
কালীঘাটের অন্দরে তোলপাড়! তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সংগঠনে একের পর এক রদবদল ঘিরে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দু’মাস কাটতে না কাটতেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত বিশ্বস্ত বলে পরিচিত চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য রাজ্য সভানেত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। আর এই আকস্মিক পদত্যাগের পরই আসরে নেমেছেন স্বয়ং তৃণমূল সুপ্রিমো। শনিবার বিকেলে ফেসবুক লাইভ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন— চন্দ্রিমার বিদায়ের পর এবার থেকে রাজ্য সংগঠনের রাশ নিজের হাতেই নিচ্ছেন তিনি। একই সাথে সংগঠনকে চাঙ্গা করতে কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র এবং বেলেঘাটার কুণাল ঘোষকে দলের নতুন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক পদে আনা হয়েছে।
কেন হঠাৎ ইস্তফা দিলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য? নেপথ্যের আসল কারণ
তৃণমূলের অন্দরের খবর, শুক্রবার মেট্রোপলিটনে তৃণমূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্যে কার্যত দখল করে নেয় এবং সেখানে বড়সড় তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় নিয়ম অনুযায়ী সেখানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল তৎকালীন রাজ্য সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, কার্যালয় দখলের সময় তাঁকে কোনো প্রতিরোধ গড়তে দেখা যায়নি।
উল্টোদিকে, এই খবর পাওয়া মাত্রই ঘটনাস্থলে ছুটে যান কুণাল ঘোষ ও মদন মিত্র। তাঁরা রাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন এবং প্রগতি ময়দান থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। গোটা বিষয়টি জানার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের কাছে জবাবদিহি চান এবং তাঁর ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দলনেত্রীর এই কড়া মনোভাবের পর ‘অভিমানে’ শনিবার তৃণমূলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দেন চন্দ্রিমা। এমনকি দুপুরে বিধানসভায় গিয়ে ঋতব্রতদের সাথে বৈঠকও করেন তিনি।
“আপাতত আমার কাজ নেই, সারাদিন দলটাই দেখব” – হুঙ্কার মমতার
চন্দ্রিমার পদত্যাগের পর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে কালীঘাটের দলীয় কার্যালয় থেকে ফেসবুক লাইভে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অত্যন্ত কড়া ভাষায় বার্তা দিয়ে তিনি বলেন:
‘‘কে ছেড়ে গেল, তাতে কিছু যায় আসে না। আমি নেতা চাই না, সাধারণ কর্মী চাই। দলের রাজ্য সংগঠনটাও এখন আমি চালাব। আপাতত আমার কাজ নেই। সারাদিন দলটাই দেখব। এমনি আমি রোজ এই পার্টি অফিসে বসি, কর্মীদের সঙ্গে দেখা করি। এবার থেকে আরও বেশি সময় দেব।”
দলনেত্রীর এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, আসন্ন দিনগুলিতে তিনি নিজেই দলের প্রতিটি ছোট-বড় সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের দেখভাল করবেন।
দুই বিশ্বস্ত সেনাপতি: গুরুদায়িত্বে মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষ
সংগঠন চালানোর সুবিধার্থে এবং মমতাকে সরাসরি সাহায্য করার জন্য দলে বড় পদ দেওয়া হয়েছে দুই হেভিওয়েট নেতাকে।
মদন মিত্র: কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র বর্তমানে দমদম সাংগঠনিক জেলার সভাপতি। এবার তাঁর কাঁধে চাপল রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের অতিরিক্ত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কুণাল ঘোষ: বেলেঘাটার এই প্রভাবশালী নেতাকেও রাজ্য সাধারণ সম্পাদক পদে আনা হয়েছে। শুক্রবার রাতের লড়াকু ভূমিকার পুরস্কার হিসেবেই এই পদোন্নতি বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
রাজ্য রাজনীতিতে এই বদলের প্রভাব কী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতো একনিষ্ঠ নেত্রীর ইস্তফা এবং ঋতব্রতদের সাথে তাঁর বৈঠক তৃণমূলের অন্দরে নতুন সমীকরণের জন্ম দিল। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সংগঠনের হাল ধরায় দলের নিচু তলার কর্মীদের মনোবল অনেকটাই বাড়বে। মদন মিত্র ও কুণাল ঘোষের মতো ‘অ্যাক্টিভ’ নেতাদের সামনে নিয়ে এসে মমতা স্পষ্ট করে দিলেন যে, আগামী দিনে দলে আনুগত্য ও লড়াইয়ের ময়দানে উপস্থিতির ওপরেই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হবে।



