ঝাড়গ্রাম

শান্তিপূর্ণ জঙ্গলমহলে রেকর্ড ভোটদান, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারিতেই দিনভর চলল গণতন্ত্রের উৎসব

স্বপ্নীল মজুমদার

শান্তিপূর্ণ জঙ্গলমহলে রেকর্ড ভোটদান, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারিতেই দিনভর চলল গণতন্ত্রের উৎসব - West Bengal News 24

তপ্ত দুপুরের দাবদাহ উপেক্ষা করে ফের একবার রেকর্ড ভোটদানের সাক্ষী থাকল জঙ্গলমহল। বৃহস্পতিবার ঝাড়গ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিভিন্ন বুথে সকাল থেকেই চোখে পড়ল দীর্ঘ লাইন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটদানের হার প্রায় ৯০.৫৩ শতাংশ। কোথাও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আর সরকারি প্রকল্পের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব, আবার কোথাও কর্মসংস্থানের অভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের দীর্ঘশ্বাস— এই দুইয়ের মাঝেই ঝাড়গ্রামের ভোটাররা প্রয়োগ করলেন নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার।

সকাল থেকেই বুড়িঝোর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারা। বুথ নম্বর ৩৪-এ দু’ঘণ্টার মধ্যেই ভোট পড়েছিল প্রায় ১২ শতাংশ। তৃণমূলের বুথ ক্যাম্পে যখন মুড়ি-ছোলা ভাজার আড্ডা জমেছে, ঠিক তখনই পাড়ায় পাড়ায় ঘুরেছে বিপরীত রাজনৈতিক বয়ান। শুশনিজোবির বাসিন্দা প্রমিলা সিং সরাসরিই জানালেন, “দু-একদিন প্রচার হয়েছে ঠিকই, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাই কিন্তু বার্ধক্য ভাতা এখনও জোটেনি।” একই সুর শোনা গেল কাঁকড়াঝোর গ্রামের বৃদ্ধা পার্বতী বালার গলায়। ঝড়ে ভেঙে যাওয়া ঘর কিংবা বিধবা ভাতার আক্ষেপ নিয়ে বালতি ভর্তি খিঁচুড়ি হাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে তিনি বলেন, “না বাড়ি পেয়েছি, না ভাতা। স্বামীর মৃত্যুর দু’বছর পরেও বিধবা ভাতার কার্ডটাও হল না।”

আরও পড়ুন :: ভোট-শেষে কষা মাংস, খিঁচুড়ির পাতে পরিযায়ী যন্ত্রণার কথা শোনাল জঙ্গলমহল

জঙ্গলমহলের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল পরিযায়ী শ্রমিকদের বেদনা। কাঁকড়াঝোর বুথ এলাকায় দেখা মিলল কৃষ্ণচন্দ্র সিং, সোমনাথ মুরা কিংবা বাবুল লাল মুরাদের মতো যুবকদের, যারা গুজরাট, ব্যাঙ্গালোর কিংবা কর্নাটকের মতো রাজ্যে কাজ করে সংসার চালান। তাঁদের সাফ কথা, “এলাকায় কোনো কাজ নেই, বছরের পর বছর বাইরে পড়ে থাকতে হয়। রাজ্যে কাজের সংস্থান যাতে হয়, সেই লক্ষ্যেই আমাদের ভোট।” একই সুর স্পষ্ট শোনা গেল গড়শালবনীর প্রভাস মাহাতোর কথাতেও।

ভোটের নিরাপত্তায় এবার নজিরবিহীন কড়াকড়ি দেখা গিয়েছে জঙ্গলমহল জুড়ে। কোথাও হাফ সেকশন, কোথাও ফুল সেকশন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা বুথ সামলেছেন। কানিমহুলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিএসএফ জওয়ানদের অতি-সক্রিয়তায় সংবাদমাধ্যমের প্রবেশেও বাধার সৃষ্টি হয়। তবে বিপরীত চিত্র লালগড়ের নেতাই হাইস্কুলের সামনে। ১০০ মিটারের মধ্যেই ‘জয় বিজেপি’ স্লোগান তুলছে একদল যুবক। তবে নিয়ম-শৃঙ্খলার এই কড়াকড়িকে সাধুবাদ জানিয়েছেন গড়শালবনী এলাকার বিএলও বিশ্বনাথ মাহাতো। তিনি বলেন, “আগেও ভোট করেছি, কিন্তু শৃঙ্খলার এমন কড়াকড়ি আগে দেখিনি। শান্তিপূর্ণভাবে সব মিটেছে।”

দিনশেষে রাজনৈতিক তরজা অবশ্য থামেনি। বিজেপি জেলা সভাপতি তুফান মাহাতোর দাবি, “কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারিতেই এই শান্তিপূর্ণ ভোট সম্ভব হয়েছে।” অন্যদিকে, তৃণমূলের জেলা সভাপতি দুলাল মুর্মু জানান, “কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতি-সক্রিয়তা থাকলেও মানুষ উৎসবের মেজাজেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে ভোট দিয়েছেন।” বামফ্রন্ট জেলা সম্পাদক প্রদীপ সরকারের মতে, রেকর্ড ভোটদানের এই হার আসলে পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত। জঙ্গলমহলের অমীমাংসিত সমীকরণ আপাতত বন্দী ইভিএমে। অরণ্যসুন্দরী কার কপালে জয়ের তিলক এঁকে দেবে, তা এখন ৪ঠা মের অপেক্ষায়।

আরও পড়ুন ::

Back to top button