
লোকসভা ভোটে ভরাডুবির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার চরম সাংগঠনিক সংকটের মুখে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। দলীয় বিধায়কদের এককাট্টা করতে রবিবারে কালীঘাটের বাসভবনে একটি হাইভোল্টেজ বৈঠক ডেকেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। কিন্তু, দলের অন্দরের ফাটলকে কার্যত স্পষ্ট করে দিয়ে সেই বৈঠকে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে উপস্থিত হলেন মাত্র ১৯ থেকে ২০ জন!
বিধায়কদের এই বিপুল অনুপস্থিতিতে তীব্র ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেত্রী। শেষ পর্যন্ত রবিবারের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি বাতিল করতে বাধ্য হয় দল। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভোটের বিপর্যয়ের এক মাসের মধ্যেই যেভাবে তৃণমূলের অন্দরে ছত্রভঙ্গ দশা তৈরি হয়েছে, তা নজিরবিহীন।
কেন বাতিল হলো কালীঘাটের বৈঠক? ক্ষোভে ঘরেই এলেন না মমতা!
দলীয় সূত্রের খবর, কালীঘাটের বৈঠকে বিধায়কদের এই ‘নগণ্য’ উপস্থিতি একেবারেই মেনে নিতে পারেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষোভ ও অভিমানে তিনি বৈঠকের ঘরে পর্যন্ত প্রবেশ করেননি। পরবর্তীতে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে বিধায়কদের বার্তা পাঠিয়ে বৈঠক বাতিলের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন :: অভিষেককে হেনস্তাকারীরা লাভলি ঘনিষ্ঠ? ‘পুলিশ কোথায় ছিল?’ বোমা ফাটালেন প্রাক্তন বিধায়ক!
যেখানে আশা করা হচ্ছিল দলের কঠিন সময়ে অন্তত ২৫ জন বিধায়ক উপস্থিত থাকবেন, সেখানে সংখ্যাটা ২০ পার না করায় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চরম অস্বস্তিতে পড়েছে।
হামলার কারণেই কি বিধায়কদের অনুপস্থিতি? সাফাই কুণাল ঘোষের
বৈঠক বাতিল হওয়ার পর কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন তৃণমূলের অন্যতম মুখপাত্র কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh)। দলের এই চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ঢাকতে অবশ্য হামলার তত্ত্ব খাড়া করেছেন তিনি।
কুণাল ঘোষ জানান:
অভিষেক-কল্যাণের ওপর হামলা: শনিবার সোনারপুরে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রবিবার সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর ভয়ংকর হামলা হয়েছে। দুজনেই বর্তমানে আহত।
বিধায়কদের আর্জি: এই ঘটনার পর বিভিন্ন এলাকার বিধায়করা ক্ষোভে ও প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন। অনেক বিধায়ককে পুলিশ আটক করে থানায় বসিয়ে রেখেছে।
কর্মীদের সুরক্ষার অভাব: বিধায়করা ফোন করে নেতৃত্বকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, তাঁরা এলাকায় না থাকলে তৃণমূল কর্মীদের ওপর আরও হামলা হতে পারে। তাই জনস্বার্থ ও কর্মীদের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখেই বৈঠকটি সাময়িকভাবে স্থগিত করার অনুরোধ জানান তাঁরা।
তৃণমূলের দাবি, বিধায়কদের এই অনুরোধ মেনেই আপাতত বৈঠক পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরবর্তী বৈঠকের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হবে।
রবিবারের বৈঠকে কারা উপস্থিত ছিলেন? দেখে নিন তালিকা
চরম ডামাডোলের মধ্যেও যে ২০ জন বিধায়ক ও নেতা কালীঘাটে উপস্থিত হতে পেরেছিলেন, তাঁরা হলেন:
ফিরহাদ হাকিম
কুণাল ঘোষ
শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়
নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়
গুলশান মল্লিক
পুলক রায়
বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়
বীণা মণ্ডল
রহিম বক্সি
রুকবানুর রহমান
অসীমা পাত্র
সমীর জানা
অশোক দেব
আবদুল খালেক মোল্লা
জেবের শেখ (চাপড়ার বিধায়ক)
মতিবুর রহমান
মদন মিত্র
আলিফা আহমেদ
তৌসিফ রহমান
মোশারফ হোসেন
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন শীর্ষ নেতৃত্ব চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং ডেরেক ও’ব্রায়েন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই অনুপস্থিতির পেছনে কেবল ‘হামলা’ বা ‘কর্মীদের সুরক্ষা’ একমাত্র কারণ নয়। সম্প্রতি বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা বাছাইয়ের প্রস্তাবনায় তৃণমূল বিধায়কদের সই জাল করার একটি মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার ভিত্তিতে সিআইডি (CID) তদন্ত শুরু করেছে এবং একের পর এক তৃণমূল বিধায়ককে নোটিস ধরানো হচ্ছে।
ভোটের পর থেকেই একদিকে পুলিশি তৎপরতা এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ (জনরোষ) — এই দুইয়ের সাঁড়াশি চাপে পড়ে দলের একাংশ বিধায়ক এখন ব্যাকফুটে। রবিবারের এই ‘ফ্লপ’ বৈঠক তারই প্রমাণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এই ধাক্কা সামলে পাল্টা কামড় দিতে মরিয়া ঘাসফুল শিবির। কুণাল ঘোষ ঘোষণা করেছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার প্রতিবাদে আগামী সোম ও মঙ্গলবার — এই দু’দিন ধরে রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নামবে তৃণমূল কংগ্রেস।



