
সরকারি প্রকল্পের ফর্ম পূরণ করা নিয়ে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ যে এমন ভয়ঙ্কর রূপ নেবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি কেউ। বাঁকুড়ার সোনামুখী থানার আলমপুর গ্রামে ঘটে গেল এক শিউরে ওঠার মতো ঘটনা। অন্নপূর্ণা যোজনার (Annapurna Yojna) ফর্ম পূরণের জন্য স্বামীর কাছে প্রয়োজনীয় নথি চেয়েছিলেন স্ত্রী। আর সেই নথি না দেওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বচসা শেষ হলো রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিতে। ৯ বছরের শিশু সন্তানের চোখের সামনেই স্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করলেন স্বামী। এরপর নিজেও গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মঘাতী হন। এই ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত গৃহবধূর নাম অম্বিকা দাস (৩০) এবং তাঁর স্বামী মানস দাস (৪৪)। বাঁকুড়ার সোনামুখী থানার ডিহিপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তাঁরা। রবিবার গভীর রাতে হঠাৎই পারিবারিক অশান্তি চরম রূপ নেয়। অভিযোগ, মানস দাস বাড়িতে থাকা মাংস কাটার ধারালো অস্ত্র নিয়ে স্ত্রী অম্বিকার ওপর চড়াও হন এবং এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করেন।
আরও পড়ুন :: ইসকন থেকে আচমকা ছাঁটাই রাধারমণ দাস! ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে মানেকা গান্ধী, কোন ৬ ‘ভুলে’ মিলল চরম শাস্তি?
রক্তাক্ত অবস্থায় মাকে বাঁচাতে ছুটে যায় তাঁদের ৯ বছরের নাবালক সন্তান। কিন্তু বাবার রাগের হাত থেকে মাকে বাঁচাতে গিয়ে সে নিজেও জখম হয়। চোখের সামনে এই নৃশংসতা দেখে ভয় পেয়ে শিশুটি বাড়ি থেকে ছুটে গিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের খবর দেয়। আত্মীয়রা এসে অম্বিকাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। খবর দেওয়া হয় পুলিশে, তবে পুলিশ পৌঁছনোর আগেই মানস ঘরের ভেতর গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম পূরণ। সম্প্রতি এই সরকারি প্রকল্পের ফর্ম তোলার পর তা জমা দেওয়ার জন্য স্বামীর কাছে কিছু জরুরি নথিপত্র (Documents) চেয়েছিলেন অম্বিকা। কিন্তু মানস সেই নথি দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। এই নিয়ে গত ৪-৫ দিন ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ ও অশান্তি চলছিল।
মৃতার এক আত্মীয় কল্পনা বাগ জানান: “অম্বিকা ফর্ম পূরণের জন্য স্বামীর কাছে কিছু জরুরি নথি চাইছিল। কিন্তু মানস তা দিচ্ছিল না। তা নিয়েই কয়েকদিন ধরে বাড়িতে তুমুল অশান্তি চলছিল।”
🧠 মানসিক অবসাদ নাকি দীর্ঘদিনের সন্দেহ? আসল কারণ কী?
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, এই দম্পতির মধ্যে অশান্তি শুধুমাত্র নথিপত্র কেন্দ্রিক ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস।
মানসিক অসুস্থতা: মানসের দাদা সঞ্জয় দাস এবং আত্মীয় বিভাষ মণ্ডল জানিয়েছেন, মানস দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। দুর্গাপুরে তাঁর মানসিক চিকিৎসাও চলছিল।
পারস্পরিক সন্দেহ: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একে অপরকে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল, যা তাঁদের সম্পর্ককে আরও বিষিয়ে তুলেছিল।
পরিবারের দাবি, মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জেরেই অন্নপূর্ণা যোজনার নথি চাওয়ার বিষয়টি অনুঘটক (Trigger) হিসেবে কাজ করেছে।
ঘটনার খবর পেয়েই দ্রুত সোনামুখী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ঘর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় অম্বিকার দেহ এবং ঝুলন্ত অবস্থায় মানসের দেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ দুটি দেহই ময়নাতদন্তের জন্য বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
বিষ্ণুপুরের এসডিপিও (SDPO) অঞ্জলি সুগা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন: “প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক অশান্তির বিষয়টিই সামনে আসছে। লিখিত অভিযোগে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ ও পারস্পরিক সন্দেহের কথা উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যরা মানসের মানসিক চিকিৎসার কাগজও দেখিয়েছেন। পুলিশ পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।”
এই ঘটনায় মা-বাবা দুজনকে হারিয়ে সম্পূর্ণ ট্রমাটাইজড (Traumatized) দম্পতির ৯ বছরের সন্তান। গোটা গ্রামজুড়ে এখন শুধুই শোক ও আতঙ্কের ছায়া।



