
বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে গিয়েছে গত ৪ মে। শপথ নেওয়ার পর এবার অ্যাকশন মোডে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তবে চমক এখানেই শেষ নয়; নিজের প্রথম প্রশাসনিক বৈঠকের জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন এমন এক জায়গাকে, যা দীর্ঘকাল ধরে তৃণমূলের ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত ছিল। আগামী ২১ মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের হাইভোল্টেজ নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রীর এই ডায়মন্ড হারবার সফর কি স্রেফ প্রশাসনিক, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ?
২০১৪ সাল থেকে টানা তিনবার ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র থেকে জিতেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি ২০২৪-এর লোকসভাতেও ৭ লক্ষের বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের ফল বলছে, সেই ‘গড়’ এখন টলমল। এই আবহে শুভেন্দু অধিকারীর ডায়মন্ড হারবার সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আরও পড়ুন :: রাজ্যের সব স্কুলে এবার প্রার্থনা সঙ্গীত ‘বন্দেমাতরম’, বড় সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর!
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ে এই সফরের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়েছে। নবান্ন সূত্রে খবর:
মুখ্যমন্ত্রী সেখানে একটি বড়সড় প্রশাসনিক বৈঠক করবেন।
এলাকার উন্নয়নের জন্য একগুচ্ছ নতুন প্রকল্প ও জনকল্যাণমূলক ঘোষণা করতে পারেন তিনি।
প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি বিজেপির একটি কর্মী সম্মেলনেও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
আগামী ২১ মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ। নির্বাচন কমিশন আগের ভোট বাতিল করে নতুন সূচি ঘোষণা করার পর থেকেই এই কেন্দ্রটি এখন প্রেস্টিজ ফাইট হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসক ও বিরোধী—দুই পক্ষই প্রচারে কোনো খামতি রাখছে না। রাজনৈতিক মহলের মতে, ফলতার ভোটের ঠিক আগে শুভেন্দুর এই সফর সরাসরি ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সাতগাছিয়া বিধানসভায় তৃণমূল প্রার্থীকে ৪০১ ভোটে হারিয়ে বিজেপির অগ্নিশ্বর নস্করের জয় প্রমাণ করেছে যে, ডায়মন্ড হারবার লোকসভা এলাকার অন্দরে গেরুয়া শিবিরের জমি এখন যথেষ্ট শক্ত।
🔥 জাহাঙ্গীর বনাম দেবাংশু: লড়াই যখন সমানে সমানে
ফলতায় তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভিন রাজ্য থেকে আইপিএস অফিসার অজয়পাল সিংহকে আনা হলেও বিতর্ক ধামাচাপা পড়েনি। অন্যদিকে, ৪ মে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর পাল্টে গিয়েছে গোটা হাওয়া। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পন্ডার পক্ষে একটি প্রবল জনসমর্থন তৈরি হয়েছে। শুভেন্দুর সফর এই হাওয়াকে ঝড়ে রূপান্তরিত করতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার।
আরও পড়ুন :: আইনজীবীর পোশাকে হাইকোর্টে মমতা! ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ হয়ে ভোট পরবর্তী হিংসা মামলায় সওয়াল তৃণমূল সুপ্রিমোর
গত ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকে শুভেন্দু অধিকারী মূলত নবান্ন এবং বিধানসভার কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। শুক্রবার বিধানসভায় স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরেই তাঁর ব্যস্ততা কিছুটা কমবে। আর সেই সুযোগেই সরাসরি ‘ব্যাটন’ হাতে তুলে নিতে চলেছেন তিনি।
কেন এই সফর গুরুত্বপূর্ণ? ১. উন্নয়নের কার্ড: প্রশাসনিক বৈঠকের মাধ্যমে ডায়মন্ড হারবারের মানুষের মন জয় করা। ২. মনোবল বৃদ্ধি: অভিষেকের খাসতালুকে দাঁড়িয়ে বিজেপি কর্মীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। ৩. উপনির্বাচনে প্রভাব: ফলতার ভোটে জয় নিশ্চিত করতে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই সেনাপতির ভূমিকা নিচ্ছেন।
বাংলার রাজনীতিতে এখন সব পথ গিয়ে মিশেছে ডায়মন্ড হারবারে। একদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হারানো জমি পুনরুদ্ধারের লড়াই, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর আধিপত্য বিস্তারের জয়যাত্রা। ২১ মের ফলতা নির্বাচন এবং ২৪ মের ফলাফলই বলে দেবে, ডায়মন্ড হারবার কার—পুরনো সাংসদের নাকি নতুন মুখ্যমন্ত্রীর?



