ফুটবলরাজ্য

মেসি কাণ্ডে তোলপাড় নবান্ন! তদন্তের ফাইল তলব ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথের, এবার কি টাকা ফেরত পাবেন দর্শকরা?

ওয়েস্ট বেঙ্গল নিউজ ২৪

মেসি কাণ্ডে তোলপাড় নবান্ন! তদন্তের ফাইল তলব ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথের, এবার কি টাকা ফেরত পাবেন দর্শকরা? - West Bengal News 24

গত বছরের ডিসেম্বরে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিওনেল মেসির আগমনকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং বিশৃঙ্খলা আবারও নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এল। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর বহুচর্চিত ‘মেসি কাণ্ড’ নিয়ে এবার সরাসরি তদন্তের ইঙ্গিত দিলেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, পুরো ঘটনার তদন্ত সংক্রান্ত ফাইল ইতিমধ্যেই চেয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে।

ক্রীড়ামন্ত্রীর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে গত বছরের সেই বহুল প্রচারিত অনুষ্ঠান, যেখানে বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি, উরুগুয়ের ফুটবলার লুইস সুয়ারেজ এবং আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার রদ্রিগো দি’পল কলকাতায় এসেছিলেন। ১৩ ডিসেম্বর আয়োজিত ‘দ্য গোট ট্যুর’ নিয়ে বিপুল উন্মাদনা তৈরি হলেও অনুষ্ঠান ঘিরে চরম বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠে। বহু দর্শকের দাবি ছিল, হাজার হাজার টাকা খরচ করে টিকিট কাটলেও তাঁরা মেসিকে সঠিকভাবে দেখতে পাননি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, দর্শক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং অনুষ্ঠান পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে যুবভারতী স্টেডিয়ামে।

সেই সময় স্টেডিয়ামের ভিতরে উত্তেজনা চরমে ওঠে। বহু দর্শক অভিযোগ করেন, প্রতিশ্রুত সুবিধা পাননি তাঁরা। কোথাও বসার ব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি, কোথাও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা, আবার কোথাও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ দর্শকদের একাংশ স্টেডিয়ামের ভিতরে ভাঙচুর চালায় বলেও অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে যুবভারতী কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়।

আরও পড়ুন :: বাংলায় কি এবার বড় বিনিয়োগ? ‘স্পেন’ খোঁচায় সৌরভকে বিঁধে শিল্পায়নের নতুন পথ দেখালেন শমীক ভট্টাচার্য!

ঘটনার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। মূল আয়োজক হিসেবে পরিচিত শতদ্রু দত্তকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে জেল হেফাজতেও থাকতে হয়। প্রায় ৩৮ দিন জেল খাটার পর তিনি জামিন পান। সেই সময় টিকিটের অর্থ ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও বহু দর্শকের অভিযোগ, তাঁরা এখনও টাকা ফেরত পাননি। এই অভিযোগই এখন আবার সামনে আসছে নতুন সরকারের আমলে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে নিশীথ প্রামাণিক বলেন, “মেসি কাণ্ড আমাদের জন্য দুঃখজনক। আমি ফাইল চেয়েছি। সেই ফাইল দেখব। এই নিয়ে মিটিং করব। প্রয়োজনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। কী সিদ্ধান্ত হয়, তা জানানো হবে।” তাঁর এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, নতুন সরকার ঘটনাটিকে শুধুমাত্র অতীতের বিতর্ক হিসেবে দেখছে না, বরং প্রশাসনিকভাবে পুনর্মূল্যায়নের দিকেও এগোতে চাইছে।

টিকিটের টাকা ফেরত প্রসঙ্গেও প্রশ্ন করা হলে ক্রীড়ামন্ত্রী সরাসরি পূর্ববর্তী প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আগের সরকারের সব বিষয়ে অন্তর্ঘাত ছিল। ক্রীড়াক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়।” যদিও তিনি স্পষ্ট করে কোনও আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেননি, তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নতুন সরকার চাইছে রাজ্যের ক্রীড়াক্ষেত্রে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ভবিষ্যতে বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে।

নিশীথ প্রামাণিক আরও বলেন, সরকার এমন একটি বড় ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের চেষ্টা করবে, যাতে মানুষ ‘মেসি কাণ্ড’-এর হতাশা ভুলতে পারেন। তাঁর কথায়, “আমরা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কথা বলে এমন একটি ম্যাচও করানোর চেষ্টা করব, যাতে মানুষ মেসিকাণ্ডের দুঃখ ভুলতে পারে।” এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে জল্পনা শুরু হয়েছে, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক তারকাদের নিয়ে নতুন কোনও বড় ফুটবল ইভেন্টের পরিকল্পনা করছে কি না রাজ্য সরকার।

অন্যদিকে এই ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র শতদ্রু দত্ত সম্প্রতি দাবি করেছেন, তিনি ভবিষ্যতে আবারও আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকাদের ভারতে আনার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু লিওনেল মেসি নন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকেও ভারতে আনার চেষ্টা চলছে। তবে কলকাতায় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। তাঁর দাবি, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

শতদ্রু দত্ত আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি অতীতের বিতর্কের জন্য এক ধরনের ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করতে চান। অর্থাৎ দর্শকদের যে ক্ষোভ এবং হতাশা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠে নতুনভাবে একটি সফল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান আয়োজনের চেষ্টা করতে চান। তবে তার জন্য রাজ্য সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দরকার বলে তিনি জানিয়েছেন।

মেসি আগমনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তার রাজনৈতিক প্রভাবও কম ছিল না। সেই সময় বিরোধীদের একাংশ তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক মহলের বিরুদ্ধে অব্যবস্থার অভিযোগ তুলেছিল। অভিযোগ ছিল, অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, দর্শক নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় একাধিক ত্রুটি ছিল। যদিও তৎকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল এবং পরিস্থিতির জন্য আয়োজকদের দায়ী করেছিল।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে শুধু তারকা উপস্থিতি যথেষ্ট নয়, বরং দর্শক ব্যবস্থাপনা, টিকিটিং সিস্টেম, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, স্টেডিয়ামের অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুবভারতীর ঘটনায় সেই সমন্বয়ের অভাব স্পষ্টভাবে সামনে এসেছিল বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং দর্শকদের ক্ষোভের ছবি অনুষ্ঠানটির ভাবমূর্তিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন সরকার এই ইস্যুকে শুধুমাত্র ক্রীড়া প্রশাসনের ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং পূর্ববর্তী সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরতে চাইছে। কারণ রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই বিভিন্ন পুরনো বিতর্কিত বিষয় নতুন করে খতিয়ে দেখার কথা বলা হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতাতেই ‘মেসি কাণ্ড’-এর তদন্ত ফাইল পুনরায় সামনে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ এখনও মনে করেন, কলকাতায় লিওনেল মেসির আগমন ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে পারত। ফুটবলপ্রেমী শহর হিসেবে কলকাতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এবং বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলারের উপস্থিতি ঘিরে মানুষের আবেগও ছিল প্রবল। কিন্তু অব্যবস্থা এবং বিতর্কের কারণে সেই আবেগ শেষ পর্যন্ত হতাশায় পরিণত হয়। বহু দর্শক সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। কেউ টিকিটের মূল্য ফেরতের দাবি তুলেছিলেন, কেউ আবার দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ চেয়েছিলেন।

প্রশাসনিক সূত্রে খবর, নতুন সরকার এখন পুরো ঘটনার আর্থিক, প্রশাসনিক এবং নিরাপত্তাজনিত দিকগুলি পর্যালোচনা করতে পারে। টিকিট বিক্রি, দর্শকসংখ্যা, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যদিও সরকারিভাবে এখনও তদন্তের রূপরেখা ঘোষণা করা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে কলকাতা কি আবারও আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চ হয়ে উঠতে পারবে। কারণ অতীতে বহু আন্তর্জাতিক ম্যাচ, বিশ্বকাপের অনুষ্ঠান এবং তারকাখচিত ফুটবল ইভেন্টের সাক্ষী থেকেছে এই শহর। তবে সাম্প্রতিক বিতর্ক প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠান সফল করতে শুধুমাত্র আবেগ নয়, পেশাদার ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মেসি কাণ্ডের তদন্ত নতুন করে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতে বড় আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের ইঙ্গিত এই দুই বিষয়ই এখন রাজ্যের ক্রীড়া মহলে নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, দর্শকদের অভিযোগ কতটা গুরুত্ব পায় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটাই এখন দেখার।

আরও পড়ুন ::

Back to top button