আন্তর্জাতিক

কে এই ‘বালোচিস্তানের সিংহী’ মাহরাং বালোচ? যার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে জ্বলছে পুরো প্রদেশ!

ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

কে এই ‘বালোচিস্তানের সিংহী’ মাহরাং বালোচ? যার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে জ্বলছে পুরো প্রদেশ! - West Bengal News 24
Mahrang Baloch

পাকিস্তানের সবচেয়ে অশান্ত ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর প্রদেশ বালোচিস্তান আবারও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এবার নেপথ্যে এক আদালতের রায়। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী এবং ‘বালোচিস্তানের সিংহী’ নামে পরিচিত ডাঃ মাহরাং বালোচকে ( Mahrang Baloch ) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে কোয়েটার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত। এই রায় ঘোষণার পর থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা বালোচিস্তান। দফায় দফায় সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ এবং সর্বাত্মক শাটডাউনে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন পাকিস্তানের এই রক্তাক্ত প্রদেশের দিকে।

⚖️ কেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলো মাহরাং বালোচকে?

বালোচ ইয়াকজেহতি কমিটির (BYC) অন্যতম শীর্ষ নেতা ডাঃ মাহরাং বালোচ। আদালতের দাবি, বালোচিস্তানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার পেছনে হাত রয়েছে তাঁর।

  • সহকর্মীদেরও সাজা: কেবল মাহরাং নন, তাঁর দুই ঘনিষ্ঠ সহকর্মী সিবঘাতুল্লাহ বালোচ এবং বালোচ কাদিরকেও সমপরিমাণ অর্থাৎ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

  • মামলার প্রেক্ষাপট: বালোচ ইয়াকজেহতি কমিটির একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ফ্রন্টিয়ার কোরের (FC) এক কর্মকর্তার মৃত্যু হয়। সেই ঘটনায় দায়ের করা মামলাতেই আদালত এই কঠোর রায় শোনাল।

আন্দোলনকারীদের দাবি: বালোচ ইয়াকজেহতি কমিটির অভিযোগ, এই রায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বালোচদের কণ্ঠরোধ করার একটি নোংরা চেষ্টা। মামলার নথিপত্রে অসংখ্য অসঙ্গতি রয়েছে দাবি করে তারা আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে গণআন্দোলনের ডাক দিয়েছে।

🚫 দফায় দফায় সংঘর্ষ ও শাটডাউন: অচল বালোচিস্তান

আদালতের এই বিতর্কিত রায়ের পর বালোচিস্তানের প্রধান প্রধান শহর ও জেলাগুলোতে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

  • সব দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ: বালোচ ইউনিটি কমিটি এবং ইয়াকজেহতি কমিটির ডাকে সাড়া দিয়ে ব্যবসায়ী, দোকানদার ও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাটডাউনে শামিল হয়েছেন।

  • পরিবহন ব্যবস্থা স্তব্ধ: মহাসড়কগুলো অবরোধ করার ফলে প্রদেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

  • নিরাপত্তা জোরদার: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোয়েটাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে বিপুল সংখ্যক আধাসামরিক বাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

🧬 কে এই ডাঃ মাহরাং বালোচ? কেন তাঁকে বলা হয় ‘বালোচিস্তানের সিংহী’?

পেশায় একজন চিকিৎসক হলেও ডাঃ মাহরাং বালোচ আজ বালোচিস্তানের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মুখ। বছরের পর বছর ধরে বালোচ জনগণের ওপর চলা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি আপসহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

১. ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ও লড়াইয়ের শুরু

২০০৯ সালে, যখন মাহরাংয়ের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর, তখন তাঁর বাবাকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া (Enforced Disappearance) হয়। পরে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এখানেই শেষ নয়, ২০১৬ সালে তাঁর ভাই নাসির বালোচকেও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা অপহরণ করে। কিন্তু দমে যাননি মাহরাং। তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘস্থায়ী গণবিক্ষোভের মুখে প্রশাসন তাঁর ভাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

২. আন্তর্জাতিক স্তরে বালোচদের কণ্ঠস্বর

নিখোঁজ ব্যক্তি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার বেসামরিক নাগরিকদের পক্ষে মাহরাং-এর শান্তিপূর্ণ লং মার্চ ও আন্দোলন বিশ্বমঞ্চের নজর কেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও তাঁর সাহসিকতার প্রশংসা করেছে।

ভূ-রাজনীতি ও বালোচিস্তানের অশান্তির আসল কারণ

বালোচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও এটি চরম অবহেলিত। অথচ এই প্রদেশটি বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ।

  • সিপেক (CPEC) প্রকল্প: চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (China-Pakistan Economic Corridor)-এর মতো বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্পগুলো এই বালোচিস্তানের ওপর দিয়েই গেছে। বালোচ জনগণের অভিযোগ, তাদের সম্পদ লুটে নিয়ে চীন ও ইসলামাবাদ লাভবান হচ্ছে, অথচ স্থানীয়রা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

  • মানবাধিকার লঙ্ঘন: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা বিষয়ক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বালোচিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছে। যদিও পাকিস্তান সরকার ও কর্তৃপক্ষ সবসময়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করে।

ডাঃ মাহরাং বালোচের এই কারাদণ্ড বালোচিস্তানের স্বাধীনতা ও অধিকার আন্দোলনকে আরও উস্কে দেবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন ::

Back to top button