
ভোটগণনার আর মাত্র ৭২ ঘণ্টা বাকি, এমন সময় রাজনৈতিক অঙ্ক, সংগঠনের প্রস্তুতি এবং কৌশল নির্ধারণকে ঘিরে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তৎপরতা তুঙ্গে পৌঁছেছে, এবং এই আবহেই শুক্রবার বিকেলে দীর্ঘ বৈঠকে বসলেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, যা রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং যার বিষয়বস্তু নিয়ে জোর জল্পনা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার বিকেল প্রায় পাঁচটা নাগাদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছন কলকাতার হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে, এবং তারপর প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে এই বৈঠক, যদিও দলীয়ভাবে বৈঠকের আলোচ্য বিষয় প্রকাশ করা হয়নি, তবে নির্বাচনের ঠিক আগে এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটগণনার আগে এই বৈঠকে জেলা ও আসনভিত্তিক পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ফলাফল এবং গণনাকেন্দ্রে দলের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়ে থাকতে পারে, কারণ এই পর্যায়ে প্রতিটি আসনের ফলাফল নিয়ে দলীয় নেতৃত্বের কাছে একটি স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই অনুযায়ী সংগঠনকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন :: ভবানীপুরে বিজেপির জয়ের দাবি! ওয়ার্ডভিত্তিক হিসেব দিলেন শুভেন্দু অধিকারী
এর আগেই দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছিল যে শনিবার একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে কাউন্টিং এজেন্টদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, যেখানে গণনার দিন তাঁদের করণীয় এবং সতর্কতার বিষয়গুলি ব্যাখ্যা করা হবে, তবে পরে জানা যায় যে ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও, যা এই বৈঠকের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দলীয় স্তরে গণনাকেন্দ্রের কৌশলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই বৈঠকে কাউন্টিং এজেন্টদের উদ্দেশ্যে বার্তা দেওয়া হতে পারে যে গণনাকেন্দ্রে প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং কোনও ধরনের অনিয়ম বা অসঙ্গতি চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে দলীয় নেতৃত্বকে জানাতে হবে, যাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং ফলাফল নিয়ে কোনও প্রশ্ন না ওঠে, যা নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক।
তৃণমূলের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে বড় নির্বাচনের সময় দল বিশেষ কিছু আসনে ‘বিশেষ পর্যবেক্ষক’ নিয়োগ করে, যারা গণনার সময় নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন, যেমন পূর্ববর্তী লোকসভা নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রে এই ধরনের পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল, তবে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি, যদিও শনিবারের বৈঠক থেকে নতুন কোনও নির্দেশ আসতে পারে বলে দলীয় মহলে আলোচনা চলছে।
আরও পড়ুন :: গণনাকেন্দ্র ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: ১৬৩ ধারা জারি করে জমায়েতে কড়া নিষেধাজ্ঞা কলকাতার পুলিশ কমিশনারের!
এই প্রেক্ষাপটে দলের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা এবং বিশ্লেষণ নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছে, যেখানে একাংশের মতে কিছু আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই রয়েছে এবং সেখানে ফলাফল যে কোনও দিকে যেতে পারে, অন্যদিকে আরেক অংশের দাবি, দল একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার নিচে নামবে না এবং সামগ্রিকভাবে একটি শক্তিশালী ফলাফল করবে, যদিও এই সমস্ত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় স্তরে স্বীকার করা হয়নি এবং তা অভ্যন্তরীণ আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
দলীয় সূত্রে আরও দাবি করা হয়েছে যে দ্বিতীয় দফার ভোটের দিনই একটি প্রাথমিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছিল যে তৃণমূল উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে, তবে এই ধরনের পূর্বাভাস সাধারণত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয় এবং চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করে ভোটগণনার উপর।
অন্যদিকে বিভিন্ন সংস্থার বুথফেরত সমীক্ষায় ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে, যেখানে রাজ্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে এবং বিরোধী দল এগিয়ে থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তবে এই সমীক্ষাগুলিকে তৃণমূলের তরফে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে এবং তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই এই ধরনের সমীক্ষাকে ‘চক্রান্ত’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে অতীতেও সমীক্ষা এবং বাস্তব ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য দেখা গিয়েছে, ফলে এই ধরনের পূর্বাভাসের উপর নির্ভর না করে দলীয় কর্মীদের শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে, যা সংগঠনের মনোবল ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই পরিস্থিতিতে শুক্রবারের দীর্ঘ বৈঠক এবং শনিবারের ভার্চুয়াল বৈঠককে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে, কারণ এই দুই বৈঠকের মাধ্যমেই দলীয় কৌশলের শেষ রূপরেখা নির্ধারণ করা হতে পারে এবং গণনার দিন দলের অবস্থান কী হবে, তার একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যেখানে দলীয় নেতৃত্ব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করে, তবে এবারের বৈঠকের সময়কাল এবং প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ গণনার আগে প্রতিটি সিদ্ধান্তই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সমগ্র ঘটনাপ্রবাহটি দেখায় যে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে রাজনৈতিক দলগুলির তৎপরতা কোনওভাবেই কমে না, বরং তা আরও সুসংগঠিত এবং কৌশলগত হয়ে ওঠে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের লক্ষ্য থাকে চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রভাবিত করা এবং সেই লক্ষ্যেই সংগঠন ও নেতৃত্ব নিজেদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রাখে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।



