প্রযুক্তি

‘ডিলিট’ করলেই অনলাইন থেকে মুছে যায় কমেন্ট, ছবি, পোস্ট! সত্যিই?

‘ডিলিট’ করলেই অনলাইন থেকে মুছে যায় কমেন্ট, ছবি, পোস্ট! সত্যিই?

পোস্ট করেছিলেন ফেইসবুকে, পাঁচ মিনিট পর ‘ডিলিট’ করে দিলেন। অনেকেই সম্ভবত মনে করেন, এভাবে যখন ইচ্ছা তখন একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে নিজের পোস্ট, মেসেজ এবং ব্যক্তিগত ডেটা মুছে দিলেই চিরতরে ‘নেই’ হয়ে গেল সেটি।

কিন্তু আসলেই কি তাই?

এ ভরসায় বড় একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে টুইটারের সাবেক নিরাপত্তা প্রধানের সাম্প্রতিক এক সাক্ষ্য।

মঙ্গলবার মার্কিন সিনেট কমিটিতে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন পিটার জাটকো, টুইটারের সাবেক নিরপত্তা প্রধান। গ্রাহক চাইলেই সব ডেটা মুছে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো দিয়ে থাকে, সেটির বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকখানি হারিয়েছে সেদিন জাটকো মুখ খোলার পর।

সাবেক এই নিরাপত্তা প্রধানের দাবি, সেবাগ্রাহক অ্যাকাউন্ট মুছে দিলেও সামাজিক মাধ্যমটি সবসময় ওই ব্যক্তির ডেটা মুছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি তো রাখেই না, ক্ষেত্রবিশেষে ডেটার খোঁজই থাকে না প্ল্যাটফর্মের কাছে।

ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্ট মুছে দিলে তারপর ওই ব্যক্তির সব ডেটা মুছে দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কার্যপ্রণালী শুরু করা হয় বলে সিএনএনকে আগেই বলেছিল টুইটার। কিন্তু কোম্পানিটি সেই প্রক্রিয়া আদৌও শেষ করে কি না সে প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেনি হালের এ আলোচিত মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্ম।

টুইটারের বিরুদ্ধে পিটার জাটকোর সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো সামাজিক মাধ্যম কেন্দ্রীক প্রযুক্তি খাতকে ঘিরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অনলাইনে ব্যক্তিগত ডেটার ওপর সেবাগ্রাহকের নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে কলম্বিয়া বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক এবং সামাজিক মাধ্যম গবেষক স্যান্ড্রা ম্যাটজ-এর মত, “বিষয়টি শুনতে খুবই সোজা শোনায়; কিন্ত ‍আপনি অনলাইনে যা কিছুই তোলেন না কেন, সেটি আবার ‘প্রাইভেট’ হওয়ার কোনো প্রত্যাশা কখনোই রাখবেন না।”

‘ডিলিট’ করলেই অনলাইন থেকে মুছে যায় কমেন্ট, ছবি, পোস্ট! সত্যিই?

“ইন্টারনেট থেকে কিছু সরিয়ে নেওয়া, ‘রিসেট’ বাটন চাপা – প্রায় অসম্ভব।”– যোগ করেন তিনি।

বেশ কয়েক মাস ধরেই ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডেটার নিরাপত্তা এবং সেই ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রযুক্তি খাতে।

জুলাই মাসে ব্যবহারকারীর ডেটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটা প্ল্যাটফর্মস ইনকর্পোরেটেড। যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মেসেঞ্জোর অ্যাপের আলাপচারিতার ভিত্তিতে এক মা এবং তার কিশোরী মেয়ের বিরুদ্ধে ‘বেআইনি’ গর্ভপাতে অভিযোগপত্র দাখিল করায় আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সামাজিক মাধ্যমগুলো গ্রাহকের ডেটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দেয় তার কার্যকারীতা।

আরও পড়ুন :: ফেসবুকে কেউ ব্লক করলে কীভাবে বুঝবেন?

নেব্রাস্কার পুলিশ মুছে দেওয়া ডেটা পুনরুদ্ধার করে তার ভিত্তিতে মা-মেয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে– এমন কোনো ইঙ্গিত মেলেনি বলে জানিয়েছে সিএনএন। তবে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বিষয়টি ‘অসম্ভব কিছু ‍নয়’ বলে জানিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তা গবেষক রাভি সেন।

টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির এ অধ্যাপকের মতে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আরও অনেকেই ‘যথেষ্ট সহযোগিতা পেলে, সঠিক টুল ব্যবহারের সুযোগ আর সক্ষমতা থাকলে’ মুছে দেওয়া ডেটাও পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

সেনের মতে, সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই জানেন না তাদের ডেটা কোথায় কোথায় সংরক্ষণ করা হয়। যে কোনো পোস্ট, সেটি ইমেইল হোক, সামাজিক মাধ্যমে কমেন্ট হোক অথবা সরাসরি পাঠানো মেসেজ হোক না কেন, অন্তত তিন জায়গায় জমা হয় সেই তথ্য।

প্রেরক আর প্রাপকের ডিভাইস বাদেও সেই ডেটা জমা থাকে সেবাদাতার নিজস্ব সার্ভারে। একটি আদর্শ দৃশ্যপটে ‘যে ব্যক্তি মূল কনটেন্ট সৃষ্টি করেছেন’ তিনি ওই কনটেন্ট মুছে দেওয়ার চেষ্টা করলে একই সঙ্গে তিন জায়গা থেকেই ওই কনটেন্ট মুছে যাওয়া উচিত।

কিন্তু সেন বলছেন, “কার্যত সেটা হয় না।”

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো গ্রাহকের চাহিদার ভিত্তিতে ডেটা মুছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকলেও কাজের বেলায় সেই প্রতিশ্রুতি রাখে না বলে জানিয়েছেন সেন। ব্যবহারকারী কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে সার্ভার থেকে ডেটা মুছে দিতে বললেও কোম্পানিগুলো তা সবসময় আমলে নেয় না– এমন ধারণার কথা বলেছে সিএনএন।

তবে, সময় যতো যেতে থাকে, ব্যবহারকারীর ডিভাইস থেকে মুছে দেওয়া ডেটা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা ততো কমতে থাকে বলেও জানিয়েছেন সেন।

এক্ষেত্রে অনলাইনে নিজের ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার একটি উপায় হিসেবে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন সেবা দেয় এমন অ্যাপ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন গোপনতা বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এনক্রিপ্টেড সেবার অধীনে থাকা ব্যক্তিগত ডেটায় যেন অন্য কোনো উৎস থেকে অনধিকার প্রবেশের রাস্তা খোলা না থাকে, সেটি নিশ্চিত করতে নিজের ক্লাউড ব্যাকআপ সেটিংসের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে এতো সাবধানতা অবলম্বনের পরও অনলাইনে একবার কিছু তুলে দিলে, স্যান্ড্রা ম্যাটজের মতে, ‘আপনি আসলে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালেন’।

“কারণ, ফেইসবুক যদি মুছেও দেয়, টুইটারও যদি পোস্ট মুছে দেয়, তার আগেই আপনি অনলাইনে যে ছবিটি পোস্ট করেছেন তা কপি করে রাখার সুযোগ পাবে কেউ কেউ”– যোগ করেন তিনি।

বিগ টেক খ্যাত প্রথমসারির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্ল্যাটফর্মে কোনো তথ্য-উপাত্ত শেয়ার করার ক্ষেত্রে সাধারণ ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ম্যাটজ। এই অধ্যাপকের বক্তব্য হতাশাবাদী মনে হলেও অনলাইনে একটু বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করাই শ্রেয় বলে মনে করেন তিনি।

“ধরেই নিন, আপনি অনলাইনে যাই তোলেন না কেন, সেটি যে কেউ ব্যবহার করতে পারবেন এবং সেটি অনলাইনে চিরস্থায়ী হিসেবে থাকবে”– বলেন তিনি।

আরও পড়ুন ::

Back to top button