
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সম্মান, কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নয় ‘নতুন তৃণমূল’-এর আত্মপ্রকাশের পর থেকেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর অনুগামী বিধায়কেরা। তাঁদের বক্তব্য, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি নেত্রী হিসাবে আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। আমরা চাই নেত্রী আমাদের পরামর্শ দিন। ওঁর পরামর্শ পেলে আমরা ভালো কাজ করতে পারব। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৃণমূল পরিষদীয় দলের কোনও সম্পর্ক নেই।”
আসলে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর থেকেই দলের অন্দরে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বিধায়কদের প্রথম বৈঠকের পর থেকেই ঋতব্রতদের শিবির স্পষ্ট করে দেয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলনেত্রী হিসেবে মানতে তাঁদের আপত্তি নেই। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতৃত্বের কেন্দ্রে মেনে নিতে তাঁরা রাজি নন। এরপর ধাপে ধাপে দলীয় স্তরের বহু নেতা প্রকাশ্যে অভিষেকের সমালোচনা শুরু করেন। তাঁদের অভিযোগ, দলের ভরাডুবির অন্যতম কারণ অভিষেকের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সেই অসন্তোষকেই মূল শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপনদের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিধায়ককে এক ছাতার তলায় আনা সম্ভব হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে ‘নতুন তৃণমূল’। স্পিকারের স্বীকৃতি পেয়ে পরিষদীয় দলের মর্যাদাও লাভ করে এই গোষ্ঠী। একই সঙ্গে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন :: ধামাকা ঘোষণা! বদলে গেল ‘মা ক্যান্টিন’-এর নাম, এবার মাত্র ৫ টাকায় সপ্তাহে ২ দিন মাছ ও ২ দিন ডিম!
নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পরও ঋতব্রত স্পষ্ট করে জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ও সম্মান অটুট রয়েছে। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিষয়ে তাঁদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর কথায়, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের কোনও সম্পর্ক নেই। জনগণেরও কোনও সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক থাকলে ২৬ দিন লুকিয়ে থাকতেন না। চোরের মতো মার খেতেন না।”
ঋতব্রতদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে স্পষ্ট, অভিষেকের নেতৃত্বে তাঁরা কোনওভাবেই নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে রাজি নন। তবে একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতেও চাইছেন না। বরং তাঁকে পরামর্শদাতার ভূমিকায় দেখতে আগ্রহী। নতুন শিবিরের দাবি, ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত কোনও একক ব্যক্তির হাতে থাকবে না; সম্মিলিত নেতৃত্বের মাধ্যমেই রাজনৈতিক দিশা নির্ধারণ করা হবে।
এখানেই বড় প্রশ্ন উঠছে যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁরা এখনও নেত্রী হিসেবে মেনে নেন, তাহলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণ কী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এর পিছনে রয়েছে সুস্পষ্ট কৌশল। বিদ্রোহী শিবিরের বহু সদস্য এখনও মমতার প্রতি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্মান বজায় রেখেছেন। কিন্তু অভিষেকের দ্রুত উত্থান এবং দল পরিচালনার ধরন নিয়ে তাঁদের আপত্তি দীর্ঘদিনের।
তাঁদের অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নেত্রীর ঘনিষ্ঠতার জোরে দলের উপর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ফলে এখন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চলছে, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কার্যত দুই পক্ষের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হতে পারে। একদিকে তাঁর ভাইপো অভিষেক, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের দলীয় সহকর্মীদের একাংশ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি মমতা অভিষেকের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান, তাহলে বিদ্রোহী শিবির সেই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে। আবার উল্টোভাবে যদি তিনি বিদ্রোহীদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল হন, তাহলে অভিষেকের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে এবং দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এই দুইয়ের মধ্যে কী অবস্থান নেন তিনি, সেটাই এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম বড় প্রশ্ন। তিনি কি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখবেন, নাকি সরাসরি এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করবেন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



