনৈতিক সাংবাদিক’ ‘গলাবাজ সাংবাদিক’ ‘ভাড়াটে সাংবাদিক’ ‘দালাল সাংবাদিক’ ‘ঠিকাদার সাংবাদিক’ প্রভৃতি নামে ডাকা হয়। বিভিন্ন বিশেষণে ভূষিত করা হলেও তারা ‘সাংবাদিক’- এটাই বড় কথা।

এ নিয়ে কারো খারাপ লাগা বা মনে সামান্য দুঃখবোধও জাগে না। দুঃখের বিষয় বিশ্বজোড়া সালমানের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই সাংবাদিকদের দুর্দশা আজ বেলাল। পুলিশ নিজের স্বার্থ খর্ব করার জন্য মিথ্যা মামলায় সাংবাদিকদের জেলে ভরতে দ্বিধা বোধ মনে করেন।পুলিশের সঙ্গে সহমত পোষণ এ যুক্ত রয়েছে একশ্রেণীর লেজুড়বৃত্তি সাংবাদিকরা।পুলিশের কাজ সঠিক অনুসন্ধান করে সত্য ঘটনা উদ্ঘাটন করে দোষী সাব্যস্ত করা।আজকাল অনেক সংবাদপত্র মানুষের আস্থা হারিয়েছে। আসলে ওগুলোকে পত্রিকা বলা হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় ঐ সব ‘খবরের কাগজ’। যা এখন ‘হলুদপত্র’ নামে পরিচিত। ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ এসব পত্রিকার প্রচার নেই। মানুষের কাছে পৌছে না। অন্যদিকে, দুর্নীতির এক অন্ধজগতে বসবাস করছে সাংবাদিক ‘নামধারী’ কিছু লোক। তারা সাংবাদিকতার পরিচয় ভাঙ্গিয়ে ‘সমাজের বারোটা বাজিয়ে’ যাচ্ছে। এদেরকে বলা হয় ‘হলুদ সাংবাদিক’। এদের সংখ্যা বাড়ছেই।আগে সাংবাদিকদের মানুষ শ্রদ্ধা করতো, ভালবাসতো, আপনজন হিসেবে জানতো। এখন তাদেরকে ‘ভয়’ পায়, না ঠেকলে কাছে আসতে চায় না। ‘চাঁদাবাজি করতে গিয়ে তিনজন সাংবাদিক আটক’- এ ধরনের খবরও আজকাল ছাপা হচ্ছে। আগের দিনে শুধু দারোগারা ‘মফস্বল’ যেতেন। এখন সাংবাদিকরাও যান। কোন বিষয় ভালভাবে জানার জন্য, কোন জায়গায় যাওয়াটা দোষের নয়। কিন্তু তদন্তের নামে যখন তেল দেয়া ভাত, মুরগির রান, বড় মাছের পেটি, সাথে মিষ্টান্নের আয়োজন হয়; আবার যাবার বেলা নগদ টাকা, ক্ষেতের লাউ, কুমড়ো, বেগুন, কলা, কচু’র প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় এবং সাংবাদিক তা বগলে করে বাড়িতে নিয়েও আসেন, তখনই প্রশ্ন দেখা দেয়। এজন্যই হয়তো কেউ কেউ সাংবাদিকদের ‘সাংবাদিক’ এর বদলে ‘সাংঘাতিক’ সম্মোধন করে।আমাদের মতন সাংবাদিকদের দোষ এর কারণে এসব কথা বলেন।কি বলছে সে কথা আমি তুলে ধরবো আজ আমার কলমে।আমাদের দেশে সাংবাদিকরা কতটা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারেন? ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্স ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের তালিকায় ভারতের স্থান ছিল ১৩৬ নম্বরে। ২০১৬ সালে ছিল ১৩৩ এবং তার আগের বছর ছিল আবার সেই ১৩৬ নম্বরেই। মানে সামান্যতম হেরফেরটুকু বাদ দিলে ভারতে সাহসী সাংবাদিকতার পরিসর প্রায় নেই বললেই চলে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যদি নিরাপত্তা না দেয়, তা হলে সাংবাদিকরা কী ভাবে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করবেন? সাংবাদিকরা যদি নিরপক্ষ ভাবে কাজই না করতে পারেন তা হলে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ধাঁচে প্রাভদা (যার বাংলা তর্জমা করলে হয় সত্য)এবং বর্তমান চিনের জিনহুয়া সংবাদসংস্থার মতো একটি সংস্থা খুললেই হয়। চিনে যে ৪২টি দৈনিক সংবাদপত্র রয়েছে, প্রতিটিই শাসকদলের এবং সবকটি সংবাদপত্রের খবর ও ছবির মূল উৎস হল জিনহুয়া। অন্যদিক ষাট-সত্তরের দশকে বাংলা সাংবাদিকতায় সাংবাদিকদের চেয়ে লেখকদের চাহিদা ছিল বেশি। এর প্রধান কারণ, এর আগের সময়গুলোতে বাংলা সংবাদপত্রের ভাষা ও সংবাদ পরিবেশন। বলতে গেলে অর্ধ শতাব্দী ধরেই একই বহমানতায় বইছিল বাংলা সাংবাদিকতার শৈলী। চল্লিশের দশক থেকে বাংলা সাহিত্যে যে আধুনিকতা স্পষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে বর্ণনে এবং মানুষের যাপনের বাস্তব অবস্থানকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে, তা সিনেমা, চিত্রশিল্প এবং গানে প্রভাব ফেললেও সাংবাদিকতায় তার রেশমাত্র দেখা যাচ্ছিল না। এর প্রধান কারণ, সম্ভবত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা ভিত্তিক রিপোর্টিংয়ের আকর্ষণ। চল্লিশ পঞ্চাশের বাংলা সাংবাদিকতা তাই শুধুমাত্র ঘটনাকে উপস্থাপন করার মধ্যেই সীমিত থাকত। ফলে, রিপোর্টিংয়ের  সময়ে ঘটনার অপ্রয়োজনীয় অংশ বলে কিছু গণ্য হত না। এক একটি সংবাদ কলামের পর কলাম ছাপিয়ে অন্য পৃষ্ঠাতেও ব্যপ্ত হত। ফলে ষাটের দশক থেকেই পাঠকদের অধিকাংশ সংবাদপত্রের খবরের একঘেঁয়েমি এড়াতে খবরের হেডলাইনের বেশি অন্য কিছুতে আগ্রহ বোধ করতেন না। এজন্যই বোধ হয়, রেডিও হয়ে উঠেছিল সংবাদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সঙ্গে বিনোদনের আকর্ষণ তো ছিলই।

এরপরেও  সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্ব করছে নেতা-নেত্রী পুলিশ প্রশাসন সবাই।এডমন্ড বার্কের সেই বিখ্যাত উক্তি, “(গণতন্ত্রের) তিনটি স্তম্ভ তো আছেই, কিন্তু সাংবাদিকদের আসনের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ওটাই চতুর্থ স্তম্ভ, বাকি তিনটির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।তবে এ দেশ বা এ রাজ্য কি সে কথা বোঝে? নাকি সংবিধানে দেওয়া ভাবপ্রকাশের অধিকার সত্যিই সংরক্ষিত করার ব্যবস্থা করছে রাষ্ট্রযন্ত্র? তা হলে ক’দিন আগে কলকাতা শহরের বুকে নগ্ন করে পেটানো হত না সাংবাদিককে। সবচেয়ে দুঃখের, যখন এ জন্য অভিযোগের আঙুল উঠেছে রাজ্যের শাসকদলের দিকে। তখনই দেখে যে কোন মিডিয়ার ছোট না বড় কর্পোরেট হাউস ।তারপরে শাসকদল ছোট মিডিয়ার সাংবাদিকদের কিভাবে গলা টিপে মারতে হয় তার রূপরেখা তৈরি করে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, এতে কি গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ অপমান হয় না।কলকাতার মত প্রেসক্লাব আর মুখ খুলতে রাজি থাকে না, তার উদাহরন বলি চন্দ্রশেখর সরকার নিউজ সারাদিনের অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক বলে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হওয়ার পরে কলকাতার প্রেসক্লাব কোনো বিবৃতি প্রকাশ করেনি।এটা সংবাদ মহলের কাছে দুঃস্বপ্নের বলে মনে করি আমি নিজে। অত্যান্ত দুঃখের সহিত বলি সাংবাদিক যদি না ভেদাভেদ দেখাতো একশ্রেণীর সাংবাদিকরা, তাহলে কোন ভাবে চন্দ্রশেখর এর মতো কোনো সাংবাদিকদের আজকের দিনে হাজতবাস হত না। কারণ এই ছোট সংবাদপত্র বা সংবাদমাধ্যম কোনও জনমত তৈরি করতে পারে কিনা তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে, কিন্তু সাধারণ ভাবে দৈনন্দিন ঘটনাবলি থেকে সরকারি তথ্য, সবই পাওয়া যায় সংবাদপত্রের মাধ্যমে। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিন মাধ্যম।

এই মাধ্যমে সর্বশেষ সংযোজন হল ওয়েব-মিডিয়া। তাই দেখা গিয়েছে, কোনও দেশে সামরিক অভ্যুত্থান হলে প্রথমেই সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় তারা দখল করে নেয়। এখন গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকারও হয়তো অন্য ভাবে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। মনে রাখা দরকার, অনেক সংবাদপত্রেরই আয়ের বড় অংশ আসে সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে। সংবাদমাধ্যমের উপরে অত্যাচার আজও অব্যাহত ,সে ইতিহাসে বলি।সামরিক অভ্যুত্থান না হলেও এ দেশে ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। সেই সংবাদ ‘চেপে দেওয়া’র জন্য সেই রাতে রাজধানী দিল্লির বহু সংবাদপত্রের অফিসে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল বলে তৎকালীন সময়ের সাংবাদিকদের কাছে শুনেছি। সেই সময় (এখনও) আকাশবাণী ও দূরদর্শন ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং অন্য কোনও বৈদ্যুতিন মাধ্যম ছিল না।দেশে জরুরি অবস্থা চলার সময় অনেক সাংবাদিককে কারাবাস করতে হয়েছে। নিয়মিত ‘সেন্সর’ করা হয়েছে সংবাদ ও ব্যঙ্গচিত্র। সেই সময় কে শঙ্কর পিল্লাইয়ের জনপ্রিয় কার্টুন পত্রিকা শঙ্করস উইকলিও বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিক এখন সংবাদ সংগ্রহের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। ড্যানিয়েল পার্ল, জে দে থেকে গৌরী লঙ্কেশ— নির্ভীক সাংবাদিকতাই তাঁদের অকালমৃত্যুর কারণ, এ কথা নিশ্চয়ই সকলে মানবেন। এ রাজ্যে পুরভোটেও সাংবাদিকদের হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে, অতি সাম্প্রতিক কালে নগ্ন করে প্রহার করা হল। সর্বশেষ ঘটনার কথা পুলিশে অভিযোগ আকারে জানানো হয়নি অন্তত প্রথম ২৪ ঘণ্টায়, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সে কথাই বলছে। আর পুরভোটের সময় অভিযোগ দায়ের করার চেয়ে সাংবাদিকরা গুরুত্ব দিয়েছিলেন খবর সম্প্রচার নিয়ে, যেমন ভূমিকম্পের সময় সকলে যখন প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত থাকেন, সাংবাদিকরা চালান ব্রেকিং নিউজ। বর্তমান যুগের সাংবাদিকতা থেকে পিছনের ইতিহাস যদি চলে যায় তাহলে আমরা তৎকালীন যুগের কি ঘটেছিল তা আজ এই লেখার মধ্যে বিবরণ বা বিবৃতি দিতে চাইছি।

সাংবাদিকতা ঘটনার বিবরণ প্রদান এবং তথ্য যোগান প্রথা বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অংশে প্রাচীন এবং মধ্যযুগেও সীমিতভাবে চালু ছিল। প্রাচীন ভারতে পাথর বা স্তম্ভে খোদিত শব্দাবলি তথ্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হতো। সম্রাট অশোক পাথর ও স্তম্ভে খোদিত আদেশ তাঁর সাম্রাজ্যের সর্বত্র এবং বাইরেও প্রজ্ঞাপন করেন। তিনি তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশে এবং বিদেশে গুপ্তচর নিয়োগ করেন। সুলতানি আমলে ‘বারিদ-ই-মামালিক’ বা গোয়েন্দা প্রধান কর্তৃপক্ষকে সাম্রাজ্যের তথ্য সরবরাহ করার দায়িত্ব পালন করতেন। সুলতান আলাউদ্দিন খলজির মুনহি বা গুপ্তচররা সুলতানকে অতি তুচ্ছ বিষয়সমূহও অবহিত করত। মুগল শাসনামলে সংবাদ সার্ভিস নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘ওয়াকই-নবিশ’, ‘সাওয়ানিহ-নবিশ’ এবং ‘খুফিয়ানবিশ’ চালু ছিল। এ ছাড়াও ‘হরকরা’ এবং ‘আকবর-নবিশ’ নামে সুলতানদের সাধারণ তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল।

ভাট, কথক এবং নরসুন্দর মানুষকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক খবর জানাত। কিন্তু মুগল আমলের বাংলায় সাংবাদিকতা ছিল শুরুর পর্যায়ে, প্রকৃত অর্থে সাংবাদিকতা হিসেবে বিষয়টি তখন বিকশিত হতে পারে নি।আধুনিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সাংবাদিকতার উৎপত্তি অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপে। উপনিবেশ হওয়ার কারণে এশিয়ার অন্য যে কোন দেশের আগেই বাংলা অঞ্চলে সাংবাদিকতা শুরু হয়। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত জেমস অগাস্টাস হিকি-র বেঙ্গল গেজেট প্রকাশনার মাধ্যমে বাংলায় আধুনিক সাংবাদিকতার ইতিহাস শুরু হয়। পত্রিকার বিজ্ঞাপনে উলে­খ করা হয়েছিল, সকল পক্ষের জন্য উন্মুক্ত হলেও এটি কারও দ্বারা প্রভাবিত নয় এমন একটি সাপ্তাহিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পত্রিকা। ১৮১৮ সালে বাংলা সাংবাদিকতা যাত্রা শুরু করে। সে বছর বাঙ্গাল গেজেট (কলকাতা), দিগদর্শন (কলকাতা) এবং সমাচার দর্পণ (শ্রীরামপুর) নামে তিনটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথম বাংলা সংবাদপত্র সমাচার দর্পণ শ্রীরামপুর থেকে ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান ভূখন্ড থেকে প্রথম প্রকাশিত সাপ্তাহিক রংপুর বার্তাবহ প্রকাশিত হয় রংপুর থেকে ১৮৪৭ সালে এবং ঢাকা থেকে প্রথম প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঢাকা নিউজ প্রকাশিত হয় ১৮৫৬ সালে।

ঢাকা প্রকাশ ১৮৬১ সালে এবং ঢাকা দর্পণ ১৮৬৩ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।সেই বিশ শতকের শুরুতে সাংবাদিকতা পেশা এক নতুন মোড় নেয়। জাতীয়বাদী আন্দোলন, মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থান, প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের সূচনা প্রভৃতি কারণে সংবাদপত্রসমূহের চাহিদা ও পাঠকসংখ্যা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ এবং পূর্ববাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকার উত্থান সাংবাদিকতার বিস্তারের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ভূমিকা পালন করে।এদিকে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেশ কিছু পত্রিকার মালিক-সম্পাদক দেশান্তরি হওয়ায় পূর্ববঙ্গে সংবাদপত্র প্রকাশনায় একটি শূন্যতা সৃষ্টি হয়। ঢাকায় এ সময়ে প্রকাশিত কোন দৈনিক পত্রিকার সন্ধান মেলে না। ঢাকার প্রধান পত্রিকা ছিল তখন দৈনিক আজাদ, ইত্তেহাদ এবং মর্নিং নিউজ। এগুলি প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। অবশ্য বছর দুয়েক-এর মধ্যে পত্রিকাগুলি ঢাকায় চলে আসে। পরে এখান থেকে প্রকাশিত হয় ইত্তেফাক, সংবাদ, পাকিস্তান অবজারভার (পরে বাংলাদেশ অবজারভার) প্রভৃতি পত্রিকা যা আজও দেশের প্রথম সারির দৈনিক হিসেবে প্রকাশিত হয়ে চলেছে (উল্লেখ্য জুন ২০১০ থেকে অবজারভার পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেছে)। বাংলাদেশ সরকারের ফিল্ম অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অধিদপ্তরের ১ জুলাই ২০১০ হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশিত মিডিয়া তালিকাভুক্ত পত্রপত্রিকার সংখ্যা ৪৫৭টি  [দৈনিক: ঢাকা ৯২টি, ঢাকার বাইরে (মফস্বল) ১৯২টি; সাপ্তাহিক: ঢাকা ৬৯টি, ঢাকার বাইরে ৫৫টি; পাক্ষিক: ঢাকা ১৫টি, ঢাকার বাইরে ৩টি; মাসিক: ঢাকা ২৬টি, ঢাকার বাইরে ৪টি এবং ত্রৈমাসিক: ঢাকা ১টি]। ১৯৪৭ সালে, পরে প্রথমত, পঞ্চাশের দশক, দ্বিতীয়ত, ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকার সংখ্যা এবং প্রকাশের মাত্রিকতা সাংবাদিকতা জগতের বিপুল উন্নয়নের নির্দেশক।

আরও পড়ুন ::

Back to top button