খুলনায় কবিগুরুর ম্যুরালে কালি! “তিতুমীরের বাংলায় রবীন্দ্রনাথের স্থান নেই” লিখে চরম ঔদ্ধত্য, উত্তাল বাংলাদেশ
ওয়েবডেস্ক

বাংলাদেশের খুলনায় রেলস্টেশনের দেওয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি কালিতে বিকৃত করে পাশে আপত্তিকর পোস্টার লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। শনিবার থেকে প্রতিকৃতিটি নতুন করে আঁকার কাজও শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের খুলনায় ফের বিতর্কের কেন্দ্রে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। খুলনা রেলস্টেশনের দেওয়ালে আঁকা তাঁর প্রতিকৃতিতে কালো কালি মাখিয়ে বিকৃত করার ঘটনা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সেখানে রবীন্দ্রনাথকে মুসলিম ও পূর্ববঙ্গ-বিরোধী বলে দাবি করে তাঁর স্থান নেই—এমন বক্তব্য লেখা পোস্টার লাগানো হয়েছিল।
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের নজরে আসে। রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিটি বিকৃত করার ঘটনায় সাংস্কৃতিক মহলে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। অন্যদিকে, শনিবার দুপুর থেকে খুলনা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রতিকৃতিটি পুনরায় আঁকার কাজ শুরু হয়েছে।
কোথায় ঘটেছে রবীন্দ্রনাথের ম্যুরাল বিকৃতির ঘটনা?
খুলনা রেলস্টেশনের সীমানা-দেওয়ালে, পুরোনো যশোর রোড ও শিববাড়ি মোড় সংলগ্ন এলাকায় এই ম্যুরাল আঁকা হয়েছিল। খুলনা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শহরের সৌন্দর্যায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেওয়ালচিত্রগুলি তৈরি করা হয়।
দেওয়ালটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাশাপাশি ফকির লালন শাহ, চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতিকৃতিও রয়েছে। তবে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্য প্রতিকৃতিগুলি অক্ষত থাকলেও শুধু রবীন্দ্রনাথের ছবিটিই কালিতে বিকৃত করা হয়েছে।
দেওয়ালচিত্রগুলিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থান, সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং পাটশিল্পের ছবিও স্থান পেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরকে সামনে রেখে এই সৌন্দর্যায়ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
পোস্টারে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কী লেখা হয়েছিল?
রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতির পাশে দুটি পোস্টার লাগানো হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি পোস্টারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা শীর্ষক বক্তব্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে মুসলিম ও পূর্ববঙ্গ-বিরোধী বলে দাবি করা হয়।
পোস্টারে লেখা বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, তিতুমীরের বাংলায় মুসলিম ও পূর্ববঙ্গ-বিরোধী রবীন্দ্রনাথের স্থান নেই এবং ভারতকে মহিমান্বিত করা চলবে না।
পোস্টারের এই বক্তব্য সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ ও রাজনৈতিক-আদর্শিক অবস্থান; রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে তা গ্রহণ করা যায় না।
কী বলছে পুলিশ?
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসেন জানিয়েছেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। তবে কারা প্রতিকৃতিটি বিকৃত করেছে, তা এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার রাস্তার বিপরীত দিকের দোকানগুলি বন্ধ থাকায় ঘটনাটি কখন এবং কারা ঘটিয়েছে, তা শনাক্ত করতে অসুবিধা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এখনও পর্যন্ত কোনও ব্যক্তিকে এই ঘটনার জন্য দায়ী বলে আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়নি। ফলে তদন্তের আগে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ক্ষোভ খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের
ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের প্রতিকৃতি শিশু-কিশোরদের মধ্যে মুক্তচিন্তার বিকাশে ভূমিকা রাখে। সেগুলি বিকৃত করার মাধ্যমে অভিযুক্তরা সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তিনি প্রতিকৃতিটি পুনরায় আঁকার উদ্যোগের কথা জানান। তাঁর মতে, কোনও প্রতিকৃতি মুছে দিয়ে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না।
প্রথম আলো ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার থেকেই রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি পুনরায় আঁকার কাজ শুরু হয়েছে। দেওয়ালে লাগানো পোস্টারগুলি সরিয়ে নেওয়ার পর শিল্পী নতুন করে ছবি আঁকছেন।
সাংস্কৃতিক মহলে প্রতিবাদ
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মী এবং ‘নাট্যলোক’-এর সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম সেলিম ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, এর আগে ঢাকাতেও রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছিল।
তবে তাঁর এই বক্তব্য একটি সাংস্কৃতিক কর্মীর অভিযোগ ও মূল্যায়ন। খুলনার ঘটনার সঙ্গে কোনও সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনও তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
ঢাকাতেও হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে হামলা
খুলনার ঘটনার আগে গত ১০ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের একটি গ্রাফিতি কালিতে বিকৃত করার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় চারজনকে আটক করার কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
ঢাকা ও খুলনার ঘটনাগুলির মধ্যে কোনও সাংগঠনিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে পরপর এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান এবং শিল্প-সাহিত্যকে ঘিরে মতাদর্শগত বিতর্ককে ফের সামনে এনেছে।
এখন নজর পুলিশের তদন্তে। কারা খুলনায় রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি বিকৃত করেছে, কী উদ্দেশ্যে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে এবং এর সঙ্গে কোনও সংগঠিত গোষ্ঠীর যোগ রয়েছে কি না—সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
FAQ
১. বাংলাদেশের কোথায় রবীন্দ্রনাথের ম্যুরাল বিকৃত করা হয়েছে?
বাংলাদেশের খুলনা রেলস্টেশনের সীমানা-দেওয়ালে, পুরোনো যশোর রোড ও শিববাড়ি মোড় সংলগ্ন এলাকায়।
২. রবীন্দ্রনাথের ম্যুরাল বিকৃতির ঘটনা কবে ঘটে?
৬ নভেম্বর ২০২৬, শুক্রবার ঘটনাটি সামনে আসে।
৩. রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কীভাবে হামলা করা হয়েছিল?
প্রতিকৃতিতে কালো কালি মাখিয়ে বিকৃত করা হয়। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য লেখা পোস্টার লাগানো হয়েছিল।
৪. এই ঘটনায় কি কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?
খুলনার ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার খবর এখনও পাওয়া যায়নি। পুলিশ তদন্ত করছে।
৫. রবীন্দ্রনাথের ম্যুরাল কি পুনরায় আঁকা হচ্ছে?
হ্যাঁ। ৭ নভেম্বর শনিবার থেকে খুলনা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে প্রতিকৃতিটি পুনরায় আঁকার কাজ শুরু হয়েছে।



