মতামত

গড়িয়া স্টেশন চত্বরে যানজটের নরকযন্ত্রণা: জনজীবন যখন স্থবির

নন্দগোপাল ত্রিপাঠি

গড়িয়া স্টেশন চত্বরে যানজটের নরকযন্ত্রণা: জনজীবন যখন স্থবির - West Bengal News 24

দক্ষিণ কলকাতার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গড়িয়া স্টেশন এলাকাটি বর্তমানে বিশৃঙ্খলা আর যানজটের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার ট্রেন, মেট্রো রেল এবং অসংখ্য বাস ও অটোরিক্সার এই মিলনস্থলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু এই বিপুল জনস্রোতকে সামাল দেওয়ার মতো পরিকাঠামোর অভাব আজ সাধারণ মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমস্যার মূলে যে কারণগুলো

গড়িয়া স্টেশনের যানজট কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনার ফল। প্রথমত, রাস্তার দুপাশ জুড়ে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য অনিয়ন্ত্রিত হকার ও দোকানপাটের ফলে ফুটপাথ আজ পথচারীদের ব্যবহারের অযোগ্য। বাধ্য হয়ে মানুষ মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, যা যানবাহনের স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করছে। দ্বিতীয়ত, অটো ও টোটোর দাপট। স্টেশনের ঠিক মুখে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত অটো এবং টোটো রাস্তার সিংহভাগ দখল করে রাখে, যার ফলে একটি বড় বাস বা অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার মতো জায়গাটুকুও অবশিষ্ট থাকে না। এছাড়া, রেল গেটের দীর্ঘক্ষণ বন্ধ থাকা এবং ট্রাফিক সিগন্যালের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

উত্তরণের পথ: কিছু জরুরি পদক্ষেপ

এই অসহনীয় ট্রাফিক জট থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনিক ও সামাজিক স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন:

  • নির্দিষ্ট টার্মিনাল জোন: স্টেশনের ঠিক মুখে অটো বা টোটো দাঁড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে স্টেশনের থেকে ৫০-১০০ মিটার দূরে নির্দিষ্ট ‘পিক-আপ ও ড্রপ’ জোন তৈরি করতে হবে।

  • হকার পুনর্বাসন ও ফুটপাথ উদ্ধার: ফুটপাথগুলোকে হকারমুক্ত করে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এতে মূল রাস্তায় যান চলাচলের জন্য অনেকখানি বাড়তি জায়গা পাওয়া যাবে।

  • ট্রাফিক পুলিশের সক্রিয়তা: শুধু সিগন্যাল দিয়ে নয়, ব্যস্ত সময়ে ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়িয়ে সরাসরি তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বাসের যত্রতত্র স্টপেজ দেওয়া বন্ধ করতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

  • উড়ালপুল বা ওভারপাস পরিকল্পনা: দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য গড়িয়া বাজার থেকে স্টেশন রোড পর্যন্ত একটি পরিকল্পিত উড়ালপুল তৈরি করা যেতে পারে, যা স্থানীয় ট্রাফিককে মূল রাস্তা থেকে আলাদা করবে।

  • রাস্তা প্রশস্তকরণ: স্টেশনের সঙ্গে সংযোগকারী রাস্তাগুলোর দুপাশে পড়ে থাকা জায়গাগুলো পরিষ্কার করে রাস্তা চওড়া করা সময়ের দাবি।

গড়িয়া স্টেশন এলাকার এই অব্যবস্থাপনা শুধু যাতায়াতের সময় নষ্ট করছে না, বরং মানুষের মানসিক চাপ এবং পরিবেশ দূষণও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা যদি একটি স্মার্ট সিটি বা আধুনিক যান চলাচল ব্যবস্থা আশা করি, তবে গড়িয়া স্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্টের এই বেহাল দশা দ্রুত সংশোধন করা প্রয়োজন। প্রশাসন, স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং সাধারণ যাত্রী—এই তিন পক্ষের সদিচ্ছাই পারে গড়িয়াকে এই শ্বাসরুদ্ধকর যানজট থেকে মুক্তি দিতে।

আরও পড়ুন ::

Back to top button